এতটা তরুণ, এতটা টগবগে, এতটা উচ্ছ্বলতা—বিশ্বকাপ ফুটবলে আর কেউ কি দেখেছেন। বিশ্বকাপের মঞ্চে কি অবিশ্বাস্য ফুটবলটাই না খেলছেন লিওনেল মেসি। দর্শককে মোহিত করে রাখার জাদু জানেন তিনি। একবিন্দু ভয়ভীতি নেই যার মনে। প্রতিপক্ষের রক্ষণদুর্গ ভেঙে চুরমার করে দেওয়ার কী অসাধারণ ক্ষমতাই না সৃষ্টিকর্তা উপহার দিয়েছেন মেসিকে। সেই ২০০৬ জার্মানি বিশ্বকাপ ফুটবলে অভিষেক হয়েছিল যার, সেই মানুষটি টানা ছয়টা বিশ্বকাপ খেলে ফেললেন। ২০২২ বিশ্বকাপ উপহার দিয়েছেন আর্জেন্টাইনদের। এরপর তো তার ফুরিয়ে যাওয়ার কথা কিন্তু তা হয়নি। কাতার বিশ্বকাপের চেয়েও আরো বেশি মেজিক দেখাচ্ছেন মেসি। খেলা দেখে বুঝার উপায় নেই ফুটবলের বরপুত্র মেসি ৩৮ পেরিয়ে ৩৯ চল্লিশে পা দিচ্ছেন। আজ ২৩ জুন মেসির জন্মদিন। উনচল্লিশে পা দিচ্ছেন। একেবারে টগবগে এক ফুটবলার। কাতার বিশ্বকাপের চেয়ে এবার আরো উন্নত ফুটবল উপহার দিচ্ছেন।
অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ২-০তে জিতল আর্জেন্টিনা। মেসি জোড়া গোল করে বিশ্বকাপে ১৮ গোলের মালিক হলেন। স্মরণীয় হয়ে থাকলেন মেসি। ২২ জুন তারিখটি সারাজীবন ফুটবল দুনিয়া মনে রাখবে। যেমনটা মনে রেখেছে ৮৬ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালের ম্যাচটি। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার মারাদোনার সেই বিখ্যাত গোল, ‘হ্যান্ড অব গড।’ যেটি নিয়ে আজও ফুটবল দুনিয়া তর্ক-বিতর্ক করছে। ইংল্যান্ডের জন্য সেই দিনটি ছিল খারাপ বলা হলেও আর্জেন্টিনার জন্য সেই দিনটি ছিল সবচেয়ে আনন্দের। আজও স্মরণীয় হয়ে রয়েছে মেক্সিকো বিশ্বকাপ। ঠিক তেমনিভাবেই যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসের আর্লিংটনের কথা আর্জেন্টিনার মেসির কথা স্মরণ করবে। এখানেই যে সর্বোচ্চা গোলদাতা হলেন তিনি। ২ ম্যাচে ৫ গোল করে ফেললেন।
প্রশ্ন উঠছে, এই বয়সে কীভাবে মেসি ফুটবল দুনিয়াকে তার দিকে ঘুরিয়ে রেখেছেন। দিনে দিনে আরো ভালো খেলে যাচ্ছেন মেসি। কোন জাদুবলে তিনি ফুটবল দুনিয়াকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছেন মেসি।
আর্জেন্টাইন সাংবাদিক সার্জিও লেভানস্কি আর্জেন্টিনা ফুটবল দলের সঙ্গে খুবই ঘনিষ্ঠ। তিনি খোঁজ রেখেছেন কীভাবে মেসি নিজেকে এখনো এমন উচ্চতায় রেখেছেন। যাকে কেউ ছুঁতে পারছেন না।
কাতার বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দে সবাই মাতোয়ারা। মেসি তখন পিএসজিতে ফরাসি ফুটবল মাতিয়ে বেড়াচ্ছেন। পিএসজি ছেড়ে কোথায় যাবেন—এ নিয়ে ফুটবল দুনিয়ায় হাজারো জল্পনা-কল্পনা। ফুটবল পণ্ডিতরা বলাবলি করলেন বার্সেলোনায় ফিরবেন মেসি। কেউ নিশ্চিত করে ফেললেন মেসির সামনে পেট্রোডলারের হাতছানি, সৌদি আরবে খেলবেন মেসি। এসব জল্পনার মধ্যে মেসির বাবাও সৌদি আরব সফর করেছেন। তারপরই ঘটল তার উলটো। সবাইকে বোকা বানিয়ে মেসি যোগ দিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টার মায়ামিতে।
২০২৬ বিশ্বকাপ মাথায় রেখেই যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টার মায়ামিতে যোগ দিয়েছিলেন মেসি। ইন্টার মায়ামিতে চুক্তি করার সময় মেসি কিছু শর্ত দিয়েছিলেন। সেই শর্তগুলো মানতে হবে। ২০২৬ বিশ্বকাপের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে মেসি কিছু পরিকল্পনা নিয়েছিলেন। সেগুলো শর্ত হিসাবে ইন্টার মায়ামিকে সহজভাবে নিতে হবে এবং সেটি গোপন থাকবে। নিজেকে প্রস্তুত করতেই ইন্টার মায়ামিকে বেছে নিয়েছিলেন মেসি। কোচ স্কালোনির সঙ্গে আলোচনা করেই মায়ামিতে যোগ দেন। স্কালোনির সঙ্গে কথাই হয়েছিল বিশ্বকাপের প্রস্তুতির জায়গা যুক্তরাষ্ট্রের আকাশের নিচে, ইন্টার মায়ামির ছাদের তলায়। সেখান থেকেই ২০২৬ বিশ্বকাপের দৌড় শুরু করবেন মেসি, সেটাই করেছেন। ইন্টার মায়ামির শেষ চার ম্যাচেই দেখা গেছে মেসি নিজেকে কতটা এগিয়ে নিয়েছেন। ২০২৫ মেজর সকার লিগে ইন্টার মায়ামিকে চ্যাম্পিয়ন করেছেন মেসি। এটাই ছিল ইন্টার মায়ামির প্রথম লিগ শিরোপা।
১০ জুন আইসল্যান্ডের বিপক্ষে বিশ্বকাপ প্রস্তুতি ম্যাচে আর্জেন্টিনা ৩-০ গোলে জিতেছে।
২০১৮ বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে আইসল্যান্ডের বিপক্ষে ড্র (১-১) করেছিল আর্জেন্টিনা। ২০২২ বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে সৌদি আরবের কাছে হেরেছিল আর্জেন্টিনা। সেই ভয় ছিল এবারও। কাতার বিশ্বকাপের পরই সবকিছু মাথায় ঢুকিয়েছিলেন কোচ স্কালোনি এবং মেসি।
’৮৬ বিশ্বকাপ জয় করে পরের বছর মারাদোনা ইতালিয়ান ক্লাব নাপোলিতে যোগ দিয়েছিলেন। নাপোলি ছিল ইতালি লিগের একেবারে নিচের একটি দল। সেই দলকে চ্যাম্পিয়ন করেছেন মারাদোনা। কাতার বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে ইন্টনার মায়ামিকে চ্যাম্পিয়ন করেন মেসি। ইন্টার মায়ামির সঙ্গে চুক্তিপত্রে মেসির শর্ত মেনে নিয়ে মেসিকে প্রয়োজনে আর্জেন্টিনাতে ডাক্তারের কাছে যাওয়া-আসা করবেন। মেসি ডিপলকে ইন্টার মায়ামিতে নেন, সঙ্গে কোচ হিসেবে হোয়োসকে নিয়েছেন। এখন যিনি ইন্টার মায়ামির কোচ। ইন্টার মায়ামির সঙ্গে চুক্তিতে মেসি যা করেছেন তার মূল উদ্দেশ্য ছিল ২০২৬ বিশ্বকাপ ফুটবল। মায়ামিতে থাকাকালীন মেসি কখন কোথায় কী করছেন, প্রতি মুহূর্তের খবর জানতেন কোচ স্কালোনি, কিন্তু সবই গোপন রাখা হতো।
মারাদোনার সঙ্গে অনেক কিছু মিল থাকলেও অমিলও রয়েছে মারাদোনার এবং মেসির মধ্যে। মেসির ফুটবলের প্রতি সাধারণ মানুষের ভালোবাসা কম না। শ্রদ্ধা অনেক বেশি। কারণ মেসি খুবই শৃঙ্খল। খুবই বিনয়ী। ক্যারিয়াররটা লালকার্ড দিয়ে শুরু হলেও আসলে তার কোনো অভিযোগ নেই। খেলার সময় মেরে মাটিতে ফেলে দিলেও কথা বলেন না। ২০১১ সালে ঢাকার বাজে মাঠে নাইজেরিয়ার বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ খেলে তিনি প্রমাণ করেছেন নাচতে জানলে উঠান বাঁকা হলেও অসুবিধা নেই। এত উঁচুতে গিয়েও মেসির মাথা সব সময় নিচেই থাকে। অহংবোধ দেখান না। কঠিন অধ্যবসায়, পরিশ্রম আর শৃঙ্খল থাকার কারণেই আজ ৩৯ বছর বয়সেই মেসি মেসি-ই হয়ে রয়েছেন।
মেসির চেয়েও বেটার ক্যারিয়ার ছিল মারাদোনার। অনেক কিছুই পেতে পারতেন। মারাদোনার সহজাত প্রতিভা ছিল অসামান্য। তবে সাফল্যের বিচারে মেসির ক্যারিয়ার আরো বেশি সমৃদ্ধ। মেসি আর মারাদোনাকে পার্থক্য করতে গিয়ে আর্জেন্টাইন ৬৮ বছর বয়সি সাংবাদিক সার্জিও লেভানস্কি বলেছেন, ‘দিয়েগো, পোপ, ফিদেলকে নিয়ে কথা বলতেন। আর মেসি গুরুত্ব দেন ফুটবল, পরিবার, বন্ধুদেরকে। দিয়েগো খেলার গণ্ডি ছেড়ে গিয়েছিলেন; মেসি রাজনীতি নিয়ে কথা বলেননি।’

