আর্জেন্টিনার আশা মেসি, ইংল্যান্ডের ভরসা কেইন

আপডেট : ১৫ জুলাই ২০২৬, ১০:০৫

বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল মানেই উত্তেজনা, আবেগ আর ইতিহাসের নতুন অধ্যায়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে আজ রাত ১টায় শুরু হতে যাওয়া আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড দ্বৈরথ যেন আরো এক ধাপ এগিয়ে। ১৯৮৬ সালের সেই ঐতিহাসিক ‘হ্যান্ড অব গড' ম্যাচের ঠিক ৪০ বছর পর বিশ্বকাপের মঞ্চে এই দ্রুপদী দ্বৈরথকে কেন্দ্র করে সবার মাঝে উত্তেজনা বিরাজ করছে। এবারের এই ম্যাচটি কেবল দুই ফুটবল পরাশক্তির লড়াই নয়; এটি দুই অধিনায়কেরও মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যাওয়ার গল্প। এক পাশে লিওনেল মেসি, অন্য পাশে হ্যারি কেইন। একজন ফুটবলের জীবন্ত কিংবদন্তি; অন্যজন ইংল্যান্ডের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য গোলমেশিন।

মেসির পায়ের ছোঁয়ায় যেন এখনো ফুটবল কবিতা হয়ে ওঠে। বয়স (৩৯ বছর) যতই বাড়ুক, মাঠে নামলেই সময় যেন থমকে দাঁড়ায়। তার ড্রিবল, নিখুঁত পাস কিংবা গোল—সবকিছুতেই লুকিয়ে থাকে শিল্পীর তুলির আঁচড়। এবারের বিশ্বকাপে সেই জাদুকর আরো একবার দেখিয়েছেন কেন তিনি সেরাদের সেরা। আর্জেন্টিনাকে সেমিফাইনালে তোলার পথে ইতিমধ্যেই করেছেন আট গোল। অ্যাসিস্ট আছে দুটি। শুধু গোলই নয়, প্রতিটি আক্রমণের সূচনা, প্রতিটি ছন্দের কেন্দ্রবিন্দু তিনিই । অন্যদিকে, ৩২ বছর বয়সি হ্যারি কেইন নিখাদ এক যোদ্ধা। গোলের সামনে সুযোগ পেলেই নির্মম । কিন্তু নেতৃত্বে শান্ত ও পরিণত। তার চোখে সব সময় থাকে প্রতিপক্ষের জাল। এই বিশ্বকাপে ইতিমধ্যে ছয় গোল করেছেন এবং এক গোলে সহায়তা করে ইংল্যান্ডকে সেরা চারে তুলেছেন। প্রয়োজনের মুহূর্তে দলকে সামনে টেনে নেওয়া, চাপের ম্যাচে ঠান্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত নেওয়া। সবকিছুতেই কেইন হয়ে উঠেছেন ইংল্যান্ডের নির্ভরতা ও ভরসার প্রতীক।

দুই অধিনায়কের মিলও কম নয়। দুই জনই নিজেদের দলের আক্রমণের প্রাণভোমরা। দুই জনই সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন, সতীর্থদের অনুপ্রাণিত করেন এবং সবচেয়ে বড় মঞ্চে নিজের সেরাটা বের করে আনতে জানেন। তবে তাদের পথ আলাদা । মেসি খেলেন শিল্পীর সৌন্দর্যে, কেইন খেলেন যোদ্ধার দৃঢ়তায় । একজন মুহূর্তকে জাদুতে বদলে দেন, অন্যজন মুহূর্তকে গোলে পরিণত করেন। সেমিফাইনালের এই লড়াইয়ে কৌশল, রণনীতি কিংবা দলগত পারফরম্যান্স যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি আলো থাকবে এই দুই মহাতারকার দিকে । কারণ ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে অনেক সময় একটি জাদুকরী মুহূর্তই বদলে দেয় পুরো ম্যাচের গল্প। সেই মুহূর্ত কি তৈরি করবেন মেসি? নাকি ইংল্যান্ডকে বহু প্রতীক্ষিত ফাইনালের টিকিট এনে দেবেন কেইন? একজনের সামনে আরেকটি বিশ্বকাপের স্বপ্ন পূরণের সম্ভাবনা, অন্যজনের সামনে দেশের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটানোর সুযোগ। তাই এই সেমিফাইনাল আসলে দুই অধিনায়কের হৃদয়ের লড়াই। ফাইনালের দরজায় দাঁড়িয়ে আছে মাত্র একটি দল। আর সেই দরজার চাবি হয়তো লুকিয়ে আছে দুই জোড়া পায়ের একটিতে। একটি মেসির, অন্যটি কেইনের ।

মেসি দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে এর আগে কখনো ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মাঠে নামেননি। কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডকে ৩-১ গোলে হারিয়ে শেষ চার নিশ্চিত করার পর মেসি এই ম্যাচটিকে ক্যারিয়ারের একটি অনন্য অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখছেন। আর্জেন্টাইন অধিনায়ক এ প্রসঙ্গে বলেন, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে খেলাটা সব সময়ই বিশেষ কিছু। কারণ তারা ফুটবলের অন্যতম বড় পরাশক্তি। পরাশক্তিদের বিরুদ্ধে যে কোনো ম্যাচই রোমাঞ্চকর হয়। প্রথম বার ইংলিশদের মুখোমুখি হওয়া নিয়ে এলএম টেন জানান, আমি ক্যারিয়ারে ইংল্যান্ড ছাড়া সব বড় দলের বিপক্ষেই খেলেছি। তাই ব্যক্তিগতভাবে এই ম্যাচটি আমার জন্য দারুণ এক অভিজ্ঞতা হতে যাচ্ছে। 

১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে ম্যারাডোনার সেই ঐতিহাসিক ম্যাচের স্মৃতিচারণ করে মেসি বলেন, আমরা আর্জেন্টাইনরা সেই ভিডিও এবং ছবিগুলো নিয়মিত দেখি। তবে বর্তমান দলটি যে কোনো প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে নিজেদের স্বাভাবিক খেলা খেলতেই অভ্যস্ত। টানা বড় টুর্নামেন্ট খেলার ক্লান্তি সত্ত্বেও দলের মানসিকতার প্রশংসা করে মেসি বলেন, বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর আবারও বিশ্বমঞ্চের সেরা চারে জায়গা করে নেওয়া মোটেও সহজ বা স্বাভাবিক বিষয় নয়। আমরা আমাদের সেরাটা দিয়ে আবারও ফাইনালের টিকিট কাটার লড়াই করব।

অন্যদিকে, কোয়ার্টার ফাইনালে নরওয়েকে ২-১ গোলে হারিয়ে সেমিফাইনালে পা রাখা ইংল্যান্ড দলের অধিনায়ক হ্যারি কেইন আর্জেন্টিনাকে সমীহ করলেও নিজেদের উন্নতির ব্যাপারে দারুণ আত্মবিশ্বাসী। ইংলিশ অধিনায়ক বলেন, আমরা জানি গত ম্যাচে আমাদের বেশ কিছু ঘাটতি ছিল। তবে আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হওয়ার আগে সেমিফাইনালে আমরা দল হিসেবে আরো শক্তিশালী ও উন্নত ফুটবল খেলব। 

মেসিকে আটকানোর কৌশল নিয়ে কথা বলতে গিয়ে কেইন স্পষ্ট করে বলেন, এই লড়াইটি শুধু লিওনেল মেসির বিরুদ্ধে নয়, এটি আসলে শক্তিশালী আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ইংল্যান্ডের লড়াই। মাঠের বাইরের বা ইতিহাসের কোনো বিতর্ক নিয়ে আমরা ভাবছি না। কোচ টমাস টুখেলের অধীনে দলের রণকৌশল নিয়ে কেইন জানান, আমাদের দলে দারুণ কিছু ব্যক্তিগত স্কিলসম্পন্ন খেলোয়াড় রয়েছে। কোচ আমাদের শক্তি খুব ভালো করে চেনেন এবং তিনি চান বড় ম্যাচে আমরা যেন নিজেদের সেরা ফুটবলটাই উপহার দিই।

আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড ম্যাচ মানেই ইতিহাস, আবেগ আর প্রতিশোধের গল্প। কিন্তু এবার সেই ইতিহাসের কেন্দ্রে থাকবেন দুই অধিনায়ক। একজন ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা, অন্যজন নিজের দেশের দীর্ঘদিনের শিরোপাস্বপ্ন পূরণের মিশনে। শেষ পর্যন্ত সেমিফাইনালের ভাগ্য নির্ধারণ করবে হয়তো কোনো এক মুহূর্তের জাদু। সেটি কি হবে মেসির বাঁ পায়ের ছোঁয়ায়, নাকি কেইনের নিখুঁত ফিনিশিংয়ে? সেই উত্তর মিলবে আজ রাতের মহারণেই।

ইত্তেফাক/এএইচপি