প্রত্যন্ত গ্রামে জ্ঞানের বাতিঘর ‘বই ঘর পাঠাগার’

আপডেট : ০৮ জুলাই ২০২৬, ১১:৪৭

বিকেলের শেষ আলো ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়। গ্রামের মেঠোপথ ধরে একে একে ছুটে আসে শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণী, চাকরিপ্রার্থী যুবক, এমনকি প্রবীণরাও। তাদের গন্তব্য কোনো কোচিং সেন্টার নয়, নয় কোনো বিনোদনকেন্দ্র। সবার পদচারণা থামে একটি ছোট্ট ঘরের সামনে। মাথার ওপর টিনের ছাউনি, চারপাশজুড়ে বইয়ের সারি। কেউ ডুবে যায় উপন্যাসে, কেউ ইতিহাসের পাতা উল্টায়, আবার কেউ খুঁজে ফেরে স্বপ্নপূরণের দিশা।

যখন স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ঝলকানিতে হারিয়ে যাচ্ছে মানুষের অবসর, তখন গাইবান্ধার প্রত্যন্ত এক গ্রামে টিনের ছাউনির নিচে নীরবে জ্বলছে জ্ঞানের এক অনির্বাণ প্রদীপ।

এটি গাইবান্ধা জেলার বল্লমঝাড় ইউনিয়নের টেংগরজানী গ্রামের ‘বই ঘর পাঠাগার’। এটি শুধু একটি পাঠাগার নয়; বরং এক তরুণের অদম্য ইচ্ছাশক্তি, আত্মত্যাগ এবং সমাজ বদলের স্বপ্নের বাস্তব প্রতিচ্ছবি।

সেই তরুণের নাম মেহেদী হাসান (২৪)। তিনি গাইবান্ধা সরকারি কলেজের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অনার্স শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী। ছোটবেলা থেকেই সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত মেহেদী খুব কাছ থেকে দেখেছেন, শহরের তুলনায় গ্রামের শিশু-কিশোরদের বই পড়ার সুযোগ কতটা সীমিত। সেই উপলব্ধিই তাকে একটি এমন পাঠাগার গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখায়, যেখানে অর্থের সীমাবদ্ধতা কখনো জ্ঞান অর্জনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে না।

২০২০ সালে শুরু হয় সেই স্বপ্নের যাত্রা। কোনো সরকারি অনুদান বা বড় প্রতিষ্ঠানের সহায়তা ছাড়াই কলেজে যাতায়াতের ভাড়া ও টিফিনের টাকা সঞ্চয় করতে থাকেন তিনি। পরিচিতজনদের কাছ থেকে সংগ্রহ করেন বই। পরে বাবা-মায়ের সহযোগিতায় বাড়ির সামনেই গড়ে তোলেন ছোট্ট একটি পাঠাগার।

সেদিনের সেই ক্ষুদ্র উদ্যোগ আজ হয়ে উঠেছে এক অনুপ্রেরণার নাম। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, টিনের ছাউনিযুক্ত সাধারণ একটি ঘরের প্রতিটি তাক বইয়ে পরিপূর্ণ। বর্তমানে পাঠাগারটিতে রয়েছে আড়াই হাজারেরও বেশি বই। শিশুসাহিত্য, মুক্তিযুদ্ধ, ইতিহাস, বাংলা ও বিশ্বসাহিত্য, উপন্যাস, প্রবন্ধ, জীবনী, কবিতা, ছোটগল্প, ভাষাতত্ত্ব, অর্থনীতি, রাজনীতি এবং বিভিন্ন লেখকের রচনাসমগ্রসহ নানা বিষয়ের সমৃদ্ধ সংগ্রহ রয়েছে এখানে। পাশাপাশি জাতীয় দৈনিক, সাময়িকী এবং দুষ্প্রাপ্য প্রকাশনাও সংরক্ষিত রয়েছে পাঠকদের জন্য।

প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ২০ জন পাঠক নিয়মিত এখানে এসে বই ও পত্রিকা পড়েন। সদস্যরা নির্ধারিত নিয়মে বই বাড়িতেও নিয়ে যেতে পারেন। ইতোমধ্যে পাঠাগারটি গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের তালিকাভুক্তির সনদ অর্জন করেছে, যা এর কার্যক্রমে নতুন গতি এনে দিয়েছে।

তবে মেহেদীর স্বপ্ন কেবল বই ধার দেওয়া কিংবা একটি পাঠাগার পরিচালনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি বিশ্বাস করেন, একটি ভালো বই শুধু একজন মানুষের জীবন নয়, বদলে দিতে পারে একটি সমাজের চিন্তা-চেতনাও। সেই বিশ্বাস থেকেই পাঠাগারের উদ্যোগে নিয়মিত জাতীয় দিবস উদযাপন, কবি-সাহিত্যিকদের জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী পালন, চিত্রাঙ্কন, সাধারণ জ্ঞান, গল্প লেখা, কবিতা আবৃত্তি, কুইজ প্রতিযোগিতা এবং গ্রামজুড়ে বই পড়ার বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। ফলে ধীরে ধীরে নতুন প্রজন্মের মধ্যে বইয়ের প্রতি আগ্রহও বাড়ছে।

গাইবান্ধা জেলার বল্লমঝাড় ইউনিয়নের টেংগরজানী গ্রামের ‘বই ঘর পাঠাগার’

স্থানীয় শিক্ষার্থী শারমিন আক্তার বলেন, এই পাঠাগার আমাদের জন্য আশীর্বাদের মতো। প্রতিদিন এখানে এসে বই পড়ি। নতুন নতুন বিষয় জানতে পারছি, নিজেকে আরও সমৃদ্ধ করার সুযোগ পাচ্ছি।

আরেক শিক্ষার্থী আরাফাত বলেন, আগে অবসর সময়ের বেশির ভাগই মোবাইলে কাটত। এখন বই বাড়িতে নিয়ে পড়ি, আবার ফেরত দিয়ে নতুন বই আনি। বই পড়ার অভ্যাস আমার জীবন ও চিন্তাভাবনায় ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে।

বল্লমঝাড় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জুলফিকার রহমান বলেন, মেহেদী হাসানের ‘বই ঘর পাঠাগার’ শুধু একটি পাঠাগার নয়, এটি আমাদের ইউনিয়নের গর্ব। সীমিত সামর্থ্যেও তিনি যে উদ্যোগ নিয়েছেন, তা সত্যিই অনুকরণীয়। সমাজের সবাই এগিয়ে এলে এটি উত্তরাঞ্চলের অন্যতম আদর্শ জ্ঞানকেন্দ্রে পরিণত হবে।

ব্যবসায়ী ও সমাজসেবক সোহাগ মৃধা বলেন, “এমন উদ্যোগ শুধু প্রশংসা করলেই হবে না। সমাজের সামর্থ্যবান মানুষদেরও এগিয়ে আসতে হবে। তাহলেই এই পাঠাগার আরও সমৃদ্ধ হবে এবং আগামী প্রজন্মের জন্য একটি শক্তিশালী জ্ঞানভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে।”

নিজের স্বপ্নের কথা বলতে গিয়ে মেহেদী হাসান বলেন, আমি বিশ্বাস করি, একটি ভালো বই একজন মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে। তাই চাই, আমাদের গ্রামের শিশু-কিশোর ও তরুণরা মোবাইলের আসক্তি ছেড়ে বইয়ের কাছে ফিরে আসুক। এই ছোট্ট পাঠাগার শুধু বই পড়ার জায়গা নয়, এটি একটি মানবিক, সচেতন ও আলোকিত সমাজ গড়ার স্বপ্ন। যতদিন পারি, এই আলোর প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখতে চাই। সমাজের সচেতন মানুষ ও সরকারের সহযোগিতা পেলে একদিন এটি একটি আধুনিক গণপাঠাগারে পরিণত হবে—এটাই আমার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন।

ইত্তেফাক/এএইচপি