আন্দোলনে প্রিজন ভ্যানের সামনে দাঁড়িয়ে আলোচনায়, কে এই ভারতীয় মডেল

আপডেট : ২৫ জুলাই ২০২৬, ০০:৪১

ভারতের মুম্বাইয়ের ২৭ বছর বয়সী মডেল ও থিয়েটারশিল্পী রিয়া আহির বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছেন। শিক্ষাব্যবস্থার নানা অনিয়মের প্রতিবাদে আয়োজিত বিক্ষোভে পুলিশ কয়েকজন আন্দোলনকারীকে আটক করলে, তাদের মুক্তির দাবিতে তিনি নিদ্বির্ধায় পুলিশের ভ্যানের সামনে গিয়ে দাঁড়ান।

সেই সাহসী অবস্থানের দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর নেটিজেনরা তাকে ‘সাহসী’ ও অকুতোভয় আখ্যা দিয়ে প্রশংসায় ভাসাচ্ছেন। সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডেকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে নিজের এই তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ সম্পর্কে রিয়া জানান, তার বাবা-মা মেয়ের এই সাহসিকতায় ভীষণ খুশি হয়েছেন এবং তাকে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছেন।

মুম্বাইয়ের শিবাজি পার্কে জাতীয় মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষার (NEET) প্রশ্নফাঁস এবং শিক্ষাব্যবস্থার সামগ্রিক অব্যবস্থাপনার প্রতিবাদে রাজপথে নেমেছিলেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনের একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে পুলিশ কয়েকজন বিক্ষোভকারীকে আটক করে জোরপূর্বক পুলিশের ভ্যানে তোলে, যার মধ্যে নারী আন্দোলনকারীও ছিলেন।

রিয়া আহির জানান, আটক হওয়া সেই ব্যক্তিদের কাউকেই তিনি ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন না। তবে যেভাবে গাদাগাদি করে মানুষকে ভ্যানে তোলা হচ্ছিল, তা দেখে নাগরিক দায়বদ্ধতা থেকেই তিনি চুপ থাকতে পারেননি। তিনি বলেন, ভ্যানে অনেককে তুলে দেওয়া দেখে তিনি এক নারীকে নামিয়ে আনার চেষ্টা করেন, কিন্তু পুলিশ বাধা দেয়। শেষ পর্যন্ত উপায় না দেখে তিনি চলন্ত ভ্যানের ঠিক সামনে গিয়ে দাঁড়ান এবং আটকে থাকা সবাইকে ছেড়ে দেওয়ার দাবি জানান।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, রিয়া অবিচলভাবে পুলিশের ভ্যানের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন এবং সেখান থেকে সরে যেতে স্পষ্টভাবে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন। রিয়ার অভিযোগ, তাকে ভয় দেখিয়ে সরিয়ে দেওয়ার জন্য ভ্যানচালক বেশ কয়েকবার জোরে ইঞ্জিন চালিয়ে গাড়ি সামনে নেওয়ার ভয় দেখান, কিন্তু তিনি একচুলও নড়েননি।

রিয়ার এই অদম্য অবস্থান দেখে অন্য আন্দোলনকারীরাও তার পাশে এসে কাঁধ মেলান। তীব্র প্রতিবাদ ও তোপের মুখে পড়ে শেষ পর্যন্ত পুলিশ আটক ব্যক্তিদের শিবাজি পার্কেই ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।

রিয়া জানান, এটিই ছিল তার জীবনের প্রথম কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক আন্দোলনে অংশগ্রহণ। ২১ জুলাই তিনি প্রথমবার শিবাজি পার্কে গিয়েছিলেন, কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর আগেই পুলিশ অনেককে আটক করায় তিনি পরদিন ২২ জুলাই আবার সেখানে যান। আর সেদিনই ঘটে যায় সেই অনাকাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত, যা তাকে এক লহমায় পরিচিত মুখ বানিয়ে তোলে। রিয়া বলেন, আন্দোলনটির অন্যতম পরিচিত মুখ হয়ে ওঠার কোনো পরিকল্পনা তার ছিল না; পুলিশি পদক্ষেপের মুখোমুখি হয়ে সে মুহূর্তে নিজের বিবেকের তাড়না থেকেই সিদ্ধান্তটি নিয়েছিলেন।

এমন বিপদের মুখেও সাহসের পরিচয় দেওয়া প্রসঙ্গে রিয়া জানান, তার পরিবারের সঙ্গে ভারতের সশস্ত্র বাহিনীর দীর্ঘ ও গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তার বাবা ভারত-তিব্বত সীমান্ত পুলিশে (ITBP) দীর্ঘকাল দায়িত্ব পালন করেছেন এবং পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্যও প্রতিরক্ষাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। রিয়া মুচকি হেসে বলেন, এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস হয়তো তাঁর রক্তেই প্রবাহিত হচ্ছিল।

রিয়া মনে করেন, এই সংগ্রাম কেবল প্রশ্নফাঁসের বিরুদ্ধে নয়, বরং গোটা শিক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কারের পক্ষে। মনোবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা শুরু করলেও পেশাগত ব্যাস্ততায় গ্র্যাজুয়েশন শেষ করতে পারেননি রিয়া। বর্তমানে তিনি মুম্বাই বিশ্ববিদ্যালয়ের দূরশিক্ষা কার্যক্রমের আওতায় ইংরেজি সাহিত্যে পড়াশোনা করছেন।

নিজের পড়াশোনার অভিজ্ঞতা থেকে অভিযোগ তুলে রিয়া বলেন, নিয়মিত কোর্স ফি পরিশোধ করা সত্ত্বেও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ন্যূনতম প্রশাসনিক সহায়তা পাওয়া যায় না এবং সরকারি যোগাযোগের নম্বরগুলোতেও কেউ সাড়া দেয় না। তার ভাষায়, এটি শুধু বিশেষ একটি পরীক্ষার বিষয় নয়, পুরো ব্যবস্থার যে গলদ রয়েছে—এ আন্দোলন তারই এক সম্মিলিত প্রতিবাদ।

প্রতিবাদের মুখ হয়ে ওঠার পাশাপাশি পেশাগত জীবনে রিয়া আহির প্রায় ১৩ বছর ধরে নিয়মিত হিন্দি থিয়েটারে যুক্ত রয়েছেন এবং দাপটের সাথে মডেলিং করছেন। এর বাইরে গত বছর তিনি ‘রিয়াসত’ নামে নিজস্ব একটি উদ্যোগ চালু করেন, যার মূল কাজ হলো স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্পীদের তৈরি পণ্য সরাসরি ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া। আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ব্র্যান্ড প্রাডার কোলহাপুরি চপ্পলের নকশা বিতর্কের পর দেশের প্রান্তিক কারিগরদের কাজকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তুলে ধরার ভাবনা থেকেই এই সামাজিক উদ্যোগের জন্ম দেন তিনি।

ইত্তেফাক/এএম