বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পেলে যেকোনো ফুটবলারেরই স্বপ্ন থাকে কীর্তিমানদের পাশে নাম লেখানোর। কিন্তু সেই ইতিহাস গড়তে ঠিক কত সময় লাগতে পারে? মেক্সিকান ফরোয়ার্ড হুলিয়ান কিনিয়োনেস হয়তো বলবেন মাত্র ৮ মিনিট ৩২ সেকেন্ড!
২০২৬ বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে মাঠে নেমে এই অবিশ্বাস্য কীর্তি গড়েছেন তিনি। এই আসরের প্রথম গোলটি করে আগের ২২টি বিশ্বকাপের প্রথম গোলদাতাদের পাশে নিজের নাম চিরতরে খোদাই করে নিয়েছেন ২৯ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড।
কিনিয়োনেসের এই কীর্তি তাকে পেলে (১৯৬৬), পল ব্রাইটনার (১৯৭৪), আদেমির (১৯৫০), ইয়ুর্গেন ক্লিন্সম্যান (১৯৯৪) এবং ফিলিপ লামের (২০০৬) মতো ফুটবল কিংবদন্তিদের পাশে বসার মর্যাদা এনে দিয়েছে।
ম্যাচের ৮ মিনিট ৩২ সেকেন্ডের মাথায় কিনিয়োনেসের একটি নিখুঁত শট দক্ষিণ আফ্রিকার গোলরক্ষকের দুই পায়ের মাঝখান দিয়ে যখন জালে জড়ায়, তখন গর্জনে ফেটে পড়ে ঐতিহাসিক আজতেকা স্টেডিয়ামের গ্যালারি। মেক্সিকোর ফুটবল ইতিহাসে এটিই প্রথম কোনো বিশ্বকাপের আসরের উদ্বোধনী গোল। তবে এই আনন্দের পেছনে লুকিয়ে আছে এক দারুণ গল্প, কারণ কিনিয়োনেস জন্মসূত্রে মেক্সিকান নন!
বিশ্বকাপের ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো কোনো আসরের প্রথম গোলটি এমন এক খেলোয়াড় করলেন, যিনি তার দেশের মাটিতে জন্মাননি। এবারের বিশ্বকাপে এক দেশে জন্মে অন্য দেশের প্রতিনিধিত্ব করা ২৯২ জন ফুটবলারের মধ্যে কিনিয়োনেস এখন অনন্য। একই সঙ্গে কনক্যাকাফ অঞ্চলের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপের প্রথম গোল করার রেকর্ডও এখন তাঁর ঝুলিতে।
কিনিয়োনেসের জন্ম কলম্বিয়ার কফির শহর মাগুই পায়ানে। ক্যারিয়ারের শুরুতে দেশটির ক্লাব ‘কালি’-তে ২০১৪-১৫ মৌসুমে ৩৮ ম্যাচে ৫০ গোল করে হৈচৈ ফেলে দেন। ২০১৬ সালে মেক্সিকোর ক্লাব ‘তিগ্রেস ইউএএনএল’-এর হয়ে মেক্সিকান ফুটবলে তার অভিষেক হয়। এরপর আতলাস ও আমেরিকা ক্লাবে খেলে ২০২৪ সালে তিনি যোগ দেন সৌদি প্রো লিগের দল আল কাদসিয়ায়।
২০১৭-১৮ মৌসুমে কলম্বিয়া অনূর্ধ্ব-২০ দলে খেললেও পরবর্তী সময়ে দেশটির মূল জাতীয় দলে ডাক পাচ্ছিলেন না তিনি। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের মতে, ‘প্রত্যাখ্যাত হতে হতে ক্লান্ত’ কিনিয়োনেসের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। ২০২৩ সালের মে মাসে যখন কলম্বিয়া দল থেকে ডাক আসে, ততদিনে তিনি মেক্সিকোর এক নারীকে বিয়ে করে দেশটির নাগরিকত্ব নেওয়ার সিদ্ধান্ত পাকাপোক্ত করে ফেলেছেন। ২০২৩ সালের ১৭ নভেম্বর মেক্সিকোর জার্সিতে তাঁর অভিষেক ঘটে।
কিনিয়োনেসের গোল করার ক্ষুধা কতটা তীব্র, তা স্পষ্ট হয় সৌদি প্রো লিগের গত মৌসুমের পরিসংখ্যানে। গোল করার দিক থেকে তিনি পেছনে ফেলেছেন স্বয়ং পর্তুগিজ কিংবদন্তি ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকেও। সৌদি লিগে আল কাদসিয়ার হয়ে গত মৌসুমে ৩১ ম্যাচে করেছেন ৩৩ গোল, সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে মৌসুমে তার মোট গোল ৩৫ ম্যাচে ৩৭টি। একই মৌসুমে আল নাসরের হয়ে পর্তুগিজ কিংবদন্তি রোনালদোর গোল ৩০ ম্যাচে ২৮টি। সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে করা গোলেও রোনালদো (৩৭ ম্যাচে ৩০ গোল) কিনিয়োনেসের ( ৩৫ ম্যাচে ৩৭ গোল) পেছনে।
মেক্সিকোর হয়ে এখন পর্যন্ত ২৩ ম্যাচে ৩টি গোল ও ২টি অ্যাসিস্ট করেছেন কিনিয়োনেস। তবে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে করা তার এই শেষ গোলটি নিঃসন্দেহে তাঁর ক্যারিয়ারের সেরা ও ঐতিহাসিক। কারণ, এই গোলের ওপর ভর করেই মেক্সিকো বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে তাদের জয়খরা কাটিয়েছে। পাশাপাশি মেক্সিকো বিশ্বের ১৫তম আলাদা দেশ হিসেবে বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচের প্রথম গোলদাতার তালিকায় নাম লেখানোর গৌরব অর্জন করল।

