ক্ষুধা লাগলেই মেজাজ খিটখিটে লাগে? এটি কি কোনো অসুস্থতার লক্ষণ

আপডেট : ১৯ জুলাই ২০২৬, ১০:৫৮

অনেকেই মজা করে বলেন, খেতে দাও, নইলে কথা বলব না! আসলে মজা নয় - ক্ষুধা সত্যিই মেজাজ বদলে দিতে পারে। ইংরেজিতে এর একটি জনপ্রিয় শব্দও আছে - হ্যাংরি (হাংরি + অ্যাঙ্গরি)। বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা যায়।

ক্ষুধার্ত অবস্থায় আমাদের মধ্যে ক্লান্তি, বিভ্রান্তি বা রাগের মতো আবেগগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে। আর এসব কিছুর জন্য দায়ী হলো চিনি-বিশেষত গ্লুকোজ, যা আমাদের রক্তে সঞ্চালিত হয়। যখন এর মাত্রা কমে যায়, তখন আমাদের শরীর তা পুনরুদ্ধারে ধারাবাহিক কিছু প্রতিক্রিয়া দেখায়।

কিন্তু গ্লুকোজ ঠিক কী ভূমিকা পালন করে? এটি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

এই ধরনের চিনি আমাদের অঙ্গ তৈরি করা কোষের শক্তির প্রধান উৎস। উদাহরণ দিয়ে বলা যায়, এর ওপর মস্তিষ্ক প্রায় একচেটিয়াভাবে নির্ভর করে। এটা ছাড়া মস্তিষ্ক তৈরি করা ১০০ বিলিয়ন স্নায়ু কোষ নিজেদের কাজ ভালোভাবে করতে পারবে না।

দুর্বল ও খিটখিটে বোধ করা, মাথা ঘোরা এবং মনোযোগে অসুবিধার মতো বিষয়গুলো দিয়ে বোঝা যায় যে মস্তিষ্ক পর্যাপ্ত পরিমাণে গ্লুকোজ পাচ্ছে না।

কেন গুরুত্বপূর্ণ গ্লুকোজ?

গ্লুকোজ শরীরের প্রতিটি কোষের প্রধান শক্তির উৎস। বিশেষ করে মস্তিষ্ক প্রায় পুরোপুরি এই গ্লুকোজের ওপর নির্ভরশীল। রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ কমে গেলে মস্তিষ্ক প্রয়োজনীয় শক্তি পায় না। তখন দুর্বল লাগা, মাথা ঘোরা, মনোযোগ কমে যাওয়া এবং খিটখিটে মেজাজের মতো উপসর্গ দেখা দেয়।

দীর্ঘ সময় ধরে রক্তে শর্করার মাত্রা খুব কম থাকলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে কোমার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।

ক্ষুধা লাগলে কেন বাড়ে বিরক্তি?

শুধু গ্লুকোজের ঘাটতিই নয়, ক্ষুধার সময় শরীরে একাধিক হরমোন সক্রিয় হয়ে ওঠে। এর মধ্যে অন্যতম হলো **ঘ্রেলিন**, যা পাকস্থলী থেকে নিঃসৃত হয়ে মস্তিষ্ককে খাবারের প্রয়োজনীয়তার সংকেত দেয়।

একই সময়ে শরীরে কর্টিসল নামের স্ট্রেস হরমোনের মাত্রাও বাড়তে শুরু করে। এই হরমোন লিভারে জমা থাকা চর্বি ও প্রোটিন ভেঙে গ্লুকোজ তৈরি করতে সাহায্য করে, যাতে শরীর জরুরি শক্তি পায়।

তবে কর্টিসল বেড়ে গেলে মস্তিষ্কে ডোপামিন ও সেরোটোনিনের মতো নিউরোট্রান্সমিটারের ভারসাম্যেও পরিবর্তন আসে। ফলে ইতিবাচক অনুভূতি কমে গিয়ে মানুষ তুলনামূলক বেশি রাগান্বিত বা অস্থির হয়ে ওঠে।

অ্যাড্রেনালিনও রাখে ভূমিকা

ক্ষুধার সময় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ হরমোন **অ্যাড্রেনালিন**ও সক্রিয় হয়। এটি শরীরের ‘ফাইট অর ফ্লাইট’ বা ‘লড়াই কিংবা পালিয়ে যাওয়ার’ প্রতিক্রিয়াকে উদ্দীপিত করে।

কর্টিসল ও অ্যাড্রেনালিন একসঙ্গে কাজ করার ফলে ক্ষুধার্ত অবস্থায় মানুষের আবেগ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে ছোটখাটো বিষয়েও বিরক্তি বা রাগের বহিঃপ্রকাশ ঘটতে পারে।

শুধু মানুষের ক্ষেত্রেই নয়

গবেষণায় দেখা গেছে, এই আচরণ শুধু মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জেব্রাফিশের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায়ও দেখা গেছে, ক্ষুধার্ত অবস্থায় প্রাণীগুলো স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বেশি আক্রমণাত্মক আচরণ করে।

বিবর্তনের সঙ্গে রয়েছে সম্পর্ক

বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এই আচরণের পেছনে বিবর্তনেরও ভূমিকা রয়েছে। প্রাচীনকালে খাদ্যের সংকট মোকাবিলা এবং খাবারের জন্য প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর মধ্যে আক্রমণাত্মক মনোভাব তৈরি হওয়া ছিল বেঁচে থাকার কৌশলের অংশ।

বর্তমানে খাদ্য সংগ্রহের সেই পরিস্থিতি না থাকলেও শরীরের সেই প্রাকৃতিক প্রতিক্রিয়া এখনও রয়ে গেছে।

কীভাবে সামলাবেন?

রমজান বা সাধারণ দিন, দুটো ক্ষেত্রেই কিছু কৌশল কাজে দেয় -

>> সেহরিতে জটিল কার্বোহাইড্রেট (ওটস, লাল চাল, ডাল) রাখুন, যাতে গ্লুকোজ ধীরে ধীরে ছাড়ে।

>> প্রোটিন ও ফাইবারযুক্ত খাবার যোগ করুন - এগুলো দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখে।

>> পর্যাপ্ত পানি পান করুন।

>> ঘুম কম হলে বিরক্তি বাড়ে, তাই বিশ্রাম গুরুত্বপূর্ণ।

>> হালকা শ্বাসব্যায়াম বা মাইন্ডফুলনেস চর্চা আবেগ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে।

ক্ষুধা লাগলে মেজাজ খারাপ হওয়া মানবদেহের স্বাভাবিক জৈব প্রতিক্রিয়া। এটি দুর্বলতা নয়, বরং শরীরের শক্তির সংকেত। তবে সচেতন খাদ্যাভ্যাস ও রুটিন মেনে চললে রোজার সময়ও এই ‘হ্যাংরি’ অনুভূতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

 

ইত্তেফাক/এনটিএম