স্বাভাবিক মৃত্যুই সবার কাম্য

আপডেট : ১০ আগস্ট ২০১৯, ২১:৩৬

ড. মির্জা গোলাম সারোয়ার পিপিএম

বিভিন্ন পত্রিকায় প্রায়শই অপমৃত্যু সংক্রান্ত খবর প্রকাশিত হয়। প্রকৃতির নিয়মের বাইরে যে মৃত্যু হয় তাকে অস্বাভাবিক মৃত্যু বা Unnatural Death বা অপমৃত্যু বলা হয়। অস্বাভাবিক মৃত্যুর কারণে থানায় যে মামলা রুজু করা হয় তাকে ইউডি কেস বা অস্বাভাবিক মৃত্যু মামলা বলে। সাধারণত কোনো দুর্ঘটনার কবলে পড়ে, পানিতে ডুবে, ইচ্ছাকৃতভাবে গলায় রশি দিয়ে, বিষপান করে কিংবা অন্য কোনো উপায়ে মারা গেলে বা আত্মহত্যা করলে তাকে অস্বাভাবিক মৃত্যু বা অপমৃত্যু বলে গণ্য করা হয়। যখন থানায় এ ধরনের সংবাদ আসে তখন থানার ওসি বা দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা পুলিশ ১৮৬১ সালের আইনের ৪৪ ধারা, ফৌজদারী কার্যবিধি আইনের ১৫৪ ও ১৫৫ এবং পিআরবি ৩৭৭ নিয়মানুযায়ী সংবাদটি জেনারেল ডাইরিতে নোট করবেন। অতঃপর ফৌজদারী কার্যবিধির ১৭৪ ধারা এবং পিআরবি ২৯৯ নিয়মানুযায়ী অস্বাভাবিক মৃত্যু মামলা রুজু করে তদন্তের ব্যবস্থা করবেন। ফৌজদারী কার্যবিধি আইনের ১৫০ ধারা এবং পিআরবি ১২০ নিয়মানুযায়ী তিনি বিষয়টি ঊর্ধ্বতন অফিসারকে জানাবেন। আমাদের দেশে প্রতিনিয়তই বিভিন্নভাবে অস্বাভাবিক বা অপমৃত্যু সংঘটিত হয়ে থাকে।

অনেক সময় অস্বাভাবিক মৃত্যুজনিত লাশ থানায় না জানিয়ে তড়িঘড়ি করে কবর দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে সংবাদটি জ্ঞাত হয়ে থানার ওসি লাশ কবর হতে তুলে সুরতহাল রিপোর্ট লিপিবদ্ধ করে ময়না তদন্ত করার জন্য জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট আবেদন করবেন। অতঃপর জেলা ম্যাজিস্ট্রেট একজন ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে লাশ কবর হতে তুলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করার জন্য অনুমতি দিবেন। তদন্তকারী কর্মকর্তা নির্ধারিত তারিখে নিয়োগকৃত ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে কবর  থেকে লাশ তুলে ফৌজদারী কার্যবিধির ১৭৪ ধারা এবং পিআরপি ২৯৯ নিয়মানুসারে সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করে তাতে ম্যাজিস্ট্রেটের স্বাক্ষর গ্রহণ করে পিআরপি ৩০৪ নিয়মানুযায়ী ময়না তদন্তের জন্য লাশ মর্গে প্রেরণ করবেন।

ফৌজদারী কার্যবিধির ১৭৬ (২) ধারা মোতাবেক অস্বাভাবিক বা অপমৃত্যুজনিত যে লাশ এরই মধ্যে কবরস্থ করা হয়েছে, ম্যাজিস্ট্রেট যদি মৃত্যুর কারণ নির্ণয়ের জন্য তা পরীক্ষা করে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করেন, তা হলে তিনি কবর হতে লাশ তুলতে এবং পরীক্ষা করাতে পারবেন। ফৌজদারী কার্যবিধির ১৭৪ (৩) ধারা এবং পিআরবি ৩০৬ নিয়মানুসারে লাশের মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানের জন্য সিভিল সার্জন বা ক্ষমতাবান ডাক্তার প্রেরিত লাশের ময়না তদন্ত করবেন। ডাক্তার লাশের মৃত্যুর কারণ সম্পর্কিত বিশেষজ্ঞ মতামত সম্বলিত যে রিপোর্ট প্রদান করেন তাকে ময়না তদন্ত রিপোর্ট (Post mortem Report) বলে। অস্বাভাবিক মৃত্যু বা অপমৃত্যু মামলার ক্ষেত্রে ময়না তদন্ত রিপোর্ট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মৃত্যুটি কিভাবে হয়েছে তা ময়না তদন্তের মাধ্যমেই উদ্ঘাটিত হয়। অনেক সময় ময়না তদন্তে মৃত্যুর কারণ উদ্ঘাটিত না হলে লাশের ভিসেরা সংরক্ষণ করা হয়। বিশেষ করে বিষপানে অস্বাভাবিক বা অপমৃত্যুর ক্ষেত্রে।  সাক্ষ্য আইনের ৯ ও ৩৫ ধারানুসারে জেনারেল ডাইরি, সুরতহাল রিপোর্ট এবং এই আইনের ৪৫, ৪৬ এবং ৪৭ ধারানুসারে ময়না তদন্ত রিপোর্ট (বিশেষজ্ঞ মতামত-পিআরপি ২৯৭ বিধি এবং সাক্ষ্য আইনের ৪৫ ধারা) বস্তুগত সাক্ষ্য হিসেবে আদালতে উপস্থাপন করে মামলা প্রমাণ করা যায়।

জীবনের পরিসমাপ্তি হলো মৃত্যু। হোক তা স্বাভাববিক অথবা অস্বাভাবিক বা অপমৃত্যু। প্রাণীদেহের সকল প্রকার জীবন্ত প্রক্রিয়া বিলুপ্ত হয়ে জীবকোষের সকল কর্মশক্তি স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে জীবনের অবসান ঘটে। প্রত্যেককেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। তবে অস্বাভাবিক বা অপমৃত্যু নয়, স্বাভাবিক মৃত্যুই সবার কাম্য। ফ্রান্সিস বেকনের মতে, ‘মৃত্যুটা জন্মানোর মতোই স্বাভাবিক’। ডানিয়েল ডিবেলের মতে, ‘মৃত্যুর দরজা সবসময়ই খোলা থাকে, বন্ধ করার কোনো ব্যবস্থা নাই’। আবু জাফর শামসুদ্দীনের মতে, ‘যা অবশ্যম্ভাবী, তা নিয়ে দুর্ভাবনার কোনো মানে হয় না। মৃত্যু সেই অবশ্যম্ভাবী বিষয়’। পরিশেষে সকলের একমাত্র কাম্য, আমাদের সবার মৃত্যুটা যেন স্বাভাবিক হয়। কখনো অস্বাভাবিক বা অপমৃত্যু নয়।

n লেখক : সাবেক পুলিশ ও র্যাব কর্মকর্তা