রাজধানীতে টানা কয়েক দিনের বৃষ্টিতে আবারও স্পষ্ট হয়েছে ঢাকার দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা সংকট। গত ৩০ বছরে শহরের নির্মিত এলাকা প্রায় ১৮৮ শতাংশ বেড়ে গেলেও সেই অনুপাতে গড়ে ওঠেনি কার্যকর ও টেকসই পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা। বরং জলাশয় ও সবুজ এলাকা কমে যাওয়ায় অল্প সময়ের ভারী বৃষ্টিতেই রাজধানীর বিস্তীর্ণ এলাকায় পানি জমে জনজীবন স্থবির হয়ে পড়ছে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্টেফিক রিপোর্টে প্রকাশিত এক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে।
গবেষকরা বলছেন, শুধু নতুন ড্রেন নির্মাণ নয়, প্রকৃতিভিত্তিক অবকাঠামো ও সমন্বিত নগর পরিকল্পনা ছাড়া এ সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
গবেষণায় বলা হয়, দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল-জলাশয় ভরাট, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ, বর্জ্যে ড্রেন বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাড়তি বৃষ্টিপাত—সব মিলিয়ে ঢাকা বিশ্বের সবচেয়ে জলবায়ু ও বন্যা-ঝুঁকিপূর্ণ মেগাসিটিগুলোর একটি হয়ে উঠেছে। গবেষকদের মতে, শুধু কংক্রিটনির্ভর ড্রেনেজ ব্যবস্থা দিয়ে এ সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এর পাশাপাশি প্রকৃতিভিত্তিক বা সবুজ অবকাঠামো, জলাধার সংরক্ষণ এবং বৃষ্টির পানি ধারণ ও শোষণের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ঢাকায় এখনো শহরব্যাপী কোনো সমন্বিত সবুজ অবকাঠামো বা জলসংবেদনশীল বৃষ্টির পানি ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠেনি। বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে দায়িত্ব বিভক্ত থাকায় দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এদিকে, ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর রাজধানীর স্টর্ম ওয়াটার ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ঢাকা ওয়াসা থেকে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। সে সময় সরকারের যুক্তি ছিল, সড়ক, খাল, ড্রেন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা একই প্রতিষ্ঠানের অধীনে এলে সমন্বয় বাড়বে এবং জলাবদ্ধতা নিরসনে গতি আসবে। সেই অনুযায়ী ২৬টি খাল, স্টর্ম স্যুয়ার ও বক্স কালভার্ট দুই সিটি কর্পোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তবে সাড়ে পাঁচ বছর পরও রাজধানীর জলাবদ্ধতা পরিস্থিতিতে প্রত্যাশিত উন্নতি দৃশ্যমান হয়নি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চলতি বছরও দুই সিটি কর্পোরেশন রাজধানীর ১৪১টি এলাকাকে জলাবদ্ধতাপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সাম্প্রতিক বৃষ্টিতে এসব এলাকার অনেকগুলোতেই দীর্ঘ সময় পানি জমে ছিল। বিভিন্ন স্থানে ড্রেনে প্লাস্টিক, পলিথিন ও কঠিন বর্জ্য জমে থাকায় পানি স্বাভাবিকভাবে প্রবাহিত হতে পারেনি। কোথাও খাল দখল, কোথাও ড্রেনের মুখ বন্ধ থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান ইত্তেফাককে বলেন, জলাবদ্ধতা বৃদ্ধির বেশ কিছু কারণ রয়েছে—পাবলিক অসচেতনতা, স্লুইস গেট বন্ধ হয়ে যাওয়া, ড্রেনেজ পথের দূরত্ব বেশি হওয়া, জলাশয় কমে যাওয়া, ঢাকায় ক্যাপাসিটির তুলনায় বিপুল লোকের বসবাসসহ বেশ কিছু কারণে এই জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। তবে এর মধ্যে অন্যতম কারণ মানুষের অসচেতনতা।’
তিনি বলেন, আমরা জলাবদ্ধতা কমাতে ড্রেনেজ ডিজাইন পরিবর্তন, পানি নামার জন্য রাস্তার দূরত্ব কমানোসহ বেশকিছু পরিকল্পনা হাতে নিয়েছি। তবে আমাদের জনবলের ঘাটতি রয়েছে। এখনো আমাদের নিজস্ব ড্রেনেজ সার্কেল চালু হয়নি। জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রে তা অনুমোদনের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পেপারস পাঠানো হয়েছে। যেটি এখনো অনুমোদন হয়নি। জলাবদ্ধতা নিরসনে আমরা যে উদ্যোগ নিয়েছি তা বাস্তবায়ন হলে আশা করছি, কাজে গতি আসবে, নগরবাসীরও ভোগান্তি কমবে।’
জলাবদ্ধতা নিরসনে সরকারি ব্যয়ও ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। দুই সিটি কর্পোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে প্রায় ৩৩৪ কিলোমিটার ড্রেন ও বক্স কালভার্ট নির্মাণে ২৬২ কোটির বেশি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। খাল পুনরুদ্ধার, ড্রেন পরিষ্কার, পাম্প পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্যও প্রতি বছর আলাদা বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি রাজধানীর পানি নিষ্কাশন ও খাল উন্নয়নে হাজার কোটি টাকার বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। তবু বর্ষা এলেই বিস্তীর্ণ এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দেওয়ায় এসব ব্যয়ের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
ঢাকা ওয়াসার ঠিকাদার সমিতির সদস্য সচিব ইউনুফ হোসেন বলেন, ঢাকা ওয়াসার ড্রেনেজ বিভাগের প্রধান দায়িত্ব ছিল খাল-নালা রক্ষণাবেক্ষণ এবং জলাবদ্ধতা নিরসন। তবে ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব সিটি কর্পোরেশনের কাছে হস্তান্তরের পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তারা পূর্ণাঙ্গ ড্রেনেজ বিভাগ গড়ে তুলতে পারেনি। ফলে প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল ও অভিজ্ঞতার ঘাটতি থেকে গেছে, যা রাজধানীতে জলাবদ্ধতা সমস্যার অন্যতম কারণ বলে তিনি মনে করেন।
তার ভাষ্য, ‘সামান্য বৃষ্টিতেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পানি জমে যায়। ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব আবারও ঢাকা ওয়াসার কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে। ওয়াসার দক্ষ জনবল ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের সমন্বিত উদ্যোগে জলাবদ্ধতা নিরসনে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব। ব্যক্তিগতভাবে আমি বিশ্বাস করি, এ সমস্যার সমাধানে ওয়াসাকে দায়িত্ব ফিরিয়ে দেওয়াই সবচেয়ে কার্যকর হবে।’
এদিকে বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ঢাকার স্যানিটেশন ও পানি নিষ্কাশন অবকাঠামো এখনো প্রয়োজনের তুলনায় অনেক পিছিয়ে। মাত্র ২০ শতাংশ বাসিন্দা পাইপলাইনভিত্তিক স্যুয়ারেজ নেটওয়ার্কের আওতায় রয়েছে। দ্রুত নগরায়ণ, খাল দখল, দূষণ ও দুর্বল রক্ষণাবেক্ষণের কারণে রাজধানীর ড্রেনেজ ব্যবস্থা ক্রমেই চাপে পড়ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সম্প্রতি ৩৭০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের ‘মেট্রো ঢাকা ওয়াটার সিকিউরিটি অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স প্রোগ্রাম’ অনুমোদন করেছে বিশ্বব্যাংক।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও গবেষকদের মতে, জলাবদ্ধতা নিরসনে শুধু নতুন ড্রেন নির্মাণ করলেই হবে না। প্রকল্প-পরবর্তী নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, খাল ও জলাধার সংরক্ষণ, বৃষ্টির পানি ধারণ ও শোষণের সক্ষমতা বৃদ্ধি, সবুজ অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় প্রতি বছর নতুন প্রকল্প ও বাড়তি বরাদ্দের পরও রাজধানীবাসীকে একই দুর্ভোগের মুখোমুখি হতে হবে।

