ডুবে আছে গ্রামের পর পর গ্রাম, কক্সবাজারে পানি আরও বাড়ছে

আপডেট : ১০ জুলাই ২০২৬, ২০:৩৫

কক্সবাজারের বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের পানিতে গত চারদিন ধরে জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) সন্ধ্যার পর থেকে আগের চেয়ে পানি বেড়েছে বলে জানিয়েছেন দুর্গত লোকজন।

চকরিয়ায় বানের পানি টিনের চালা ছুঁয়ে যাওয়ায় নিরাপদ আশ্রয়ে যাবার কালে নৌকা ডুবে এক কিশোরী মারা গেছে। রান্নাঘর ডুবে থাকায় চুলা বন্ধ এবং শত শত নলকূপ পানিতে ডুবে থাকায় দুর্গত এলাকায় সুপেয়পানি ও খাবারের সংকট দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন মহাসড়কের নিচু এলাকায় কোমর সমান পানি চলাচল করছে। এ জলদুর্যোগে জেলার ৫-৬ লাখ মানুষ দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন বলে মনে করছেন জনপ্রতিনিধিরা। কক্সবাজার সদরের এমপি লুৎফুর রহমান কাজলসহ জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং সমাজকর্মীরা এলাকায় এলাকায় গিয়ে দুর্গতদের খোঁজ খবর নিচ্ছেন।

শুক্রবার (১০ জুলাই) সকাল ১১টার দিকে চকরিয়ার বরইতলী ইউনিয়নের রসুলাবাদে পানিতে ডুবে যাওয়া বাড়ি থেকে স্ত্রী ও তিন মেয়েকে নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যাচ্ছিলেন এলাকার বাসিন্দা আব্দুল মালেক (৪০)। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে একটি ডিঙি নৌকায় যাওয়ার পথে হঠাৎ ঝড়োহাওয়ায় নৌকাটি উল্টে ডুবে যায়। মালেক, তার স্ত্রী লাকি আক্তার (৩১) এবং তাদের দুই মেয়ে জেরিন মনি (৯), শাওরিন মনি (৭) সাঁতার কেটে কূলে ফিরতে পারলেও ভেসে যায় বড় মেয়ে হাসনাতুল জন্নাত ঝর্ণা (১৩)। প্রায় তিনঘণ্টা পর তার মরদেহ উদ্ধার করে ডুবুরি দল।

আব্দুল মালেক সাংবাদিকদের বলেন, দুদিন পানিতে ভেসে ছিলাম। পানি ঘরের আড়া পর্যন্ত পৌঁছালে সবাই ঘরের চালে আশ্রয় নিলাম। সকালে একটি নৌকা পেয়ে তিন সন্তান, স্ত্রীকে নিয়ে বানৌজা সড়কে যাচ্ছিলাম। কিছুদূর এগিয়ে যেতেই ঝড়োবাতাসে পড়ে নৌকাটি ডুবে যায়। স্ত্রী, মেয়ে জেরিন-শাওরিনকে নিয়ে সাঁতার কেটে কূলে ফিরে আসি। তবে ঝর্ণা বন্যার পানিতে তলিয়ে আমাদের বুকটা খালি করে গেছে।

চকরিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের স্টেশন কর্মকর্তা দিদারুল হক বলেন, বানের পানিতে নৌকাডুবে কিশোরী নিখোঁজের খবরে ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে যায়। পরে চট্টগ্রাম থেকে ডুবুরি দল এনে অভিযান চালিয়ে উদ্ধার হয় কিশোরীর মরদেহ।

বরইতলী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মো. খালেকুজ্জামান জানান, রসুলাবাদ খুবই নিচু। সেখানে পুরো একটি গ্রাম ডুবে গেছে। আশ্রয়কেন্দ্র না থাকায় ওই গ্রামের অন্তত ৩০০ পরিবার এক কিলোমিটার দূরে বানৌজা সড়কের ওপর আশ্রয় নিয়েছে। সেখানে যাওয়ার পথেই মালেক তার মেয়েকে হারালেন।

অপরদিকে, বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বন্যার পানিতে ভেসে গিয়ে মৃত্যু হয়েছে মাতামুহুরী উপজেলার কোনাখালী ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ড চরপাড়া এলাকার আরিফুল ইসলামের ছেলে পুষ্প (৩)। পরিবারের সদস্যদের অজান্তে ঘরের পাশে জমে থাকা বন্যার গভীর পানিতে পড়ে যায় সে। দীর্ঘক্ষণ দেখতে না পেয়ে স্বজনরা খোঁজাখুঁজি শুরুর পর পানিতে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে চকরিয়া সরকারি হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক পুষ্পকে মৃত ঘোষণা করেন।

সূত্র জানান, গত ৫ দিনের টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলার ১৮টি ইউনিয়নের বেশিরভাগ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার থেকে পানি বেড়ে বন্যা পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়। মালেকসহ ওই এলাকার অন্তত ৩০০ পরিবারের ঘরবাড়ি ডুবে গেছে। প্রশাসন মাইকিং করলেও আগেভাগে আশ্রয়কেন্দ্রে না যাওয়ায় পরিবারগুলো ভোগান্তিতে পড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীন দেলোয়ার বলেন, প্লাবনের পানিতে মারা যাওয়া শিশুর পরিবারে নগদ ২০ হাজার টাকা করে সহায়তা ও শুকনো খাবার দেয়া হয়েছে। চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলার জন্য ২০ টন শুকনা খাবার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

বন্যাকবিলত বিভিন্ন ইউনিয়ন ও এলাকায় খবর নিয়ে জানা যায়, বানের পানিতে সিংহভাগ নলকূপ ডুবে থাকায় সুপেয় পানি ও শুকনো খাবার সংকট দেখা দিয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিগণ।

অন্যদিকে, পেকুয়ার উজানটিয়া, মগনামা, বারবাকিয়া, মেহেরনামা এবং পৌর এলাকার বিভিন্ন স্থানে বন্যার পানি ঢুকে পড়েছে। সড়ক, কৃষিজমি ও চিংড়ির ঘের ডুবে যাওয়ায় জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে।

কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম জানান, বাঁকখালী নদীর পানি ৫ দশমিক ৮৮ মিটার এবং মাতামুহুরী নদীর পানি ৬ দশমিক ৫৪ মিটারে পৌঁছেছে, যা বিপদসীমার চেয়ে বেশি।

কক্সবাজার আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান জানান, গত ছয়দিনে জেলায় প্রায় ৭শ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আগামীকালও বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে।

কক্সবাজার সদরের পিএমখালী, বাংলাবাজার, খরুলিয়া, রামুর খুনিয়াপালং, দক্ষিণ মিঠাছড়ি, জোয়ারিয়ানালা, রশিদ নগর, কচ্ছপিয়া, ফতেখারকুল, চাকমারকুল, উখিয়ার বিভিন্ন ইউনিয়নের গ্রাম বুক সমান পানিতে ডুবে আছে। একই অবস্থা ঈদগাঁওর জালালাবাদ, পোকখালী, ইসলামাবাদ, ভোমরিয়াঘোনা, দরগাহপাড়া, মাইজপাড়ায়। রেলপথের কারণে আগের মতো পানির প্রবাহ দ্রুত হচ্ছে না বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।

টেকনাফ-কক্সবাজার মহাসড়কে বৃহস্পতিবার পানি চলাচল করা অংশে কোমর সমান পানি প্রবাহিত হচ্ছে। বাস ও উঁচু গাড়িগুলো চলাচল করতে পারলেও ছোট যানবাহন চলাচল এক প্রকার বন্ধ থাকায় যাতায়াতে চরম দূর্ভোগ পোহাচ্ছে জরুরি প্রয়োজনে বের হওয়া স্থানীয়রা।

জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান বলেন, জেলার ৬৪০টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা রয়েছে। তবে, এত করে বলার পরও কেউ সহজে আশ্রয় কেন্দ্রে যেতে চান না বলে খবর এসেছে। দুর্যোগ মোকাবিলায় নগদ ১০ লাখ টাকা, ২০০ মেট্রিকটন চাউল, প্রায় দেড় হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার মজুদ রয়েছে। আরও বরাদ্দ চেয়ে মন্ত্রণালয়ে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। উদ্ধার, ত্রাণ বিতরণ এবং জরুরি সহায়তা কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে কন্ট্রোল রুম চালু করা হয়েছে। প্রয়োজনে যেকেউ ০১৮৭২৬১৫১৩২ নাম্বারে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ করতে পারবেন। 

ইত্তেফাক/এপি