রাজধানীতে পুড়ে যাওয়া বঙ্গবাজার মার্কেটের ১০৬ কাঠা জমির ওপর উঠছে ১০ তলা ভবন। যার নাম ‘বঙ্গবাজার পাইকারি নগর বিপণিবিতান' ইতিমধ্যে মার্কেটের ২ হাজার ৯৬১ জন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী বঙ্গবাজার কমপ্লেক্সে দোকান বরাদ্দ পেয়েছেন। তবে বরাদ্দ বুঝে পাওয়ার আগেই সেই বরাদ্দের কিস্তির টাকা জমার সঙ্গে অতিরিক্ত চাঁদা দিতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। মালিক সমিতির নামে এই টাকা নেওয়া হচ্ছে। অতিরিক্ত ১০ হাজার টাকাসহ জমা দিতে হচ্ছে মালিক সমিতির অফিসে। কিস্তির রিসিট সরাসরি জমা নিচ্ছে না সিটি করপোরেশনও। প্রায় ৩ হাজার ব্যবসায়ীর এই কোটি টাকার চাঁদা সিটি করপোরেশনের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও মালিক সমিতির পকেটে যাচ্ছে বলে জানা গেছে। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ীরা।
জানা গেছে, বঙ্গবাজার মার্কেটের ভবনটিতে বেজমেন্ট, গ্রাউন্ড ফ্লোর আর আটটি ফ্লোর থাকবে। গ্রাউন্ড ফ্লোর থেকে সপ্তম তলা পর্যন্ত থাকবে ৩০৪২টি দোকান। এর মধ্যে গ্রাউন্ড ফ্লোরে ৩৮৪টি, প্রথম তলায় ৩৬৬টি, দ্বিতীয় তলায় ৩৯৭টি, তৃতীয় ও পঞ্চম তলায় ৩৮৭টি করে ৭৭৪টি, চতুর্থ ও ষষ্ঠ তলায় ৪০৪টি করে ৮০৮টি এবং সপ্তম তলায় ৩১৩টি দোকান থাকবে। ৩০২০টি সাধারণ দোকানের জায়গায় বঙ্গবাজার কমপ্লেক্সের বঙ্গবাজার হকার মার্কেটের জন্য ৯১৮টি, গুলিস্তান হকার্স মার্কেটের জন্য ৮২৯টি, মহানগর হকার্স মার্কেটের জন্য ৫৭২টি এবং আদর্শ হকার্স মার্কেটের জন্য ৭০১টি দোকানের বরাদ্দ রেখে নকশা করা হয়েছে। নতুন এ ভবনে ভস্মীভূত বঙ্গবাজার কমপ্লেক্সের চেয়ে ৮১টি দোকান বেশি থাকবে বলে জানা গেছে। প্রতিটি দোকানের আয়তন হবে ৮০-১০০ স্কয়ার ফিট।
ঢাকায় পাইকারি কাপড়ের অন্যতম বড় আড়ত বঙ্গবাজারে ২০২৩ সালের এপ্রিলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। অগ্নিকাণ্ডে চারটি মার্কেটের ৫ হাজার দোকান ভস্মীভূত হয়। পুড়ে ছাই হয় হাজার হাজার ব্যবসাহীর স্বপ্ন ও কর্মচারীদের জীবিকার অবলম্বন। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) বহুতল ভবনের এই মার্কেট নির্মাণে প্রায় ৩৬৫ কোটি টাকা ব্যয় হবে। খরচ নেওয়া হবে দোকানমালিকদের কাছ থেকে। বর্তমানে তৃতীয় তলার কাজ দৃশ্যমান।
সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, দোকান বরাদ্দ পেতে ব্যবসায়ীদের কমবেশি ২০ লাখ টাকা সিটি করপোরেশনের তহবিলে জমা দিতে হবে। পাঁচ কিস্তিতে টাকা নেওয়া হবে। ইতিমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা ধারদেনা করে কিস্তির টাকা দেওয়া শুরু করেছেন। প্রথম কিস্তি পরিশোধের সময় অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হয়নি। তৃতীয় কিস্তির টাকা জমা দেওয়ার জন্য সবাইকে বাড়তি ১০ হাজার করে টাকা চাঁদা দিতে হচ্ছে। দ্বিতীয় কিস্তির সময় ব্যবসায়ীরা চাঁদা দিয়েছিল ১ হাজার ৫০০ টাকা করে।
অভিযোগ উঠেছে, চাঁদার অর্থের একটি অংশ সিটি করপোরেশনের ৮ টেবিলে। গত ৫ মে ডিএসসিসি থেকে বঙ্গবাজার কমপ্লেক্স দোকান মালিক সমিতির সভাপতি/সাধারণ সম্পাদককে একটি চিঠি দেওয়া হয়। চিঠিতে ক্ষতিগ্রস্ত ২ হাজার ৯৬১ জন সদস্যকে তৃতীয় কিস্তির ৩ লাখ টাকা অগ্রিম সালামি পরিশোধের কথা জানানো হয়। একই সঙ্গে যারা দ্বিতীয় কিস্তি দেয়নি তাদের ৬ লাখ টাকা দিতে বলা হয়। সে অনুযায়ী সমিতির পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের পে-অর্ডারের মাধ্যমে সালামির টাকা জমা দিতে বলা হয়েছে। বঙ্গবাজারের সপ্তম তলার সমিতির অফিসে গিয়ে দেখা গেছে, পে-অর্ডারের স্লিপ জমা দিচ্ছে ব্যবসায়ীরা। চারটি টেবিলে এসব স্লিপ গ্রহণের কাজ করছে সমিতির নিয়োগ করা ব্যক্তিরা। বঙ্গ ইউনিটের দায়িত্বপ্রাপ্ত রাসেল দোকানিদের পে- অর্ডারের স্লিপ গ্রহণ করে রেজিস্ট্রার খাতায় লিপিবদ্ধ করেন। এরপর আরেকটি বই বের করে ১০ হাজার টাকার একটি রশিদ ধরিয়ে দেন। ১০ হাজার টাকা নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে মুচকি হেসে তিনি বলেন, এটা সবাই জানে। নতুন করে বলার কিছু নেই। এ টাকা বেতন-ভাতা ও অফিস খরচ বাবদ ব্যয় করা হবে বলে রশিদের নিচে উল্লেখ আছে। একইভাবে গুলিস্তান, মহানগর ও আদর্শ ইউনিটের টেবিলেও পে-অর্ডারের সঙ্গে নেওয়া হচ্ছে ১০ হাজার টাকা করে। এ ব্যাপারে কেউ কোনো প্ৰশ্ন করছে না। কেউ 'সিস্টেম' মেনে, কেউবা বাধ্য হয়ে দিচ্ছে চাঁদার এ বাড়তি টাকা।
শুধু তৃতীয় কিস্তির সালামি আদায়ের নামে ১০ হাজার করে চাঁদা ওঠে মোট ২ কোটি ৯৬ লাখ ১০ হাজার টাকা। এ টাকা সমিতির কোনো খাতে ব্যয় করা হবে, কারা নেবে সে প্রশ্ন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে। তারা বলেন, এ টাকা নিয়ে প্রশ্ন করলে দোকানের বরাদ্দই বাতিল হয়ে যেতে পারে। এর আগে আরো দুটি কিস্তি দিয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা। প্রথম কিস্তির ১ লাখ টাকার সঙ্গে বাড়তি টাকা দিতে হয়নি। তবে দ্বিতীয় কিস্তির ৩ লাখ টাকার সঙ্গে সবাইকে দিতে হয়েছে ১ হাজার ৫০০ টাকা করে। তৎকালীন কমিটির নেতারা হাতে লেখা স্লিপ দিয়ে এ টাকা নিয়েছে। ঐ টাকার একটি বড় অংশ গেছে সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তাদের আটটি টেবিলে। এ বিষয়ে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উপ-প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা আতাহার আলী খান বলেন, কিস্তির টাকা ছাড়া বেশি টাকা নেওয়ার কথা নয়। তারপরেও আমি এ বিষয়ে খোঁজখবর নেব। কেউ এর সঙ্গে জড়িত থাকলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে জানার জন্য বঙ্গবাজার কমপ্লেক্স (গুলিস্তান ইউনিট) সাধারণ সম্পাদক মো. আব্দুল বাসেত বলেন, আমি এ বিষয়ে জানি না। এর সাথে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। এ বিষয়ে জানার জন্য সভাপতি মোজাম্মেল হক মজুকে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি ধরেননি।

