২০২০ সালের ২৯ নভেম্বরের সেই অভিশপ্ত রাতটি এখনো ফুটবলপ্রেমীদের মনে দগদগে ক্ষত হয়ে আছে। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের এক ম্যাচে মেক্সিকান ফরোয়ার্ড রাউল জিমেনেজ এক ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হন। ওলভারহ্যাম্পটনের হয়ে খেলার সময় কর্নার কিক থেকে আসা বল বাতাসে ভাসিয়ে মারতে গিয়ে আর্সেনাল ডিফেন্ডার ডেভিড লুইজের মাথার সঙ্গে তার প্রচণ্ড সংঘর্ষ হয়। আঘাতের সঙ্গে সঙ্গেই জিমেনেজ মাঠের ভেতর অচেতন হয়ে পড়েন। তার মাথার খুলি ফেটে যায় এবং মস্তিষ্কের ভেতর রক্তক্ষরণ শুরু হয়। মাঠেই তাকে ১০ মিনিট ধরে অক্সিজেন দিয়ে জরুরি চিকিৎসা দেওয়ার পর দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে চিকিৎসকরা জানান, জিমেনেজের খুলির হাড় ভেঙে মস্তিষ্কে মারাত্মক চাপ তৈরি হয়েছিল।
ফুটবলার তো দূরের কথা, সাধারণ মানুষ হিসেবে বেঁচে ফেরাই অলৌকিক ছিল তার জন্য। সেই মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসার প্রায় ছয় বছর পর, ৩৫ বছর বয়সে এসে মেক্সিকোর ঐতিহাসিক এস্তাদিও আজতেকা স্টেডিয়ামে তৈরি হলো ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম এক আবেগঘন রূপকথা।
উদ্বোধনী ম্যাচেই মেক্সিকোর জার্সি গায়ে আফ্রিকার জাল কাঁপিয়েছেন জিমেনেজ। ম্যাচের ৬৭তম মিনিটে রবার্তো আলভারাডোর ডান প্রান্তের মাপা ক্রস থেকে দুর্দান্ত এক পাওয়ারফুল হেডারে দলের দ্বিতীয় গোলটি এনে দেন তিনি। গোলটি করার পরপরই বুনো উল্লাসে মেতে না উঠে জিমেনেজ আকাশের দিকে আঙুল তুলে অঝোরে কাঁদতে শুরু করেন। গত মার্চ মাসেই তিনি হারিয়েছেন তার প্রিয় পিতা রাউল জিমেনেজ ভেগাকে। এই ঐতিহাসিক গোলটি তাই বাবার স্মৃতির উদ্দেশ্যেই উৎসর্গ করেন তিনি।
জিমেনেজের এই অশ্রুসিক্ত নয়ন আর গ্যালারির ৮০ হাজার ৮২৪ জন দর্শকের গগনবিদারী চিৎকার ম্যাচটিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। নিজের ফুটবল ক্যারিয়ারে এর আগে তিন বিশ্বকাপে (২০১৪, ২০১৮, ২০২২) মোট ছয়টি ম্যাচে বদলি হিসেবে নামলেও, এটিই ছিল বিশ্বকাপের চূড়ান্ত আসরে শুরুর একাদশে জিমেনেজের প্রথম ম্যাচ। আর প্রথম স্টার্টেই বাজিমাত করলেন এই তারকা। দেশের হয়ে ১২৫তম ম্যাচে এটি ছিল তার ৪৬তম আন্তর্জাতিক গোল, যা তাকে মেক্সিকোর সর্বকালের সেরা গোলদাতার তালিকায় হাভিয়ের হার্নান্দেজের (৫২ গোল) ঠিক পেছনে যৌথভাবে দ্বিতীয় স্থানে বসিয়েছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের রঙিন আতশবাজির ধোঁয়া পরিষ্কার হওয়ার আগেই ম্যাচের ৯ম মিনিটে প্রথম গোলের দেখা পায় স্বাগতিকরা। মাঝমাঠে মেক্সিকান নিয়মিত অধিনায়ক এডসন আলভারেজের পরিবর্তে সুযোগ পাওয়া মিডফিল্ডার লিরা দক্ষিণ আফ্রিকার ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার স্পেফেলো সিথোলের কাছ থেকে বল কেড়ে নিয়ে পাস দেন জুলিয়ান কুইনোনেসকে। কুইনোনেস চমৎকার দক্ষতায় বক্সে ঢুকে গোলরক্ষক রনওয়েন উইলিয়ামসের দুই পায়ের নিচ দিয়ে বল জালে জড়িয়ে মেক্সিকোকে ১-০ গোলে এগিয়ে নেন।
মাঠে তিন লাল কার্ডের গরম আবহের মাঝেই ২-০ গোলের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে মেক্সিকো। তবে দল গ্রুপ 'এ' এর গুরুত্বপূর্ণ তিন পয়েন্ট পেয়ে টেবিলের সুবিধাজনক অবস্থানে গেলেও মেক্সিকোর হেড কোচ হাভিয়ের আগুইরে দলের এই পারফরম্যান্সে মোটেও সন্তুষ্ট হতে পারেননি। ম্যাচ শেষে ক্ষোভ প্রকাশ করে সাংবাদিকদের তিনি বলেন যে এটি মূলত ৪-০ ব্যবধানের একটি ম্যাচ হওয়া উচিত ছিল এবং তারা মোটেও ভালো ফুটবল খেলেননি। এই গ্রুপে তাদের পরবর্তী প্রতিপক্ষ দক্ষিণ কোরিয়া এবং চেক প্রজাতন্ত্র।

