বন্ধ মিলের রক্ষণাবেক্ষণে সরকারের ব্যয় কোটি টাকা

আপডেট : ০৪ জুলাই ২০২৬, ১৩:০১

উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ, অথচ প্রতি মাসেই নিয়মিত গুনতে হচ্ছে মোটা অঙ্কের টাকা। দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা সিরাজগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী ‘জাতীয় জুট মিল’-এর নিরাপত্তা, রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রশাসনিক কার্যক্রম চালাতেই সরকারের প্রতি মাসে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ লাখ টাকা। বছরে এই ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮ কোটিরও বেশি, অথচ সেখান থেকে সরকারের কোনো আয় শূন্য। 

একদিকে বছরের পর বছর বন্ধ থাকায় মিলের কোটি কোটি টাকার মূলবান যন্ত্রপাতিতে মরিচা ধরছে, অন্যদিকে কর্মহীন হয়ে থমকে গেছে এই মিলের ওপর নির্ভরশীল হাজারো শ্রমিকের জীবন। সব জটিলতা কাটিয়ে দ্রুত মিলটি পুনরায় চালুর দাবি জানিয়েছেন মিলের শ্রমিক ও স্থানীয়রা।

বর্তমানে বন্ধ থাকা মিলটির মরিচা ধরা মেশিন ও কোটি টাকার যন্ত্রাংশ দেখভাল করার জন্য ১৮৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছে। তাদের নিয়মিত বেতন বিদুৎ বিলসহ নানান খরচ মিলিয়ে প্রতি মাসে প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ লাখ টাকা গুনতে হচ্ছে সরকারকে।

জানা যায়, সিরাজগঞ্জ পৌরসভার রায়পুর এলাকায় ১৯৬০ সালে ৭৫ একর জায়গার উপর নির্মাণ করা হয় জুট মিলটি। পরবর্তীতে জাতীয়করণ হয়ে ‘জাতীয় জুট মিল’ নামে পরিচিতি পায়। দীর্ঘদিন লাভজনক থাকলেও দুর্নীতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও অব্যবস্থাপনার কারণে লোকসানে পড়ে ২০০৭ সালে উৎপাদনসহ বন্ধ হয়ে যায় মিলটি।

পরে শ্রমিকদের তীব্র আন্দোলনের মুখে ২০১১ সালে মিলটি পুনরায় চালু করা হলেও ২০২০ সালের ১ জুন আবারও এটি বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এরপর ২০২২ সালে কুষ্টিয়ার বেসরকারি শিল্প গ্রুপ ‘রশিদ গ্রুপ’ মিলটি লিজ (ভাড়া) নিয়ে আংশিক উৎপাদন শুরু করে। কিন্তু মাত্র দুই বছরের মাথায় ২০২৪ সালে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা ও বোনাস বকেয়া রেখেই রশিদ গ্রুপ মিলটি পুনরায় বন্ধ করে চলে যায়। এরপর থেকেই চরম অর্থনৈতিক সংকটে দিন কাটাচ্ছেন এখানকার শ্রমিক-কর্মচারীরা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাব, দলীয়করণ, দুর্নীতি ও লুটপাটের কারণেই বারবার বন্ধের মুখে পড়েছে এই শিল্প প্রতিষ্ঠান। তাদের মতে, দ্রুত মিলটি চালু করা গেলে যেমন হাজারো শ্রমিকের কর্মসংস্থান হবে, তেমনি পাট চাষিরাও তাদের উৎপাদিত পাটের ন্যায্য মূল্য পাবেন। এতে স্থানীয় অর্থনীতিও ফিরে পাবে নতুন গতি।

সাবেক শ্রমিক রতন আলী বলেন, মিল চালু থাকাকালে প্রতি সপ্তাহে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা আয় করতেন। বর্তমানে ঘটকালি ও সামান্য কৃষিকাজ করে কোনোমতে সংসার চালাতে হচ্ছে।

আরেক শ্রমিক বেলাল হোসেন বলেন, জুট মিলই ছিল পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস। মিল বন্ধ হওয়ার পর বিভিন্ন অস্থায়ী কাজ করে কষ্টে দিন কাটছে। মিল পুনরায় চালু হলে পুরোনো শ্রমিকদের অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানান তিনি।

সিরাজগঞ্জ জেলা শ্রমিক দলের (ভারপ্রাপ্ত) সভাপতি বিশা শেখ বলেন, জাতীয় জুট মিল শুধু একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান নয়, এটি জেলার অর্থনীতি, পাটচাষি ও হাজারো শ্রমিকের জীবিকার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মিলটি চালু হলে কর্মসংস্থান বাড়বে, কৃষক ন্যায্যমূল্য পাবেন এবং পরিবেশ-বান্ধব পাট-পণ্যের উৎপাদনও বৃদ্ধি পাবে।

জাতীয় জুট মিলের মজদুর ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি আনোয়ার হোসেন বলেন, সরকারের উচিত দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে মিলটি পুনরায় চালু করা। এতে শ্রমিক, কৃষক, ব্যবসায়ী এবং স্থানীয় অর্থনীতি সবাই উপকৃত হবে।

সিরাজগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান বাচ্ছু বলেন, দীর্ঘদিন ধরে মিলটি বন্ধ থাকায় শুধু হাজারো শ্রমিকই কর্মহীন হননি, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন পাটচাষি, ব্যবসায়ী, পরিবহন খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং স্থানীয় অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল অসংখ্য মানুষ। বর্তমান সময়ে পরিবেশবান্ধব পাটপণ্যের বিশ্ববাজারে চাহিদা বাড়ছে। তাই সরকারের উচিত দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে জাতীয় জুট মিল পুনরায় চালু করা। এতে একদিকে যেমন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, অন্যদিকে পাটচাষিরা তাদের উৎপাদিত পাটের ন্যায্যমূল্য পাবেন।

জাতীয় জুট মিলের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন জানান, মিলটি বাংলাদেশ জুট মিলস কর্পোরেশনের (বিজেএমসি) অধীনে রয়েছে। বর্তমানে ১৮৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলটির দেখভালের দায়িত্বে রয়েছেন। তাদের বেতন, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য খাতে প্রতি মাসে প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে। তবে নতুন করে লিজ দেওয়ার উদ্যোগ চলছে। উপযুক্ত বিনিয়োগকারী পাওয়া গেলে পুনরায় উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হবে। এছাড়া দেশের কয়েকটি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল পুনরায় চালুর বিষয়েও সরকারের উদ্যোগ রয়েছে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

 

ইত্তেফাক/এমএসআর