প্রমাণ পেয়েছে শিক্ষা অডিট অধিদপ্তর

বিনা মূল্যের পাঠ্যবই ছাপাতে ২৭১১ কোটি টাকার অনিয়ম

আপডেট : ২৭ জুলাই ২০২৬, ০৪:৪০

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) বিনা মূল্যের পাঠ্যবই ছাপানো ঘিরে প্রায় ২০টি খাতে ২ হাজার ৭১১ কোটি ২০ লাখ টাকার অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই অনিয়ম হয়েছে।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ঐ অর্থবছরে চাহিদা না থাকলেও ৫১৬ কোটি ৩৪ লাখ ৪১ হাজার ২১১ টাকার অতিরিক্ত বই ছাপায় এনসিটিবি। কাগজের মান যাচাই না করেই ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকার বই শিক্ষার্থীদের দিয়েছে সংস্থাটি। ইন্সপেকশন এজেন্ট থাকার পরও দেড় কোটি টাকার প্রেস মনিটরিং বিল নেন এনসিটিবির সাবেক চেয়ারম্যানসহ কর্মকর্তারা, যেটা সরকারের অপচয় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এছাড়া টেন্ডারে সর্বনিম্ন দরদাতাকে বাদ দিয়ে অন্যদের পাঠ্যপুস্তক ছাপানোর কার্যাদেশ দেওয়া হয়। ঠিকাদারদের যোগসাজশ ও ‘সিন্ডিকেট দর’ প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও দরপত্র বাতিল না করে কার্যাদেশ প্রদান করায় ৬১ কোটি ৮ লাখ ৮২ হাজার ৪১৫ টাকা সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

এনসিটিবি সচিব প্রফেসর শাহ মুহাম্মদ ফিরোজ আল ফেরদৌস গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ‘শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের এই প্রতিবেদনের বিষয়ে এখনো তিনি কিছু জানেন না।’ এ বিষয়ে জানতে এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলার মোবাইল ফোনে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তবে এনসিটিবির একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইত্তেফাককে বলেন, প্রতিবেদনের বিষয়ে এনসিটিবিতে আলোচনা হয়েছে। তবে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবই ছাপানোর দরপত্রেও ‘সিন্ডিকেট দর’ দিয়েছে ছাপাখানাগুলোর সিন্ডিকেট। এ কারণে আগের ‘সিন্ডিকেট দর’ ও অনিয়ম নিয়ে বেশি মাথা ঘামাতে চায় না এনসিটিবি। ঐ কর্মকর্তা আরও বলেন, আগামী বছরের পাঠ্যবইয়ের ই-টেন্ডারে প্রাক্কলিত দর প্রতি ফর্মায় বাড়ানো হয়েছে ৩০ পয়সা থেকে ৪৫ পয়সা। এবার ছাপাখানা মালিকদের সিন্ডিকেট করতে এনসিটিবি ও মন্ত্রণালয়ের এক শ্রেণির কর্মকর্তারা সরাসরি জড়িত ছিলেন। কিছু ছাপাখানা সিন্ডিকেটে যেতে চায়নি। কিন্তু এক শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তাদের চাপে যেতে বাধ্য হন।

শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এনসিটিবির পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ, বাঁধাই ও সরবরাহ কার্যক্রমে বেশি অনিয়ম হয়েছে। প্রথম সর্বনিম্ন দরদাতাকে কার্যাদেশ প্রদান না করে দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম, ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম, নবম, দশম, এমনকি এগারোতম দরদাতাকে কার্যাদেশ প্রদান করা হয়। এর ফলে সরকারের ৪ কোটি ৪৯ লাখ ৪৩ হাজার ৩৪৩ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছে অডিট অধিদপ্তর। এছাড়া প্রাপ্যতা না থাকা সত্ত্বেও এনসিটিবির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উত্সাহ-উদ্দীপনা ভাতা বাবদ ১ কোটি ৬ লাখ ৯৩ হাজার ২৯৭ টাকা দেওয়া হয়েছে। এই টাকা আদায় করে বোর্ডে ফেরত দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। শুধু তাই নয়; বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যানসহ অন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কোনো ধরনের প্রাপ্যতা না থাকা সত্ত্বেও অতিরিক্ত হারে প্রশিক্ষণ এবং কর্মশালা বাবদ সম্মানি প্রদান করা হয়েছে। এতে এনসিটিবির আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৭৬ লাখ ২৮ হাজার ১৫৩ টাকা। প্রাপ্যতা না থাকা সত্ত্বেও বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যানসহ অন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মিত কাজের জন্য সম্মানি হিসেবে ৭৯ লাখ ৭০ হাজার ৮৫০ টাকা দেওয়া হয়েছে। এটা সরকারের আর্থিক অপচয়।

প্রতিবছর পাঠ্য বইয়ের রং, আকার, কাগজের মান ও কালি ঠিকঠাক আছে কী না তা যাচাইয়ে প্রি-ডেলিভারি ইন্সপেকশন (পিডিআই) করে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি)। এর জন্য দরপত্রের মাধ্যমে তৃতীয় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এক বছরে ৫৭ লাখ টাকা চুক্তিতে নেওয়া ইন্সপেকশন এজেন্ট থাকলেও প্রেসের কাজ দেখাশোনার জন্য বোর্ডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রেস মনিটরিংয়ের নামে অতিরিক্ত বিল গ্রহণ করেছেন। এতে বোর্ডের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ১ কোটি ৩৭ লাখ ২৬ হাজার ১০০ টাকা। দরপত্র সংক্রান্ত কমিটির সদস্যদের প্রাপ্যতা বহির্ভূতভাবে ৩৫ লাখ ৩৪ হাজার ৬৮০ টাকার সম্মানি দেওয়া হয়েছে। ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে এনসিটিবি যাদের সম্মানি দিয়েছে, তাদের বিল হতে আয়কর কর্তন না করায় সরকারের ২৪ লাখ ৯০ হাজার ৭৭২ টাকা রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে। প্রাপ্যতা না থাকা সত্ত্বেও বোর্ডের ইনসিটু আওতাধীন সেসিপ প্রকল্পের কর্মকর্তাদের সম্মানি ভাতা দেওয়া হয়েছে। এর ফলে এনসিটিবির ২১ লাখ ৪০ হাজার ৯১৭ টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।

অডিট অধিদপ্তরের নিরীক্ষায় বলা হয়েছে, পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ, বাঁধাই ও সরবরাহ কাজে প্রাক্কলিত ব্যয় অপেক্ষা অতিরিক্ত ও চড়া দরে কার্যাদেশ দিয়েছে এনসিটিবি। এর ফলে সরকারের ২১৬ কোটি ৪৯ লাখ ২৯ হাজার ৭৫৪ টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া এনসিটিবির নিজস্ব রুটিনভুক্ত কাজের জন্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে অযৌক্তিকভাবে টাকা দেওয়া হয়েছে। যার ফলে বোর্ডের ৩২ লাখ ৬২ হাজার ৯৭০ টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। বোর্ডের কর্মকর্তাদের বিভিন্ন সময় দেওয়া অগ্রিম অর্থ সমন্বয় করেনি এনসিটিবি। এর ফলে ১৭ লাখ ৯৬ হাজার ৩৬০ টাকার আর্থিক অনিয়ম হয়েছে। এছাড়া অডিট প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, কোনো ধরনের নিয়মনীতি বা বিধির তোয়াক্কা না করে নির্ধারিত সীমার অতিরিক্ত ৫ কোটি ১ লাখ ৫২ হাজার ৭৪০ টাকা অগ্রিম উত্তোলন করা হয়েছে।

মুদ্রণ শিল্প সমিতির সাবেক সভাপতি তোফায়েল খান বলেন, শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের নিরীক্ষা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সরকার ব্যবস্থা গ্রহণ করলে পাঠ্যবই ছাপানো ঘিরে সিন্ডিকেট ভেঙে যাবে।

 
ইত্তেফাক/এমএস