‘চিকেনস নেক’ নিয়ে উদ্বিগ্ন ভারত, নিরাপত্তা ঢেলে সাজাতে শিলিগুড়িতে যাচ্ছেন অমিত শাহ

আপডেট : ১৭ জুলাই ২০২৬, ১২:০৫

নয়াদিল্লির ঘুম কাড়ছে 'চিকেনস নেক'। ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আটটি রাজ্যের একমাত্র স্থল সংযোগ হওয়ায় কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই শিলিগুড়ি করিডর। করিডরটির নিরাপত্তায় সামান্য ঝুঁকিও জাতীয় নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখছে ভারত। সেই কারণেই সীমান্ত নিরাপত্তা আরও জোরদার করতে এবার শিলিগুড়ি সফরে যাচ্ছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ।

শনিবার (১৮ জুলাই) উত্তরকন্যায় পশ্চিমবঙ্গ সরকারের শাখা সচিবালয়ে অনুষ্ঠিতব্য উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে নিরাপত্তা বাহিনী, রাজ্য পুলিশ ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশ নেবেন। বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং রাজ্য মন্ত্রিসভার কয়েকজন সদস্যও উপস্থিত থাকতে পারেন।

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করা প্রায় ৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ শিলিগুড়ি করিডর দেশটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত এলাকা। নেপাল ও বাংলাদেশের মাঝামাঝি অবস্থিত এই করিডরের সবচেয়ে সরু অংশের প্রস্থ মাত্র ২০ থেকে ২২ কিলোমিটার। পাশাপাশি ভারত-চীন-ভুটান সীমান্তের নিকটবর্তী হওয়ায় অঞ্চলটি দীর্ঘদিন ধরেই নিরাপত্তা বিবেচনায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়ে আসছে।

ভারতীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, বৈঠকে বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের অগ্রগতি, বিশেষ করে শিলিগুড়ি করিডরসংলগ্ন সীমান্তের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা করা হবে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় বাহিনী, রাজ্য প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদারের বিষয়েও নির্দেশনা দিতে পারেন অমিত শাহ।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে করিডরটির নিরাপত্তা নিয়ে নয়াদিল্লির উদ্বেগ বেড়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ ও চীনকে ঘিরে বিভিন্ন কৌশলগত উন্নয়ন এবং সীমান্তসংলগ্ন অঞ্চলে অবকাঠামো প্রকল্পের অগ্রগতি ভারতের নিরাপত্তা পরিকল্পনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীন বাংলাদেশের রংপুর বিভাগের লালমনিরহাটের পরিত্যক্ত বিমানঘাঁটি উন্নয়নের পরিকল্পনা করছে। এই বিমানঘাঁটিটি শিলিগুড়ি করিডর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।

এ ছাড়া, সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের সময় দুই দেশ তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনার জন্য একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। চীনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, সিকিম থেকে উৎপন্ন হয়ে শিলিগুড়ি করিডর অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করা তিস্তা নদীর অববাহিকার কাঠামো পুনর্গঠন করা হবে। এক পর্যবেক্ষকের ভাষ্য, শিলিগুড়ি করিডরের মতো কৌশলগতভাবে সংবেদনশীল এলাকার এত কাছে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নয়াদিল্লির উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

এদিকে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষ থেকে সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা জোরদারে বিএসএফকে জমি হস্তান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের দাবি, সীমান্তে বেড়া নির্মাণ ও নজরদারি অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে।

শুধু নিরাপত্তাই নয়, শিলিগুড়ি করিডরে যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নেও জোর দিচ্ছে ভারত সরকার। এর অংশ হিসেবে অতিরিক্ত রেললাইন নির্মাণ, ভূগর্ভস্থ রেলপথ নির্মাণের কাজও চলছে। বাগডোগরা বিমানবন্দরের অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ এগিয়ে চলেছে। একই সঙ্গে ভারতীয় বিমানবাহিনীর একটি রাফাল স্কোয়াড্রন থাকা হাসিমারা বিমানঘাঁটি উন্নয়নের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি মহাসড়ককে চার লেনে উন্নীত করার কাজও চলছে।

সফরের অংশ হিসেবে শুক্রবার রাতে শিলিগুড়িতে পৌঁছে বিএসএফের উত্তরবঙ্গ ফ্রন্টিয়ার সদর দপ্তরে অবস্থান করবেন অমিত শাহ। শনিবার তিনি একটি সীমান্ত চৌকি পরিদর্শন করবেন, বিএসএফ সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন এবং কয়েকটি উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন ও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন।

পরে উত্তরকন্যায় একাধিক বৈঠকে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে তার। এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে নতুন ‘গুন্ডা আইন’-এর বাস্তবায়ন অগ্রগতি নিয়েও আলোচনা হবে। বিশ্লেষকদের মতে, শিলিগুড়িতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে নিরাপত্তা সংক্রান্ত এমন উচ্চপর্যায়ের বৈঠক সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ, যা করিডরটির কৌশলগত গুরুত্বের প্রতিফলন।

ইত্তেফাক/এসজেএস