প্রকৃতির ওপর মানুষ অনেকটা নির্ভরশীল। প্রকৃতি যে বছর সদয় আচারণ করে, সে বছর মানুষের ভাগ্য হয় খুব সুপ্রসন্ন, আর যে বছর প্রকৃতির আচরণ হয় খুব আগ্রাসি, সে বছর মানুষের চোখেমুখে লক্ষ করা যায় হাজারো দুশ্চিন্তার ছাপ। উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে ভবিষ্যত্ নিয়ে। সহজেই দুশ্চিন্তা মুক্ত হতে পারে না। সাম্প্রতিক কালে প্রকৃতির ঘন ঘন যে আগ্রাসি রূপ লক্ষ করা যাচ্ছে, এর পেছনে মানুষ যে কোনোভাবেই দায়ী নয় সে কথা কখনোই বলা যাবে না। কেননা মানুষের খামখেয়ালিপনা আচরণের কারণেই এ সমস্যাটা প্রকট আকার ধারণ করেছে। জলবায়ু প্রতিনিয়তই পরিবর্তন হচ্ছে, সৃষ্টি হচ্ছে নতুন নতুন রেকর্ড। জলবায়ু ঘন ঘন পরিবর্তনের কারণে বেড়ে যাচ্ছে বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ। সময় অসময়ে ঝড়, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস সুনামি, ভূমিকম্পের মতো বড়ো বড়ো প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত হানছে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায়। ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে অপরিমেয়।
জলবায়ু পরিবর্তনের নীতিবাচক প্রভাব অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর ব্যাপকভাবে পড়েছে। আর সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান জার্মান ওয়াচ-এর ২০১০ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স (CRI) অনুযায়ী জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে ক্ষতির বিচারে শীর্ষ ১০টি ক্ষতিগ্রস্ত দেশের মধ্যে প্রথমেই অবস্থান করছে বাংলাদেশ। এটি যে কেবল জরিপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ আছে তা নয়, বাস্তবে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। যেমন ২০০৬ সালের ১৯ সেপ্টেম্বরে হঠাত্ টর্নেডোর আঘাত, যাতে শত শত ট্রলার, জেলে মাঝিমাল্লা প্রাণ হারায়। ২০০৭ সালে সিডরে সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এ সময় শত শত মৃত গলিত লাশ ভাসতে দেখা গেছে। ২০০৯ সালের ২৫ মে। ঘণ্টায় ১১০ কিলোমিটার বেগে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় আইলা। লণ্ডভণ্ড করে দেয় এ অঞ্চলের হাজার হাজার বসত-ভিটা, আবাদি জমি।
২০১৩ সালের ১৬ মে বঙ্গোপসাগরের ঘূর্ণিঝড় মহাসেন আঘাত হানে বাংলাদেশে। ২০১৭ সালে আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় মোরা। আর ২০১৭ সালের আগস্ট মাসেই আঘাত হানে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যা, যা ছিল ১৯৮৮ সালের বন্যার চেয়েও বেশি ভয়াবহ। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে শুধু যে বাংলাদেশে ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ হচ্ছে তা নয় বরং সারা বিশ্বে এর প্রভাব ব্যাপকভাবে পড়েছে।
বহির্বিশ্বের দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০১১ সালের সুনামি জাপানকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল, ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল শত শত কোটি টাকার সম্পদ। ২০১৫ সালের এপ্রিল মাসে শক্তিশালী ভূমিকম্পের আঘাতে লণ্ডভণ্ড হয়েছিল হিমালয় কন্যা নেপালের অনেক এলাকা। রিখটার স্কেলে ঐ ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৭ দশমিক ৮। এতে নেপাল, ভারত ও চীনে নিহত হয়েছিল শত শত মানুষ। নেপালে ৮০ বছরের বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ভূমিকম্প এটি। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে এ ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছিল। ২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস উপকূলে আঘাত হেনেছে ঘূর্ণিঝড় হারভে। এর কয়েকদিন পরে আবার যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় অঙ্গরাজ্য ফ্লোরিডায় আঘাত হানে হারিকেন ‘ইরমা’। প্রকৃতির ধ্বংসলীলা অবিরাম চলছে তো চলছে, থামার কোনো লক্ষণ নাই।
জলবায়ু পরিবর্তন যদি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না হয় তাহলে অদূর ভবিষ্যতে প্রাকৃতিক দুর্যোগের পরিমাণ যে বহুগুণ বেড়ে যাবে তাতে বিন্দু পরিমাণ সন্দেহ নাই। জলবায়ুর পরিবর্তন পুরোপুরিভাবে রোধ করা সম্ভব নয় যেমন সত্য তেমনি সম্মিলিতভাবে কার্যকরী উদ্যোগ নিলে জলবায়ুর পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভবও নয়। তাই ভবিষ্যত্ প্রজন্মের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার স্বার্থে জলবায়ু পরিবর্তন রোধে বিশ্বের সব দেশের সমন্বয়ে একটি কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করা এখনই দরকার।
n লেখক :শিক্ষার্থী, দর্শন বিভাগ,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
