মুসা সাদিক
বাঙালি জাতির মহামানব ও বাঙালি জাতির মুক্তিদূত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবার হারানোর বেদনায় বিশ্বের দেশে দেশে আজও বাঙালি জাতি ও মানবজাতি বেদনায়-শোকে মুহ্যমান। রোজ কেয়ামত পর্যন্ত বাঙালি জাতি বুক চাপড়ে চাপড়ে তাদের প্রাণের প্রিয় শেখ মুজিবুর রহমানকে স্মরণ করে মাতম করে যাবে। মানবজাতির মুক্তির ও শান্তির সন্ধানে তাঁর যে অভিযাত্রা আজ বিশ্বলোকে ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বমানব জাতি তাঁর ভালোবাসার কিরণে আজ ধন্য। ৭১-এর ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশের মহান বিজয় অর্জনের পরেও বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের মাটিতে বঙ্গবন্ধুর চরণ স্পর্শ না করা পর্যন্ত ইউরোপ, আমেরিকাসহ আরব বিশ্বের দেশগুলো প্রচারণা চালাচ্ছিল যে বাংলাদেশের মাটি থেকে ভারতের সেনাবাহিনী কখনো কেউ প্রত্যাহার করতে সমর্থ হবে না। এমন কি এশিয়ার দেশগুলোতেও অনুরূপ বিশ্বাস ছড়িয়ে পড়েছিলো।
ইউরোপের পত্র-পত্রিকা ও টিভি-রেডিওতে প্রতিনিয়ত আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছিল যে, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় থেকে বিজয়ী মিত্রবাহিনীর সৈন্যরা গত ৮০ বছর যাবত্ জার্মানি, ইতালি, জাপানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ঘাঁটি করে আজও তাদের ভূমি দখল করে অবস্থান করছে। সেখানে শক্তিহীন ক্ষুদ্র বাংলাদেশ কিভাবে ভারতীয় বিজয়ী বাহিনীকে ফেরত পাঠাতে সমর্থ হবে? কিন্তু বঙ্গবন্ধুর কারিশমা অবলোকন করতে বিশ্ববাসীকে তখনো অপেক্ষা করতে হয়েছে। ১৯৭২ সালের ৯ জানুয়ারি পাকিস্তান থেকে লন্ডনের বিমান বন্দরে পৌঁছে তিনি লন্ডনস্থ ভারতীয় দূতাবাসের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা শ্রী শশাঙ্ক শেখর ব্যানার্জি। যিনি ১৯৬০-এর দশকে ঢাকায় ভারতীয় দূতাবাসে Political Councilor পদে কর্মরত ছিলেন, সেই সূত্রে বঙ্গবন্ধুর পূর্ব পরিচিতি ছিলেন তিনি। তাঁর সঙ্গে কথা বলতে চাইলেন। ১০ই জানুয়ারি, ১৯৭১ তিনি লন্ডন থেকে ঢাকা পর্যন্ত ব্রিটিশ রয়েল এয়ার ফোর্সের সামরিক বিমানে বঙ্গবন্ধুর পাশের সিটে বসে বঙ্গবন্ধুকে সঙ্গ দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের প্রারম্ভে বলে দেন যে, শশাঙ্ক যেন শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীকে তাঁর পক্ষ থেকে দিল্লিতে আগাম বার্তা দিয়ে দেন যে, তিনি দিল্লিতে পৌঁছালে ইন্দিরা গান্ধী যেন তিন মাসের মধ্যে অর্থাত্ ১৯৭২ সালের মার্চ মাসের মধ্যে ভারতীয় সকল মিত্রবাহিনীকে বাংলাদেশের মাটি থেকে প্রত্যাহারের বিষয়ে বঙ্গবন্ধুর প্রস্তাবে সম্মতি দেন। বঙ্গবন্ধু দিল্লি পৌঁছানোর বহু আগেই শ্রী শশাঙ্ক বঙ্গবন্ধুর বার্তা দিল্লিতে ইন্দিরা গান্ধীকে সাইফার মেসেজের মাধ্যমে পৌঁছে দেন।
১০ই জানুয়ারি, ১৯৭২-এর সকালে দিল্লির পালাম বিমানবন্দরে বঙ্গবন্ধু অবতরণ করলে তাঁকে ঐতিহাসিক মর্যাদা দান করা হয়। ভারতের রাষ্ট্রপতি, ভারতের প্রধানমন্ত্রী, ভারতের পুরো মন্ত্রিসভা, ভারতের তিনবাহিনীর প্রধান এবং ভারতের উচ্চপদস্থ সচিবরা দিল্লির পালাম বিমান বন্দরে টারমাকে তাঁকে অভ্যর্থনা জানান এবং তাঁর ওপর পুষ্প বর্ষণ করেন। তিনি রাষ্ট্রপতি ভবনে গেলে, ইন্দিরা গান্ধী তাঁর প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে বলেন যে, আপনার সদিচ্ছা মোতাবেক ভারতের মিত্রবাহিনী ভারতের মাটিতে ভারত সরকার প্রত্যাহার করে নিবে।
বাংলাদেশের মাটিতে চরণ স্পর্শ করার আগেই বঙ্গবন্ধুর এই ঐতিহাসিক সাফল্যকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাজধানীতে চমকের ঢেউ বয়ে যায়। বিশ্ববাসী বিস্ময়াভিভূত নেত্রে আকাশ পানে তাকিয়ে প্রত্যক্ষ করেন ‘শেখ মুজিব বিশ্বের উদীয়মান তারকা জ্বল জ্বল করে জ্বলছে আকাশ জুড়ে।’
১০ই জানুয়ারি, ১৯৭২ বাংলাদেশে পৌঁছেই তিনি লক্ষ্য করেন যে, পাকিস্তানী বাহিনী পরাজয় নিশ্চিত জেনে এদেশে পোড়ামাটি নীতি বাস্তবায়ন করে। ফলে বাংলাদেশকে তারা ছাইভস্মের দেশ করে রেখে যায়। ব্যাংকের নোট সব পুড়িয়ে দেয়। বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী ও চিন্তাবিদদের হত্যা করে। বাংলাদেশ হয়ে পড়ে একটি পঙ্গু দেশ ও পঙ্গু জাতি। বাংলাদেশের ভবিষ্যত্ সবকিছু অন্ধকারের গভীরে নিমজ্জিত হয়ে পড়ে। সেই অজানা ভবিষ্যত্ ও দুর্যোগঘন অন্ধকারে বাঙালি জাতির সম্মুখে ছিল মহান আল্লাহর থেকে শুধু একটি আশার আলো ‘শেখ মুজিব।’ বাঙালি জাতির মুক্তিদূত। বাঙালি জাতির অমর প্রাণ, সূর্যের নামে নাম, শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর নামের পরশে বাঙালি জাতি প্রাণ ফিরে পেলো। ছাইভস্মের মধ্যে থেকে সবুজ বাংলাদেশ জেগে উঠলো। ৩০ লাখ শহিদের শোক কাটিয়ে বঙ্গবন্ধুর বরাভয়ে বাঙালি জাতি হিমালয়ের শক্তিতে উঠে দাঁড়ালো। যুদ্ধাহত-বিধ্বস্ত লাখ লাখ বীর মুক্তিযোদ্ধা নগ্নপায়ে গ্রাম-বাংলার পথ পাড়ি দিয়ে, পদ্মা-মেঘনা-যমুনার ঢল বেয়ে, লম্বা চুল আর খোঁচা খোঁচা দাড়ি মুখে, হাতে গ্রেনেড ও কাঁধে থ্রি নট থ্রি ও স্টেনগান নিয়ে ঢাকা স্টেডিয়ামে এসে তাঁর চরণে সমর্পণ করলেন। তাঁর চরণ ধূলি মাথায় নিয়ে সেই ৯ মাসের বীর তরুণ বালকেরা ‘জয় বাংলা’, ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ ধ্বনিতে মুখরিত করে সারাদেশ।
৭১-এ বঙ্গবন্ধু ডাক দিলেন। তারা মায়ের আঁচল ছেড়ে যুদ্ধে এলো। ৭২-এ বঙ্গবন্ধু ডাক দিলেন। আবার তারা মায়ের কোলে ফিরে গেল। মানব জাতির ইতিহাসে অস্ত্র ছেড়ে যোদ্ধাদের ফিরে যাবার দ্বিতীয় কোনো নজির নেই। পাকিস্তানিদের ফেলে যাওয়া পোড়ামাটির দেশে সবুজ বিপ্লবের ডাক দিলেন তিনি। রাজধানী থেকে শহর-বন্দর, গ্রাম-বাংলা যুগে প্রতিটি ভূখণ্ডে, এমনকি পরিত্যক্ত ডোবা-নালা, রাস্তা-ঘাটে সবুজ খাদ্য শস্যের চাষ হলো। গরিব মেহনতি মানুষের মুখে হাসি ফুটলো। যেন “কাননে কুসুম কলি সবই ফুটিলো।
বিশ্ব মানব জাতির এক মহামানবসম বঙ্গবন্ধু তাঁর ক্ষমা ও ভালোবাসার পুণ্যালোকে বাঙালি জাতিকে ও বিশ্ব মানব জাতিকে আলোকিত করে তুলতে চেয়েছিলেন। ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে বিশ্ব মানব জাতি সেই পুণ্যময় আলোক রশ্মিতে ঝলমল করে উঠবে, সেই স্বপ্নে তিনি বিভোর ছিলেন। সেখানে গুটিকয় নোংরা কীটপতঙ্গ তাঁর জীবনের স্বর্গীয় আরাধনাকে ম্লান করতে উঠেপড়ে লেগেছিল। সেই কীটগুলো ১৫ আগস্টে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে। দেশ থেকে একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র মুহূর্তেই খসে পড়লো পৃথিবীর আলোকউজ্জ্বল বাগান থেকে। আজ সেই হারানোর বেদনার দিন।
n লেখক :স্বাধীন বাংলা বেতারের ওয়ার করেসপন্ডেন্ট এবং সাবেক সচিব, বাংলাদেশ সরকার
