সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা ও স্পেনের কাছে হেরে বিশ্বকাপ ফাইনালের স্বপ্ন ভেঙেছে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের। শিরোপার দৌড় থেকে ছিটকে যাওয়ার পর এখন দল দুটিকে মুখোমুখি হতে হবে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী সান্ত্বনা পুরস্কারের ম্যাচে। তবে এই ম্যাচকে সম্পূর্ণ গুরুত্বহীন মনে করছেন দুই দলের কোচই। তাদের মতে, ফাইনালের স্বপ্নভঙ্গের পর এমন একটি ম্যাচ খেলা ফুটবলারদের জন্য কেবলই এক ‘অনাকাঙ্ক্ষিত দায়িত্ব’।
বাংলাদেশ সময় শনিবার রাত ৩টায় ‘ব্রোঞ্জ’ জয়ের লড়াইয়ে মাঠে নামবে ফ্রান্স-ইংল্যান্ড। অনেকের কাছে ‘গুরুত্বহীন’ মনে হওয়া এই ম্যাচেও কিন্তু আছে রোমাঞ্চের ছোঁয়া। আর সেই রোমাঞ্চের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার ‘গোল্ডেন বুট’ জয়ের রাজকীয় লড়াই।
সেমিফাইনালে স্বপ্নভঙ্গের পর দুই দলের কোচই হয়তো বাধ্য হয়ে মাঠে নামার আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন, কিন্তু ফুটবলারদের ব্যক্তিগত অর্জনের ক্ষুধা এই ম্যাচকে দিচ্ছে ভিন্ন মাত্রা। বিশেষ করে ফরাসি ফরোয়ার্ড কিলিয়ান এমবাপ্পের জন্য এটি গোল্ডেন বুটের দৌড়ে লিওনেল মেসিকে ছাড়িয়ে যাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ।
বর্তমানে ৮ গোল নিয়ে যৌথভাবে শীর্ষস্থানে থাকা এমবাপের সামনে যেমন ব্যবধান বাড়ানোর চ্যালেঞ্জ, তেমনি ৬ গোল করা ইংলিশ তারকা হ্যারি কেইন ও জুড বেলিংহামের সামনে সুযোগ থাকছে শেষ ম্যাচে অবিশ্বাস্য কিছু করে তালিকায় ওপরে ওঠার। ফলে ফাইনালের টিকিট না পাওয়ার হতাশা থাকলেও, গোল্ডেন বুটের এই মরণপণ লড়াই ম্যাচটিকে রূপ দিতে পারে এক হাই-স্কোরিং থ্রিলারে।
বিশ্বকাপে নিজেদের একমাত্র হতাশাজনক পারফরম্যান্সের স্মৃতি নিয়ে এই ম্যাচে মাঠে নামছে ফ্রান্স। সেমিফাইনালে স্পেনের নিখুঁত পজিশনাল ফুটবল এবং ফরাসিদের কাউন্টার-অ্যাটাকিং বা ট্রানজিশন রুখে দেওয়ার কৌশলের কাছে ২-০ ব্যবধানে হারতে হয়েছিল দিদিয়ের দেশমের দলকে।
অন্যদিকে, আর্জেন্টিনার কাছে সেই হৃদয়বিদারক হারের আগে ইংল্যান্ডের সেমিফাইনাল পর্যন্ত যাত্রাটি ছিল সুশৃঙ্খল রক্ষণাত্মক পারফরম্যান্সের দুর্দান্ত এক উদাহরণ। সেমিফাইনালে থ্রি-লায়ন্স’রা ম্যাচের শুরুতেই লিড নিলেও শেষ মুহূর্তের আর্জেন্টাইন চাপ আর সামলাতে পারেনি; ম্যাচের শেষভাগে দুই গোল হজম করে ছিটকে যায় তারা। বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলার স্বপ্নভঙ্গের পর এখন কোচ টমাস টুখেলের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই শেষ ম্যাচটির জন্য নিজের দলকে মানসিকভাবে চাঙ্গা করে তোলা।
খেলোয়াড়দের গভীরতা বা স্কোয়াড ডেপথের দিক থেকে ফ্রান্স এই ম্যাচে স্পষ্ট ব্যবধানে এগিয়ে থাকবে। ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে দেশম যদি স্কোয়াডে রোটেশন বা পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্তও নেন, তবুও তাঁর বেঞ্চে এমন সব ফুটবলার আছেন যারা ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারেন-যার অন্যতম উদাহরণ টুর্নামেন্টে অবিশ্বাস্যভাবে কম সুযোগ পাওয়া রায়ান শেরকি। ইংল্যান্ডের শুরুর একাদশে যথেষ্ট দুর্দান্ত তারকা ফুটবলার থাকলেও, ম্যাচের শেষ ৩০ মিনিটে খেলা যদি অতিরিক্ত উন্মুক্ত ও গতিশীল হয়ে পড়ে, তবে ক্লান্তি এবং চোট ইংলিশ শিবিরের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
এই ম্যাচের ভাগ্য মূলত নির্ধারিত হতে পারে এমবাপের বনাম ইংলিশ রক্ষণভাগের মধ্যকার দ্বৈরথের ওপর। ট্রানজিশনের সময় এমবাপের গতি ৯০ মিনিট ধরে নিয়ন্ত্রণ করা যেকোনো দলের রক্ষণের জন্যই প্রায় অসম্ভব। অবশ্য ইংল্যান্ডও গোল করার সুযোগ তৈরি করবে; বিশেষ করে হ্যারি কেইনের চমৎকার মুভমেন্ট এবং জুড বেলিংহামের লেট রান (বক্সের ভেতর দেরিতে ঢুকে আক্রমণ করা) ফরাসি ডিফেন্সকে পরীক্ষায় ফেলবে। তবে পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে সুযোগ হাতছাড়া না করে তা গোলে রূপান্তর করার দক্ষতায় ফ্রান্স কিছুটা এগিয়ে রয়েছে।
বিশ্বকাপের মঞ্চে এখন পর্যন্ত মোট তিনবার মুখোমুখি হয়েছে ফ্রান্স ও ইংল্যান্ড। ঐতিহাসিক লড়াইয়ের প্রথম দুটি ম্যাচেই অবশ্য শেষ হাসি হেসেছিল ইংলিশরা; ১৯৬৬ আসরের গ্রুপ পর্বে ২-০ ব্যবধানে এবং ১৯৮২ আসরের প্রথম গ্রুপ পর্বে ৩-১ ব্যবধানে ফ্রান্সকে হারিয়েছিল তারা। তবে ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে সর্বশেষ লড়াইয়ের প্রতিশোধ নিয়েছিল ফরাসিরা।

