প্রকল্পের ‘ম্যানেজ মানি’ দিয়েই চলে পিআইওর কমিশন বাণিজ্য

  • উন্নয়ন প্রকল্পে ১২-১৪ শতাংশ কমিশন কেটে নেওয়ার অভিযোগ
  • কমিশন না দিলে আটকে রাখা হয় বিল 
আপডেট : ০৬ জুলাই ২০২৬, ১৯:২১

শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) ইস্রাফিল হোসাইনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প থেকে ‘ম্যানেজ মানি’ নামে কমিশন আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, টিআর, কাবিটা ও কাবিখাসহ বিভিন্ন প্রকল্পে বরাদ্দের ১২ থেকে ১৪ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ কেটে রাখা হয়। এ ছাড়া এসব প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম, নিম্নমানের কাজ এবং একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কমিশন বাণিজ্য পরিচালনার অভিযোগও উঠেছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, আগে প্রকল্পভেদে ১০ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ কেটে রাখা হলেও বর্তমানে বিভিন্ন জায়গায় ‘ম্যানেজ’ করার কথা বলে ১২ থেকে ১৪ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নেওয়া হচ্ছে। তবে মসজিদভিত্তিক কিছু প্রকল্পে তুলনামূলক কম হারে অর্থ নেওয়া হয় বলে দাবি করা হয়েছে।

এ বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে পিআইও ইস্রাফিল হোসাইন অনানুষ্ঠানিক আলাপচারিতায় কমিশন নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেননি। তবে কোথায় এই অর্থ ব্যয় হয়—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বিস্তারিত কিছু বলতে রাজি হননি। প্রতিবেদকের দাবি, এসব বক্তব্য গোপন ক্যামেরায় ধারণ করা হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে পিআইওর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাজিরা উপজেলায় গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ কর্মসূচির আওতায় প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ে টিআর, কাবিটা ও কাবিখা মিলিয়ে বিপুলসংখ্যক প্রকল্পে অর্থ ও খাদ্যশস্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব প্রকল্পের অধিকাংশ থেকেই নির্ধারিত হারে কমিশন কেটে রাখা হয়।

এদিকে, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ের কোনো কর্মকর্তা না হয়েও বাশার নামে এক ব্যক্তি অফিসের প্রায় সব কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করেন। স্থানীয় প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তির দাবি, তার মাধ্যমেই কমিশন আদায় ও প্রকল্প-সংক্রান্ত সমন্বয়ের কাজ পরিচালিত হয়।

স্থানীয় কয়েকজন জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অভিযোগ, কমিশন, অফিস ব্যয় ও অন্যান্য খাতের নামে প্রকল্পভেদে প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ বিভিন্ন পর্যায়ে চলে যায়। এতে প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায় এবং কাজের মানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

সরেজমিনে বিভিন্ন ইউনিয়নে ঘুরে দেখা গেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, অনেক প্রকল্পে শ্রমিকের পরিবর্তে যন্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে, কোথাও একই স্থানে একাধিক প্রকল্প দেখানো হয়েছে, আবার কোথাও প্রকল্পের নাম পরিবর্তন করে বরাদ্দ ব্যবহার করা হয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ভোটকেন্দ্রে সিসিটিভি স্থাপনের প্রকল্পেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।

সূত্রে জানা যায়, কুন্ডেরচর ইউনিয়নে অনিয়মের অভিযোগ সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে। এমনকি অস্তিত্বহীন প্রকল্পের বিপরীতেও বিল উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। যদিও এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কুন্ডেরচর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আক্তার হোসেন বেপারি। তার দাবি, ইউনিয়নের সব প্রকল্প শতভাগ স্বচ্ছতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করা হয়েছে।

কয়েকজন চেয়ারম্যান নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেন, কমিশন না দিলে বিল আটকে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। অন্যদিকে কিছু জনপ্রতিনিধি নিজেদের অর্থায়নে প্রকল্পের মান ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন বলেও তারা জানান।

এদিকে, বাশার নামে ওই ব্যক্তি সাংবাদিকদের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা করেন এবং পরে পিআইওর পক্ষ থেকে অর্থ দেওয়ার প্রস্তাবও আসে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্তদের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, বাশার সরকারি কর্মকর্তা না হলেও প্রকল্প-সংক্রান্ত অধিকাংশ কার্যক্রম তার মাধ্যমেই পরিচালিত হয়। এতে অফিসের স্বাভাবিক প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে এবং প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে।

এ বিষয়ে জাজিরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আল ইমরান বলেন, তিনি সদ্য দায়িত্ব নেওয়ায় বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত অবগত নন। তবে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং প্রয়োজন হলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হবে।

শরীয়তপুরের জেলা ত্রাণ ও দুর্যোগ কর্মকর্তা নাজনীন শামিমা বলেন, অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, প্রকল্প থেকে নির্দিষ্ট হারে অর্থ কেটে নেওয়ার কোনো সরকারি বিধান নেই। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং প্রকল্পগুলোর বাস্তব অবস্থাও যাচাই করা হবে।

জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগম বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছ থেকে বিস্তারিত তথ্য নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বক্তব্য দেওয়া হবে। একই সঙ্গে অভিযোগ পাওয়া প্রকল্পগুলোর বিস্তারিত তথ্যও চাওয়া হয়েছে।

এদিকে শরীয়তপুর-১ (পালং-জাজিরা) আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ আহমেদ আসলাম অভিযোগের বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রকল্পে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে বিল স্থগিতসহ দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 
ইত্তেফাক/এমএএম