প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন চীন সফরে জ্বালানি ও ইভি খাতে বিনিয়োগের আহ্বান

আপডেট : ১৭ জুন ২০২৬, ১৩:০৮

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন চীন সফরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন বৃদ্ধি ও বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি) তৈরিতে চীনের বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের সহযোগিতা চাইবে বাংলাদেশ। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সফরকালে দুই দেশের মধ্যে কয়েকটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের বিদেশ সফর শুরু হচ্ছে মালয়েশিয়া দিয়ে। মালয়েশিয়া সফর শেষ করে সেখান থেকেই সরাসরি চীন সফরে যাবেন তিনি। ২২ জুন রাতে মালয়েশিয়া থেকে চীনে পৌঁছাবেন প্রধানমন্ত্রী ও তার সফরসঙ্গীরা। 

ওই সূত্র জানায়, সফরে প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির এবং পররাষ্ট্র সচিবসহ উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল সফরসঙ্গী হিসেবে থাকবেন।

আগামী ২৩ জুন চীনের দালিয়ানে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের অ্যানুয়াল মিটিং অব দ্য নিউ চ্যাম্পিয়ন্সে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী। সেখান থেকে ২৪ জুন বিকেলে বেইজিংয়ের উদ্দেশে রওনা হবেন। ঢাকা-বেইজিং কূটনৈতিক সূত্রের দাবি, প্রধানমন্ত্রী দালিয়ান থেকে বুলেট ট্রেনে তার সফরসঙ্গীদের নিয়ে বেইজিং যাবেন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, বুধবার বেইজিংয়ে অনুষ্ঠেয় বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের নানা কর্মসূচি, আলোচ্যসূচি, সম্ভাব্য চুক্তি, সমঝোতাসহ নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

এদিকে প্রধানমন্ত্রীর সফরকালে চীনা বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের উদ্দেশ্যে বেইজিংয়ে একটি বড় ধরনের বিনিয়োগ সম্মেলনের আয়োজন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে ঢাকা।

নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল ও অংশীদারিত্বের পরিবর্তন

এই সফরে বাংলাদেশে প্রস্তাবিত চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলের ডেভেলপার বা উন্নয়নকারী হিসেবে চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ কর্পোরেশনকে (সিআরবিসি) নিয়োগ দিয়ে সরকারের একটি চুক্তি স্বাক্ষরের কথা রয়েছে। এই চুক্তিটি একটি পরিকল্পিত মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলটিতে (ফ্রি ট্রেড জোন) চীনা বিনিয়োগকেও উৎসাহিত করবে। একইসঙ্গে কেরানীগঞ্জ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগের জন্য হান্ডা চীনের হান্ডা গ্রুপকে জমি বরাদ্দের চুক্তি স্বাক্ষরের প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) প্রস্তাব অনুযায়ী, ভূমি উন্নয়নের পর চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলে বাংলাদেশের ৩০ শতাংশ অংশীদারিত্ব বা স্টেক থাকবে, আর বাকি ৭০ শতাংশ অংশীদারিত্ব থাকবে চীনের কাছে।

অংশীদারিত্বের (ইক্যুইটি) এই সুনির্দিষ্ট বিভাজনটি অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) একটি সুপরিকল্পিত প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের প্রতিফলন। একটি তুলনামূলক প্রতিবেদনে ইআরডি উল্লেখ করেছে যে, নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে জাপানি অর্থনৈতিক অঞ্চলের মালিকানা বন্টনে জাপানকে ৭৬ শতাংশ ও বাংলাদেশকে ২৪ শতাংশ ইক্যুইটি দেওয়া হয়েছে, যাতে দেশের কৌশলগত আর্থিক স্বার্থহানী হয়েছে।

চীনের রোড এন্ড ব্রিজ করপোরেশনকে ডেভেলপার হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার প্রস্তাব আজ অর্থমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠেয় অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে অনুমোদনের জন্য পেশ করা হতে পারে। এর আগে, গতকাল প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রকল্পটি অনুমোদন পেয়েছে।

বেইজিংয়ের ব্যাপক আর্থিক অংশীদারিত্বের প্রস্তাব

সফরকালে চীন সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (এসসিও) ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (জিডিআই), ক্রস-বর্ডার ইন্টারব্যাংক পেমেন্ট সিস্টেম (সিআইপিএস) এবং গ্রিন মাইনিং অ্যান্ড মিনারেলস সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য সহযোগিতা উদ্যোগসহ বেশ কয়েকটি আঞ্চলিক আর্থিক ও অর্থনৈতিক উদ্যোগে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের প্রস্তাব দিতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়াও বাংলাদেশ চীনা মুদ্রায় 'পান্ডা বন্ড' চালুর একটি প্রস্তাবও পর্যালোচনা করছে বাংলাদেশ।

সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক হলো চীন সমর্থিত একটি বহুপাক্ষিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান, যা সদস্য দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক যোগাযোগ এবং আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্যের প্রসারের পাশাপাশি অবকাঠামো, শিল্প উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন প্রকল্পগুলোতে অর্থায়নের ওপর আলোকপাত করে থাকে।

ভারত, রাশিয়া ও ইরানসহ ১০ সদস্যের এই বহুপাক্ষিক ঋণদাতার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো বাণিজ্য ও আর্থিক নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে নিজস্ব জাতীয় মুদ্রা, বিশেষ করে চীনা ইউয়ানের ব্যবহার সম্প্রসারণ করা এবং মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা হ্রাস করা।

আর ক্রস-বর্ডার ইন্টারব্যাংক পেমেন্ট সিস্টেম মূলত চীনা মুদ্রায় আন্তর্জাতিক লেনদেনের ক্লিয়ারিং ও নিষ্পত্তির জন্য চীনের আনুষ্ঠানিক অবকাঠামো হিসেবে কাজ করে।

পান্ডা বন্ড এবং ক্রস-বর্ডার ইন্টারব্যাংক পেমেন্ট সিস্টেমে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণের প্রস্তাবগুলো নিয়ে আলোচনা করতে সম্প্রতি এক্সপোর্ট-ইম্পোর্ট ব্যাংক অব চায়নার (চীনের এক্সিম ব্যাংক) একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফর করেছে। সফরকালে প্রতিনিধি দলটি বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করে।

কর্মকর্তারা আরও জানান, দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত ২০তম জি-২০ সম্মেলনে শুরু হওয়া 'গ্রিন মাইনিং অ্যান্ড মিনারেলস সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য সহযোগিতা উদ্যোগ'-এ যোগ দেওয়ার জন্য চীন বাংলাদেশকে অনুরোধ করতে পারে। এই বহুপাক্ষিক কাঠামোর লক্ষ্য হলো বৈশ্বিক পরিবেশবান্ধব রূপান্তরের (গ্রিন ট্রানজিশন) জন্য প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ খনিজগুলোর সরবরাহ শৃঙ্খল শক্তিশালী করা এবং একই সাথে খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য আরও বেশি সুবিধা নিশ্চিত করা।

কর্মকর্তারা জানান, চীন দ্বিপাক্ষিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আলোচনা শুরু করা, কারেন্সি সোয়াপ (মুদ্রা অদল-বদল) চুক্তি স্বাক্ষর, বাংলাদেশ-চীন বিনিয়োগ চুক্তি আধুনিকায়ন বা আপগ্রেড করা এবং বাংলাদেশে একটি চীনা ব্যাংক প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবও দিয়েছে।

সবুজ জ্বালানি ও ইভি খাতে সহযোগিতা

বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তির ক্ষেত্রে চীন বৈশ্বিক নেতা এবং প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে উচ্চমানের বৈদ্যুতিক যান (ইভি) উৎপাদনের জন্য আন্তর্জাতিকভাবেও স্বীকৃতি অর্জন করেছে।

বাংলাদেশ যেহেতু তার জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করতে চায়, তাই সরকার বৈদ্যুতিক যান উৎপাদনের ওপর ব্যাপক গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে উল্লেখযোগ্য দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা করছে। এই দুটি খাতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে, আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যাপকভাবে কর ছাড়ের সুবিধা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

এ বিষয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, প্রস্তাবিত সমঝোতা স্মারকটি সই করা হলে বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং বৈদ্যুতিক যান খাতে চীনা বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি হস্তান্তর ঘটবে। দুই দেশ যৌথভাবে সবুজ জ্বালানি এবং বৈদ্যুতিক যানের ওপর গবেষণাও করবে।

হাসপাতাল ও মেগা-অবকাঠামো প্রকল্প

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, প্রধানমন্ত্রীর সফরকালে নীলফামারীতে ১,০০০ শয্যাবিশিষ্ট 'বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী হাসপাতাল' প্রতিষ্ঠার জন্য একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে পারে। চীন এই প্রকল্পে অনুদান বা গ্র্যান্টের মাধ্যমে অর্থায়ন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এছাড়া 'মোংলা বন্দরের সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন' প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য চীনের সঙ্গে একটি চুক্তি সই করতে পারে বাংলাদেশ। জানা গেছে, আগের আওয়ামী সরকারের সময় এই প্রকল্পের জন্য চীনা অর্থায়নের উদ্যোগ নেওয়া হলেও ভারতের আপত্তির কারণে তা আরো এগোয়নি বলে জানা গেছে।

সরকার তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্প, প্রস্তাবিত পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প, দ্বিতীয় পদ্মা সেতু এবং দ্বিতীয় যমুনা সেতুসহ বেশ কয়েকটি বড় অবকাঠামো প্রকল্পের জন্যও চীনের অর্থায়ন চাইবে বলে আশা করা হচ্ছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) ইতোমধ্যেই বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রকল্পগুলোর একটি তালিকা সংগ্রহ করেছে, যেগুলোতে চীনের অর্থায়নের সম্ভাবনা রয়েছে।

ইআরডি কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, বর্তমানে চীনের ঋণে বাংলাদেশে প্রায় ৪০০ কোটি (৪ বিলিয়ন) ডলার মূল্যের পাঁচটি বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর সফরকালে বাংলাদেশ এই প্রকল্পগুলোর দ্রুত ঋণ ছাড় ও বাস্তবায়ন কাজ ত্বরান্বিত করার অনুরোধ জানাবে।

এই প্রকল্পগুলো হলো-ডিপিডিসি এলাকার আওতায় বিদ্যুৎ ব্যবস্থা নেটওয়ার্কের সম্প্রসারণ ও শক্তিশালীকরণ, পিজিসিবির অধীনে পাওয়ার গ্রিড নেটওয়ার্ক শক্তিশালীকরণ প্রকল্প, ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ, রাজশাহী ওয়াসা সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট এবং বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের জন্য চারটি নতুন জাহাজ সংগ্রহ।

তথ্যসূত্র: টিবিএস

ইত্তেফাক/এনটিএম