দারিদ্র্য, সংগ্রাম আর সীমিত সুযোগ—এসব বাধা অনেকের স্বপ্নকে থামিয়ে দেয়। কিন্তু কেউ কেউ প্রতিকূলতাকেই শক্তিতে পরিণত করে পৌঁছে যান সাফল্যের অনন্য উচ্চতায়। বগুড়ার গাবতলী উপজেলার উজগ্রাম দক্ষিণপাড়া ইউনিয়নের মণ্ডলপাড়ার মেয়ে মোছা. অনন্যা খাতুন তেমনই একজন। গ্রামের সাধারণ পরিবেশে বেড়ে ওঠা এই মেধাবী তরুণী আজ অস্ট্রেলিয়ার বিশ্বখ্যাত দ্য ইউনিভার্সিটি অব কুইন্সল্যান্ড (The University of Queensland-UQ)-এ পূর্ণ অর্থায়নে পিএইচডি গবেষণার সুযোগ অর্জন করে নতুন এক মাইলফলক স্পর্শ করেছেন।
অনন্যার শৈশব কেটেছে বগুড়ার উজগ্রামে। বাবা একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং মা গৃহিণী। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন বাবা। সংসারের আর্থিক টানাপোড়েনের মধ্যেই বেড়ে ওঠা অনন্যার শিক্ষাজীবন ছিল সংগ্রামমুখর। তবে প্রতিকূলতা তাঁর অগ্রযাত্রাকে থামাতে পারেনি। প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় ট্যালেন্টপুল বৃত্তি অর্জনের মধ্য দিয়ে তাঁর সাফল্যের যাত্রা শুরু হয়। পরে জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষাতেও তিনি ট্যালেন্টপুল বৃত্তি লাভ করেন। এই বৃত্তির অর্থ দিয়েই তিনি নিজের পড়াশোনার অনেকটা ব্যয় বহন করেছেন।
শিক্ষাজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে আর্থিক সংকট মোকাবিলায় মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের কয়েকজন শিক্ষকের সহযোগিতা তাঁর জীবনে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। সেই সহায়তার কথা আজও গভীর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন তিনি। বর্তমানে নিজেও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ায় কোনো শিক্ষার্থী সাহায্যের জন্য এলে তাঁর মনে পড়ে যায় নিজের সেই কঠিন দিনগুলোর কথা—যখন অনেক সহপাঠী স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন কাটালেও তাঁকে সংগ্রাম করে এগিয়ে যেতে হয়েছে। সীমিত সামর্থ্য, অগণিত ত্যাগ আর অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে সঙ্গী করেই তিনি নিজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন।
২০১১ সালে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জনের পর অনন্যা বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। ২০১৩ সালে একই বিভাগ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায়ও জিপিএ-৫ অর্জন করেন। এরপর উচ্চশিক্ষার লক্ষ্যে হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (হাবিপ্রবি) কৃষি অনুষদে ভর্তি হন।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তিনি ধারাবাহিকভাবে অসাধারণ ফলাফল করেন। স্নাতক পর্যায়ে ৩.৯৬ এবং স্নাতকোত্তরে ৩.৮০ সিজিপিএ নিয়ে উভয় ক্ষেত্রেই প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। এই অনন্য একাডেমিক সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৯ সালের জন্য কৃষি অনুষদ থেকে প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদকের জন্য মনোনীত হন।
শিক্ষাজীবনের সাফল্যের ধারাবাহিকতায় ২০২২ সালে হাবিপ্রবির কৃষি অনুষদের উদ্যানতত্ত্ব বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন অনন্যা। পরবর্তীতে পদোন্নতি পেয়ে বর্তমানে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি গবেষণাকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন তিনি। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং হাবিপ্রবির ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং (IRT)-এর অর্থায়নে একাধিক গবেষণা প্রকল্পে প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ পর্যন্ত তাঁর ১৩টি গবেষণাপত্র স্কোপাস ইনডেক্সড আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষণার প্রতি এই নিষ্ঠা ও একাডেমিক উৎকর্ষই তাঁকে নিয়ে গেছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। সম্প্রতি তিনি অস্ট্রেলিয়ার বিশ্বখ্যাত দ্য ইউনিভার্সিটি অব কুইন্সল্যান্ড (UQ)-এ পূর্ণ অর্থায়নে পিএইচডি গবেষণার সুযোগ অর্জন করেছেন। কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাঙ্কিং অনুযায়ী বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি এই প্রতিষ্ঠান। ফলে তাঁর এই অর্জন শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়; বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ও কৃষি গবেষণার জন্যও একটি গর্বের অধ্যায়।
নিজের এই অর্জন সম্পর্কে অনন্যা খাতুন বলেন, আমি কখনো স্বপ্নকে ছোট করে দেখিনি। স্বপ্ন সব সময় বড় দেখতে হয়, আর সেই স্বপ্ন পূরণ করতে হলে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। মহান আল্লাহ আমার স্বপ্নগুলো পূরণের তৌফিক দিয়েছেন। আলহামদুলিল্লাহ। গত ১৫ জুলাই আমি অস্ট্রেলিয়ার ই-ভিসা পেয়েছি। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী সেপ্টেম্বরে পিএইচডি গবেষণার উদ্দেশ্যে অস্ট্রেলিয়া যাব, ইনশাআল্লাহ। কঠোর পরিশ্রম, ধৈর্য এবং পরিবারের অনুপ্রেরণাই আমাকে আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছে। আমি চাই, আমার গবেষণার মাধ্যমে কৃষি খাতে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করতে, সেই জ্ঞান শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে এবং দেশের জন্য ইতিবাচক অবদান রাখতে। সকলের কাছে দোয়া প্রার্থী।
গ্রামের এক সাধারণ পরিবারের মেয়ে থেকে আন্তর্জাতিক মানের গবেষক হওয়ার পথে অনন্যা খাতুনের এই যাত্রা প্রমাণ করে—স্বপ্ন যদি বড় হয়, লক্ষ্য যদি স্পষ্ট থাকে এবং পরিশ্রমে যদি ঘাটতি না থাকে, তবে প্রতিকূলতা কখনোই সাফল্যের পথে স্থায়ী বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। তাঁর গল্প দেশের হাজারো শিক্ষার্থী, বিশেষ করে গ্রামীণ জনপদের মেধাবী তরুণ-তরুণীদের জন্য এক উজ্জ্বল অনুপ্রেরণা।

