দীর্ঘ প্রায় দেড় বছর ধরে মাত্র পাঁচজন দিয়ে চলছে খুলনা মহানগর বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রম। এর ওপর রয়েছে তীব্র দলীয় কোন্দল। তৃণমূল নেতাকর্মীদের অভিযোগ শুধুমাত্র দলীয় কোন্দলের কারণেই গত ১২ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনে খুলনা বিভাগের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ও নিশ্চিত খুলনা-২ (খুলনা সদর- সোনাডাঙ্গা থানা) আসনটি বিএনপির হাতছাড়া হয়ে যায়।
মহানগর বিএনপির মতো নগরীর ৩১টি ওয়ার্ড ও পাঁচ থানারও পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা সম্ভব হয়নি। সেখানেও রয়েছে চরম কোন্দল। ইতোমধ্যে ওয়ার্ড ও থানা বিএনপির দুই বছর মেয়াদী কমিটির মেয়াদও শেষ হয়ে গেছে।
অন্যদিকে, খুলনা মহানগর বিএনপির সভাপতিকে খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কেডিএ) চেয়ারম্যান করা হয়েছে। এছাড়া সাধারণ সম্পাদক বাংলাদেশ ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালক নির্বাচিত হয়েছেন। ফলে তারাও দলীয় কর্মকাণ্ড ঠিকমতো সময় দিতে পারছেন না বলে নেতাকর্মীদের অভিযোগ। তৃণমূল নেতাকর্মীদের আশঙ্কা জনপ্রিয়তা থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র দুর্বল সাংগঠনিক অবস্থা ও কতিপয় নেতার চাঁদাবাজিসহ বিতর্কিত নানা কর্মকাণ্ডের কারণে বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো খুলনা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদটিও হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বিএনপির।
তাদের দাবি বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথের রাজনীতিতে সক্রিয় এবং মামলাবাজ, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজমুক্ত জনবান্ধব ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির নেতাদের দলের মূল নেতৃত্বসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব দেওয়া হলে খুলনায় বিএনপির প্রতি আবারো সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরে আসবে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নির্বাচিত কমিটির মেয়াদ উত্তীর্ণের প্রায় ১৪ বছর পর মহানগর বিএনপির কমিটি ভেঙে ২০২১ সালের ৯ ডিসেম্বর ৩সদস্যের আহবায়ক কমিটি গঠন করা হয়। ২০২২ সালের ১ মার্চ মহানগর বিএনপির ৭১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ আহ্বায়ক কমিটি গঠন করে কেন্দ্র। এতে অ্যাডভোকেট এস এম শফিকুল আলম মনাকে আহবায়ক, সাবেক মহানগর ছাত্রদল ও যুবদলের সভাপতি শফিকুল আলম তুহিনকে সদস্য সচিব করা হয়। এরপর গত বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি নগরীর সার্কিট হাউজ মাঠে বিএনপির দ্বি-বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
এই সম্মেলনে অ্যাডভোকেট এস এম শফিকুল আলম মনা সভাপতি ও শফিকুল আলম তুহিন সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এছাড়া তিনজন সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন শেখ সাদী, মাসুদ পারভেজ বাবু ও চৌধুরী হাসানুর রশিদ মিরাজ। এরপর থেকেই ওই পাঁচজন দিয়েই চলছে খুলনা মহানগর বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রম। তবে, দপ্তর সম্পাদক পদে কেউ না থাকলেও একজনকে চলতি দায়িত্ব ও দলের মিডিয়া সেল নামে কোনো দপ্তর বা পদ-পদবী না থাকলেও ঐ নামে কয়েকজন কাজ করছে।
সূত্রমতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের বিএনপির কিছুসংখ্যক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা বাণিজ্য, চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও মানুষের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগ ওঠে। এছাড়া ৫ আগস্টের পর মহানগর ও খুলনা সদর থানার কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে কোটি টাকার উৎকোষের বিনিময়ে খুলনা মহানগর আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি ও চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি কাজী আমিনুল হক আমিনকে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ প্রদান, তার ব্যবসা-বাণিজ্য দেখভাল করা, নগরীর বড় বাজারের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে জোর করে চাঁদাবাজি, রেলওয়ের জমি দখল, মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। চাঁদাবাজি ও রেলওয়ের জমি দখলের অভিযোগে কয়েক মাস আগে পুলিশ ও যৌথবাহিনীর সদস্যরা খুলনা সদর থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোল্লা ফরিদ আহমদকে গ্রেপ্তারের জন্য তার বাড়িতে অভিযান চালায়। তবে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। এ নিয়ে ইত্তেফাকসহ বিভিন্ন পত্রিকায় তখন সংবাদও প্রকাশিত হয়।
একটি গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যমতে, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, মাদক কারবারিদের গডফাদার হিসেবে তাদের তালিকায় কয়েকজন বিএনপি নেতার নাম রয়েছে।
এদিকে বিএনপির দলীয় সূত্র জানায়, নির্দিষ্ট সময় পেরিয়ে গেলেও মহানগর বিএনপির মতো নগরীর ৩১টি ওয়ার্ড ও পাঁচটি থানা কমিটির পূর্ণাঙ্গ কমিটিও গঠন করা সম্ভব হয়নি। ফলে ওয়ার্ড ও থানা কমিটির পদবঞ্চিত অধিকাংশ নেতাকর্মী শীর্ষ নেতাদের প্রতি ক্ষুব্ধ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তৃণমূল পর্যায়ের বেশ কয়েকজন নেতা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, ‘আমাদের বলার কিছু নেই। খুলনা মহানগর বিএনপি এখন চলছে স্বেচ্ছাচারিতার মাধ্যমে’।
তৃণমূল নেতাকর্মীদের অভিযোগ, বিএনপি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গিয়ে আগে কখনোই খুলনা-২ আসনে পরাজিত হয়নি। এই আসন থেকেই বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া জয়লাভ করেছিলেন। কিন্তু গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন। যা এখনও মেনে নিতে পারেননি তৃণমূলের নেতাকর্মীরা।
তারা বলেন, মহানগর বিএনপির কয়েকজন শীর্ষ নেতার অসহযোগিতা এবং ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও বিএনপির কিছুসংখ্যক নেতা খুলনা-২ আসনের ভোটার হয়েও নজরুল ইসলাম মঞ্জুর পক্ষে কাজ না করে নিষ্ক্রিয় ছিলেন। এমনকি অনেকে দলীয় প্রার্থীকে ভোটও দেননি। এই কারণেই নিশ্চিত আসনটি বিএনপির হাতছাড়া হয়েছে। বর্তমানেও তারা বিএনপির রাজনীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। তাদের এই কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে আগামী সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনেও বিএনপির ভরাডুবির আশঙ্কা রয়েছে। তৃণমূল নেতাদের দাবি বর্তমানে যোগ্য নেতৃত্ব ও আস্থার সংকটে ভুগছে খুলনা মহানগর বিএনপি।
খুলনা মহানগর বিএনপির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক ও কেসিসির ২২ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর মাহবুব কায়সার বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দলের কিছু নেতার চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও মানুষের সঙ্গে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণসহ বিভিন্ন অপকর্মের কারণে বিএনপি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া সাধারণ মানুষকে আবার আস্থায় ফিরিয়ে আনতে হবে। এজন্য সৎ, যোগ্য, দুর্নীতিমুক্ত, পরীক্ষিত ও জনবান্ধব নেতাদের মূল নেতৃত্বে বসাতে হবে। যারা নিজস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দলের হৃত গৌরব ফিরিয়ে আনার ব্রত নিয়ে আত্মোৎসর্গ করতে প্রস্তুত।
খুলনা মহানগর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক শেখ সাদী বলেন, ওয়ার্ড ও থানা কমিটির পূর্ণাঙ্গ কমিটি এখনো করা সম্ভব হয়নি। তবে মহানগর কমিটি ইচ্ছা করলেই আগামী দুই মাসের মধ্যেই পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা দেওয়া সম্ভব। বিগত স্বৈরাচার সরকারের আমলে যারা ভয়ভীতি উপেক্ষা করে রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামে সোচ্চার ছিলেন তারাই কমিটিতে থাকবেন। সবই আমাদের প্রস্তুত করা আছে।
তিনি আরও বলেন, দপ্তর সম্পাদক পদে একজনকে চলতি দায়িত্ব ও দলের মিডিয়া সেল নামে কোনো পদ-পদবী না থাকলেও আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে আমাদের পাঁচজনের পাশাপাশি মিডিয়া সেলের হয়ে কয়েকজন কাজ করছেন।
খুলনা মহানগর বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট এস এম শফিকুল আলম মনা বলেন, খুলনা বিএনপিতে কোনো দলীয় কোন্দল নেই। মহানগরীর পূর্ণাঙ্গ কমিটির নাম কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে জমা দেওয়া আছে। যে কোনো সময় কেন্দ্রীয় কমিটি পূর্ণাঙ্গ কমিটির নাম ঘোষণা করতে পারে। এছাড়া কেডিএ’র চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পাওয়ার পর দলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড চালাতেও কোনো অসুবিধা হচ্ছে না বলে তিনি উল্লেখ করেন।

