বিজ্ঞানের আশীর্বাদের আরেক পাশে কিছুটা অভিশাপও অবধারিত। এ আশীর্বাদ ও অভিশাপের সমন্বয়ে এগোয় সভ্যতা। এ জাগতিক নিয়মেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—এআই প্রযুক্তি সুযোগ তৈরি করছে, ঝুঁকিও আনছে। ভুয়া ছবি-ভিডিও (ডিপফেক), স্বয়ংক্রিয় ভুল তথ্য তৈরি, অনলাইন প্রতারণা এবং ব্যক্তিগত তথ্য অপব্যবহারের মতো ঝুঁকির মধ্যেও খুলছে সম্ভাবনার দুয়ার। বাংলাদেশে সাইবার নিরাপত্তা ও তথ্য সুরক্ষা নিয়ে আইন ও নীতিমালা থাকলেও এআই-নির্ভর ঝুঁকি মোকাবিলার পর্বও রাখতে হচ্ছে। ভালোমন্দ বাস্তবতা মিলিয়ে দেশে এআই সম্ভাবনা ক্রমেই অসীমে পৌঁছার হাতছানি দেশে দেশে । বাংলাদেশ এ দুনিয়ার বাইরে নয়। স্বাভাবিকভাবেই সম্ভাবনার সমান্তরালে কিছু সীমাবদ্ধতাও দৃশ্যমান। সম্ভাবনার বেশির ভাগই নির্ভর করছে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের ওপর। এ ব্যাপারে সরকারের আন্তরিকতার জানান দেওয়া হচ্ছে নিয়মিত।
দাতাগ্রহিতা কে না চায় কয়েক মাসের কাজ কয়েক ঘণ্টায় শেষ করতে? বাংলাদেশের তরুণদের বড় অংশ প্রযুক্তিতে আগ্রহী। অনেকে ফ্রিল্যান্সিং ও সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্টে কাজ করছে। এআই-সম্পর্কিত স্কিল শেখার প্রবণতাও বাড়ছে। এআই খাতে শুধু আগ্রহ যথেষ্ট নয়। গবেষণা ও শিল্প খাতের জন্য দরকার অভিজ্ঞ মেশিন লার্নিং প্রকৌশলী, ডেটা প্রকৌশলী, এআই পণ্য ব্যবস্থাপক এবং নৈতিকতা ও নিরাপত্তা জ্ঞানের পেশাজীবী। এ স্তরের দক্ষ জনবল এখনো তুলনামূলক কম। এরই মধ্যে তরুণ ফ্রিল্যান্সারদের এআই-ভিত্তিক কাজ করে বৈশ্বিক বাজারে নিজেদের অবস্থানের নিদর্শন রেখেছে। আলোচিত চতুর্থ শিল্পবিপ্লব নির্ভর করছে তাদের ওপরই। অবস্থার অনিবার্যতায় সরকার জাতীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যে কৌশল প্রণয়ন করেছে; তা শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষিতে এআই ব্যবহারের পথ দেখাবে। তবে এখনো কিছু ঝুঁকি রয়েছে। অটোমেশন ও এআইয়ের কারণে কিছু সনাতন খাতে কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়বে ।
যুগের চাহিদা ও আবশ্যকতায় দেশে কিছু জায়গায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি আছে। বিভিন্ন সময় এআই-সম্পর্কিত রোডম্যাপ, কৌশলপত্র ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্যোগ দেখা গেছে। এর বিপরীতে গবেষণা অবকাঠামো, দক্ষ মানবসম্পদ, ডেটা ব্যবস্থাপনা ও নীতিগত কাঠামোতে ঘাটতিও রয়েছে। তবে, সরকারের নীতিগত উদ্যোগ দৃশ্যমান। বাকি থাকছে বাস্তবায়ন। সেটা অবশ্যই কিছুটা অপেক্ষা ও সময়সাপেক্ষ। সরকারি দপ্তরগুলোর মধ্যে তথ্য ভাগাভাগি, ডেটা ব্যবস্থাপনা এবং একক মানদণ্ডে কাজ করার সক্ষমতা-মানসিকতা বাড়াতেই হবে। ইতিবাচক দিক হলো, দেশের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে মেশিন লার্নিং, ডেটা সায়েন্স ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে পড়াশোনা ও গবেষণা হচ্ছে। অনলাইন প্ল্যাটফরম ও আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ কোর্সের মাধ্যমেও অনেকে দক্ষ হচ্ছে। এ ব্যাপারে তরুণ শিক্ষার্থীদের আগ্রহ আশাব্যঞ্জক। কিছু স্টার্টআপ কৃষিতে রোগ শনাক্তকরণ, স্বাস্থ্য খাতে সহায়ক প্রযুক্তি এবং ভাষাভিত্তিক টুল নিয়ে কাজ করছে। ব্যাংকিং ও ফিনটেক, ই-কমার্স, কাস্টমার সার্ভিস, বিজ্ঞাপন এবং সাইবার নিরাপত্তায় এআই-ভিত্তিক সমাধান খোঁজার চর্চাও ভালো লক্ষণ। এখানে সীমাবদ্ধতা সলিউশন মাধ্যম নিয়ে। অনেক ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত এআই সলিউশন আসলে আন্তর্জাতিক কোম্পানির তৈরি মডেল বা সফটওয়্যার। এতে নিজস্ব সক্ষমতা ও স্থানীয় ভাষা-সংস্কৃতির উপযোগী প্রযুক্তি তৈরি এগোচ্ছে না। সেখানে মানোন্নয়ন আনতেই হবে।
এআই প্রযুক্তির উন্নয়নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ ডেটা। বাংলাদেশে মানসম্মত ডেটাসেট তৈরি, সংরক্ষণ-কাঠামো এখনো দুর্বল। সরকারি তথ্য অনেক ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্ন, অগোছালো। বেসরকারি খাতেও ডেটা ব্যবস্থাপনার মান ইউনিফাইড নয়। একই সমস্যা বাংলা ভাষার ক্ষেত্রেও। উন্নত মানের বাংলা ভাষার ডেটাসেট কম। এতে বাংলা ভাষাভিত্তিক এআই–যেমন উন্নত অনুবাদ, ভয়েস রিকগনিশন বা স্থানীয় প্রেক্ষাপট বোঝে, এমন চ্যাটবট খাপ খায় না। এর মধ্যেই এগিয়ে চলা। সম্ভাবনা তথা ভালো অংশ আয়ত্ত করা। বিশেষ করে, তৈরি পোশাক খাতে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, কৃষিতে রোগ ও আবহাওয়া বিশ্লেষণ, স্বাস্থ্য খাতে প্রাথমিক স্ক্রিনিং, শিক্ষা খাতে ব্যক্তিকেন্দ্রিক শেখার সহায়তার মতো ক্ষেত্রে এআই ভূমিকা রাখতে পারে । ডেটা অবকাঠামো উন্নয়ন, দক্ষ জনবল তৈরির দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং গবেষণা-শিল্প খাতে সংযোগ বাড়াতে পারলে এআই অর্থনৈতিক উন্নয়নের নতুন নিশানা দেখাবে । এআই প্রযুক্তি শুধু প্রযুক্তিগত পরিবর্তন নয়; অর্থনীতি, শিক্ষা ও সমাজব্যবস্থার বড় রূপান্তরের বিষয়ও। আগপিছ ভেবে সরকারিভাবেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বিষয়টিতে। দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি, গবেষণা ও উদ্ভাবনের পরিবেশ সৃষ্টি এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে তা এখন সরকারের টপ প্রায়োরিটিতে। বিশ্বমঞ্চেও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এআই শাসনে নিরাপত্তা, সমতা ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর ন্যায়সংগত অধিকারের দাবি জানানো হয়েছে। চীনের সাংহাইতে অনুষ্ঠিত গ্লোবাল এআই গভর্ন্যান্স মিটিংয়ে বাংলাদেশ প্রযুক্তি হস্তান্তরের পাশাপাশি বৈশ্বিক এআই ব্যবস্থাপনায় সমতা ও অভিযোজন সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছে। দেশব্যাপী এআই-ভিত্তিক দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার ওপর সর্বাধিক জোর দেওয়া হয়েছে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এআই গবেষণা ল্যাব স্থাপন করা হচ্ছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও শিল্পে এআই প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহারের বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশ্বের প্রায় সব দেশেই এআই প্রযুক্তির প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে এর ব্যবহার ও অপব্যবহার দুইই বাড়ছে।
বিশ্বের অনেক দেশেই এই প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে বিভিন্ন আইনি কাঠামো রয়েছে। রয়েছে দেশগুলোর পূর্ণাঙ্গ আইন, এক্সিকিউটিভ আদেশ, নীতিমালা, পলিসি বা স্ট্রাটেজি, বিল এমন নানা ধরনের আইনি পরিকাঠামোও। বাংলাদেশেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের সীমা বা অপব্যবহার রোধে আইনি কাঠামো ও সমন্বিত বিধিমালা নির্ধারণ করলে তা সম্ভাবনার দুয়ারই বেশি খুলবে। সেক্ষেত্রে প্রযুক্তি কতটুকু ব্যবহার করা যাবে আর কতটুকু যাবে না, সেটির সীমানা থাকতে হবে। মোটকথা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিতে শক্ত আইনি কাঠামো নিশ্চিত করতে হবে। ইউনেসকোর ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্র ২০২১ সালের নভেম্বর সর্বসম্মতিক্রমে ‘এথিকস অব আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স' অনুমোদন করে। এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সর্বোত্তম ব্যবহার এবং ঝুঁকি হ্রাস করাই ইউনেসকোর এই বৈশ্বিক কাঠামোর লক্ষ্য। অর্থাৎ বিভিন্ন দেশ যাতে তাদের পলিসি ও প্রস্তুতির সিদ্ধান্ত নিতে পারে, সেজন্যই ইউনেসকো 'রেডিনেস অ্যাসেসম্যান্ট মেথোডলজি' তৈরি করেছে। নৈতিক এআই অনুশীলনের ক্ষেত্রে একটি দেশের প্রস্তুতি নির্ধারণ করা হয় এই রামের মাধ্যমে। বাংলাদেশ ইউনেসকোর ঐ র্যামে যুক্ত হয়। সেটিতে অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও প্রশাসনসহ বিভিন্ন খাতে এআই ব্যবহারের রূপরেখা তৈরি করা হয়। বাস্তবায়ন হয়নি সেটি। পতনের আগে শেখ হাসিনার সরকারও এআইয়ের একটি খসড়া নীতিমালা তৈরি করেছিল। সেটিও খসড়াতেই থেকে যায় ।
এআই প্রযুক্তির দ্রুত প্রসার ও বৈচিত্র্যের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ তাদের প্রণীত আইন ও নীতিমালা যদ্দুর সম্ভব বাস্তবায়নও করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের এআই অ্যাক্টের মাধ্যমে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবস্থাকে আলাদা শ্রেণিভুক্ত করে নির্দিষ্ট নীতিমালায় বেঁধে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে স্বতন্ত্র আইন। এছাড়া এআই সম্পর্কিত আইনের ধারা বা বিধানও রয়েছে দেশটিতে। ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এআই নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উল্লেখযোগ্য আইন হলো 'ন্যাশনাল আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইনিশিয়েটিভ অ্যাক্ট, ২০২০', এআই ইন গভর্নমেন্ট অ্যাক্ট এবং অ্যাডভান্সিং অ্যামেরিকান এআই অ্যাক্ট।' যুক্তরাষ্ট্রের ১১৭তম কংগ্রেসে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পর্কিত কমপক্ষে ৭৫টি বিল উত্থাপন হয়। যার মধ্যে আইনে পরিণত করা হয় ছয়টিকে । কানাডায় এআই এবং ডেটা অ্যাক্ট দুটোই রয়েছে। ভারত ২০১৮ সালেই 'ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজি ফর আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স' নামে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, অবকাঠামো, বাণিজ্যসহ বিভিন্ন খাতভিত্তিক এআই ব্যবহারের কৌশলপত্র করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাতও এআই নিয়ে কৌশলনীতি করেছে। চীন তো অ্যালগরিদমের ব্যবহারকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণে এনেছে, যেন তা রাষ্ট্রবিরোধী বা সামাজিক বিশৃঙ্খলা তৈরিতে ব্যবহার না হয়। এসব দেশের সঙ্গে তুলনা করলে আইন বা বিধিবিধানে বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে। গুরুত্ব যখন অনুভব করেছে, তখন নীতি, আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নও নিশ্চয়ই সম্ভব হবে।
• লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট

