সন্ধ্যা ঠিক ৭টা ১৫ মিনিট। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির পরীক্ষণ থিয়েটার হলের লবি তখন দর্শকে কানায় কানায় পূর্ণ। বাইরে সবে থেমেছে এক পশলা বৃষ্টি। শ্রাবণের স্নিগ্ধ আবহে একে একে দর্শকেরা প্রবেশ করছেন অডিটরিয়ামে। মঞ্চের পর্দা উঠতেই সংগীতের মূর্ছনায় শুরু হয় ভৈরবী গীতরঙ্গ দলের বিশেষ প্রযোজনা, গীতিনকশা ‘সুরের দয়াল রায়’।
বাংলা গানের অন্যতম পথিকৃৎ, কবি, নাট্যকার ও সুরকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ১৬৩তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ভৈরবী আয়োজিত এই প্রযোজনার রচনা ও নির্দেশনা দিয়েছেন ইলিয়াস নবী ফয়সাল। প্রায় অর্ধশত শিল্পীর অংশগ্রহণে নাটক, সংগীত, নৃত্য ও কবিতার সমন্বয়ে নির্মিত হয় এক অনন্য সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই পরিবেশিত হয় দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের বিখ্যাত গান ‘আজি নূতন রতনে ভূষণে যতনে প্রকৃতি সতীরে সাজিয়ে দাও’। এরপর একে একে মঞ্চে উঠে আসে তাঁর জীবনের নানা অধ্যায়—শৈশব, সাহিত্যচর্চা, ঔপনিবেশিক শাসনের প্রতি তাঁর বিরূপ মনোভাব, সাধারণ মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসা এবং কৃষকজীবনের প্রতি তাঁর অকৃত্রিম মমত্ববোধ।
প্রযোজনাটিতে তুলে ধরা হয় সেই দ্বিজেন্দ্রলালকে, যিনি শুধু একজন গীতিকার বা নাট্যকার নন; বরং ছিলেন মানুষের শিল্পী। বাংলার চাষিদের প্রতি তাঁর গভীর দরদ ও সহমর্মিতার কারণেই সাধারণ মানুষ তাঁকে স্নেহভরে ডাকত ‘দয়াল রায়’ নামে।
এক ঘণ্টাব্যাপী পরিবেশনায় দর্শকদের সামনে উপস্থাপিত হয় তাঁর অমর সব সৃষ্টি- ‘ঘন-তমসাবৃত অম্বর-ধরণী’, ‘বেলা বয়ে যায়’, ‘ওই মহাসিন্ধুর ওপার থেকে কী সংগীত ভেসে আসে’, ‘আমরা এমনি এসে ভেসে যাই’, ‘আজি এসেছি, এসেছি বঁধু হে’, ‘আমি সারা সকালটি বসে বসে’, ‘সে কেন দেখা দিলো রে’, ‘ধনধান্য পুষ্পভরা আমাদের এই বসুন্ধরা’, ‘বঙ্গ আমার! জননী আমার! ধাত্রী আমার! আমার দেশ’ এবং ‘মা পতিতোদ্ধারিণী গঙ্গে’। সবশেষে ‘আমরা মলয় বাতাসে’ গানের মধ্য দিয়ে শেষ হয় পুরো আয়োজন।
প্রযোজনাটির নির্দেশক ইলিয়াস নবী ফয়সাল বলেন, “দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের গান ও নাট্যচর্চা আমাদের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তাঁর দেশপ্রেম, মানবিকতা ও শিল্পভাবনা নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েই আমাদের এই আয়োজন।”
১৮৬৩ সালের ১৯ জুলাই পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগরে জন্মগ্রহণ করেন দ্বিজেন্দ্রলাল রায়। উনিশ শতকের শেষভাগ এবং বিশ শতকের প্রথমদিকে বাংলা গানের আধুনিকীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা পাঁচ গীতিকবির অন্যতম ছিলেন তিনি। প্রায় পাঁচশত গানের রচয়িতা এই কবির গান প্রথমদিকে ‘দ্বিজুবাবুর গান’ নামে পরিচিত থাকলেও পরবর্তীকালে তা ‘দ্বিজেন্দ্রগীতি’ নামে স্বীকৃতি পায়।
দেশপ্রেম, প্রকৃতি, ভক্তি, হাস্যরস ও মানবিক অনুভূতির অপূর্ব সমন্বয়ে তাঁর গান আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। শ্রাবণের এই সন্ধ্যায় ‘সুরের দয়াল রায়’ যেন নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিল বাংলা সংস্কৃতির এই কালজয়ী শিল্পীকে।
ভৈরবী একটি সাংস্কৃতিক গবেষণা ও গীতরঙ্গ পরিবেশনা কেন্দ্র। দেশীয় সংস্কৃতি, নাটক, সংগীত ও নৃত্যের চর্চা ও গবেষণার মাধ্যমে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং নতুন প্রজন্মের কাছে তা পৌঁছে দিতে প্রতিষ্ঠানটি কাজ করে যাচ্ছে।

