ইতিহাস, ঐতিহ্য ও প্রকৌশলের অনন্য নিদর্শন ‘হার্ডিঞ্জ ব্রিজ’

আপডেট : ১৯ জুন ২০২৬, ১২:৩৩

নির্ধারিত আয়ুষ্কাল অতিক্রম করলেও পদ্মার বুকে শতবর্ষেরও বেশি সময় ধরে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে দেশের অন্যতম ঐতিহাসিক রেলসেতু হার্ডিঞ্জ ব্রিজ। বয়সের ভার বাড়লেও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রকৌশলগত তদারকির কারণে সেতুটির ওপর দিয়ে ট্রেন চলাচলে এখনো কোনো ঝুঁকি নেই বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

নির্মাণকালে হার্ডিঞ্জ ব্রিজের আয়ুষ্কাল নির্ধারণ করা হয়েছিল ১০০ বছর। সেই মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ২০১৫ সালে বিশেষজ্ঞদের পরিচালিত গবেষণা ও ধাতব কাঠামোর পরীক্ষায় সেতুটি আরও অন্তত ২৫ বছর ব্যবহারের উপযোগী বলে নিশ্চিত করা হয়। সেই হিসেবে ২০৪০ সাল পর্যন্ত সেতুটি নিরাপদভাবে ট্রেন চলাচলের উপযোগী থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। রেলওয়ে প্রকৌশলীদের মতে, নিয়মিত ও যথাযথ পরিচর্যা অব্যাহত থাকলে ২০৪০ সালের পরও আরও কিছু বছর সেতুটি ব্যবহার করা সম্ভব হতে পারে।

পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের প্রকৌশল বিভাগের এক নির্বাহী প্রকৌশলী জানান, শতবর্ষ পূর্তির পর ২০১৫-১৬ সালে পরিচালিত বিশেষ পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে বিশেষজ্ঞ দল ২০৪০ সাল পর্যন্ত সেতুর কার্যকারিতা নিশ্চিত করে। ওই প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৯-২০ অর্থবছরে সেতুর ওপর ট্রেন চলাচলের সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ২৫ কিলোমিটার থেকে বাড়িয়ে ৪০ কিলোমিটার করা হয়।

তিনি বলেন, ২০০৬-০৭ সালের দিকে সেতুর বয়স বিবেচনায় ট্রেনের গতি কমিয়ে ঘণ্টায় ২৫ কিলোমিটার নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও কাঠামোগত সক্ষমতা যাচাইয়ের পর বর্তমানে ঘণ্টায় ৪০ কিলোমিটার গতিতে ট্রেন চলাচল করছে। ভবিষ্যতেও যথাযথ পরিচর্যা অব্যাহত থাকলে সেতুটি দীর্ঘদিন ব্যবহারের সুযোগ থাকবে।

লোকোমাস্টার (ট্রেনচালক) রবিউল ইসলাম জানান, ২০২০ সালের আগে সেতুর ওপর দিয়ে ঘণ্টায় ২৫ কিলোমিটার গতিতে ট্রেন চালানো হতো। বর্তমানে ঘণ্টায় ৪০ কিলোমিটার গতিতে ট্রেন চললেও কোনো ধরনের সমস্যা অনুভূত হয় না। তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে রেলপথের অবস্থা বিবেচনায় গতি সীমিত করা হলেও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের কারণে হার্ডিঞ্জ ব্রিজে ট্রেনের গতি বরং বাড়ানো হয়েছে।

পাকশী বিভাগীয় সেতু প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন বলেন, ২০১৫ সালের গবেষণায় সেতুটির কাঠামোগত সক্ষমতা আরও ২৫ বছরের জন্য নিশ্চিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ চাহিদা বিবেচনায় সরকার হার্ডিঞ্জ ব্রিজের পাশে নতুন একটি রেলসেতু নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। রেলওয়ের আরসিআইপি (RCIP) প্রকল্পের আওতায় হার্ডিঞ্জ ব্রিজের প্রায় ৩৫০ মিটার উজানে নতুন সেতু নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই ও নকশা প্রণয়নের কাজ বর্তমানে চলমান রয়েছে।

ব্রিটিশ আমলে নির্মিত হার্ডিঞ্জ ব্রিজ শুধু একটি রেলসেতুই নয়, এটি বাংলাদেশের ইতিহাস ও প্রকৌশল ঐতিহ্যের এক অনন্য স্মারক। পদ্মা নদীর ওপর নির্মিত এই সেতু ১৯১৫ সালের ৪ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রেন চলাচলের জন্য উদ্বোধন করা হয়। তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জের নামানুসারে এর নামকরণ করা হয় ‘হার্ডিঞ্জ ব্রিজ’।

এক শতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সেতুটি আজও তার দৃঢ়তা, সৌন্দর্য ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব অক্ষুণ্ন রেখেছে। বাংলাদেশের উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলের মধ্যে রেল যোগাযোগের অন্যতম প্রধান সেতুবন্ধন হিসেবে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।

হার্ডিঞ্জ ব্রিজের পাশেই ২০০৪ সালে নির্মিত হয়েছে লালন শাহ সেতু। এছাড়া অদূরেই দৃশ্যমান দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের বিশাল কুলিং টাওয়ার। পদ্মার বুকে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ, লালন শাহ সেতু এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র—এই তিন স্থাপনার সম্মিলিত দৃশ্য এক মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্যের সৃষ্টি করেছে। প্রতিদিনই এসব স্থাপনা দেখতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে অসংখ্য দর্শনার্থী এখানে ভিড় করেন।

ইতিহাস, ঐতিহ্য, প্রকৌশল দক্ষতা ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপূর্ব সমন্বয়ে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ আজও দেশের অন্যতম গৌরবময় স্থাপনা হিসেবে সমানভাবে মহিমান্বিত হয়ে রয়েছে।

ইত্তেফাক/এএইচপি