অতি সমপ্রতি টুথপেস্ট নিয়ে একটি গবেষণা রিপোর্ট দেশের সাধারণ মানুষকে আতঙ্কগ্রস্ত করে তুলেছে। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত পরিচালিত এক গবেষণায় ১৯টি প্রধান ব্র্যান্ডের ৩৪টি টুথপেস্টের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। ৩৪টি টুথপেস্টের ২৬টিতেই মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। দেশে তৈরি ২৫টি নমুনার মধ্যে ২২টিতে, ভারতের পাঁচটি নমুনার একটিতে, থাইল্যান্ডের দুটি নমুনার একটিতে এবং ভিয়েতনামে তৈরি দুটি নমুনার দুটিতেই মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে।
মাইক্রোপ্লাস্টিক (সাধারণত ৫ মিমি-এর চেয়ে ছোট প্লাস্টিক কণা) এবং আরো ক্ষুদ্র ন্যানোপ্লাস্টিক যা এখন আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
টুথপেস্টে কেন মাইক্রোপ্লাস্টিক ব্যবহার করা হয়? এটি দাঁতের প্লাক ও দাগ তুলতে সাহায্য করে, দাঁত মসৃণ ও চকচকে করে এবং সুগন্ধি বা অন্য উপাদানের নিয়ন্ত্রিত নিঃসারণ ঘটায়।
কিন্তু পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য রক্ষায় প্লাস্টিকের ব্যবহার কমাতে এখন মাইক্রোপ্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে টুথপেস্টে Hydrated silica, Calcium carbonate, Dicalcium phosphate, Sodium bicarbonate (বেকিং সোডা), Hydroxyapatite, Calcium phosphate, Cellulose-ভিত্তিক বায়োডিগ্রেডেবল কণা, Starch-ভিত্তিক বা অন্যান্য প্রাকৃতিক বায়োপলিমার। এর মধ্যে হাইড্রেটেড সিলিকা সবচেয়ে বেশি ব্যবহূত হয়।
এগুলো প্লাক ও দাগ পরিষ্কার করতে কার্যকর কিন্তু মাইক্রোপ্লাস্টিক নয় বলে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য নিয়ে কোনো উদ্বেগ তৈরি করে না।
টুথপেস্টের প্লাস্টিক মুখ ও দাঁতের কী ক্ষতি করে?
এখন পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক মুখের টিস্যুতে বা দাঁতে কোনো রোগ সৃষ্টি করে এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।
টুথপেস্টে ব্যবহূত মাইক্রোপ্লাস্টিক সরাসরি মুখ ও দাঁতের কোনো ক্ষতি করার প্রমাণ না পাওয়া গেলেও মানবদেহে তার কিছু ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ আছে।
মাইক্রোপ্লাস্টিক মানবদেহে কী ধরনের ক্ষতি করতে পারে—এ নিয়ে বর্তমানে ব্যাপক গবেষণা চলছে। গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের রক্ত, ফুসফুস, যকৃত, প্লাসেন্টা এমনকি কিছু ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের টিস্যুতেও মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। তবে কোন মাত্রায় এগুলো নিশ্চিতভাবে রোগ সৃষ্টি করে, তা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নন গবেষকরা।
গবেষকরা ধারণা করছেন, শরীরের কোষে মাইক্রোপ্লাস্টিক জমা হলে দীর্ঘমেয়াদি নিম্নমাত্রার প্রদাহ, কোষের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ব্যাঘাত সৃষ্টি, প্রজননক্ষমতা কমে যাওয়া, হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া, ভ্রূণের স্বাভাবিক বিকাশে প্রভাব পড়া, হূদ্রোগ বা স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়া, শ্বাসনালীর প্রদাহ, ফুসফুসের কার্যক্ষমতা কমে যাওয়া, দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
খাবার ও পানির মাধ্যমে মাইক্রোপ্লাস্টিক অন্ত্রে প্রবেশ করে অন্ত্রের মাইক্রোবায়োমে পরিবর্তন আনতে পারে এবং অন্ত্রের প্রাচীরের স্বাভাবিক কার্যকারিতায় প্রভাব ফেলতে পারে কিছু গবেষণায় ধারণা দেওয়া হয়েছে।
তবে এর কোনটিই এখনো প্রমাণিত নয়; এখনো নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে, মাইক্রোপ্লাস্টিকই সরাসরি এই রোগগুলোর কারণ। তারচেয়েও বড় কথা, এই সমস্যাগুলো টুথপেস্টে ব্যবহূত মাইক্রোপ্লাস্টিক সরাসরি বা প্রত্যপ্রত্যক্ষভাবে করছে এমন নয়।
তাহলে টুথপেস্ট নিয়ে উদ্বেগ কোথায়? মূল উদ্বেগ পরিবেশগত। আপনি দাঁত ব্রাশ করার পর যে কুলি করেন, তা বেসিন থেকে ড্রেন দিয়ে নদী-নালা-সমুদ্রে চলে যায়। বর্জ্য পরিশোধন কেন্দ্র এগুলো পুরোপুরি আটকাতে পারে না। মাছ, শামুক, কচ্ছপ ও অন্যান্য জলজ প্রাণী এগুলো খেয়ে ফেলে। এভাবে খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করতে পারে।
প্লাস্টিক শত শত বছর পর্যন্ত পরিবেশে থেকে যেতে পারে।
এই মাইক্রোপ্লাস্টিক মানুষের শরীরে গুরুতর কোনো রোগ সৃষ্টি করে কী না সে বিষয়ে এখনো যথেষ্ট গবেষণা ভিত্তিক প্রমাণ মেলেনি। গবেষণা চলমান।
মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর সরাসরি টুথপেস্টের microbeads-এর প্রভাব সম্পর্কে এখনো গবেষণা চলছে, তবে পরিবেশগত ক্ষতি নিয়ে ঐকমত্য অনেক বেশি শক্তিশালী।
আপনাদের বরং আরেকটি তথ্য দেই। এই যে আমরা বোতলজাত পানি খাই, এই পানিতে কিন্তু প্রচুর মাইক্রোপ্লস্টিক আছে। তবুও কি আমরা পানি খাচ্ছি না? যদি মাইক্রোপ্লাস্টিকসহ পানি সরাসরি পাকস্থলিতে চালান দিতে ভয় না পান, তবে যে টুথপেস্ট দিয়ে দাঁত ব্রাশ করে কুলি করে ফেলে দিচ্ছেন, তা নিয়ে এত উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই।
আপনি তো আর পেস্ট খাচ্ছেন না। তাই আতঙ্কগ্রস্ত না হয়ে দেশি টুথপেস্ট দিয়েই দাঁত ব্রাশ করতে থাকুন।
তবে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর প্লাস্টিকের ক্ষতিকর প্রভাবের কথা বিবেচনা করে পেস্ট প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলোর উচিত মাইক্রোপ্লাস্টিকের ব্যবহার কমিয়ে আনা।
টুথপেস্টে ইচ্ছাকৃতভাবে যোগ করা মাইক্রোপ্লাস্টিক (বিশেষ করে microbeads) এখন আর ভালো প্রযুক্তি হিসেবে বিবেচিত হয় না। অতীতে এগুলো কিছু কার্যকারিতার জন্য ব্যবহার করা হলেও বর্তমানে পরিবেশগত ক্ষতির কারণে অনেক দেশ এগুলো ধাপে ধাপে বন্ধ করছে।
যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, ফ্রান্স, ইতালি, সুইডেন, দক্ষিণ কোরিয়া, নিউজিল্যান্ড, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য দেশগুলোতে ধাপে ধাপে ইচ্ছাকৃত ভাবে মাইক্রোপ্লাস্টিক ব্যবহারের ওপর নিয়ন্ত্রণ কার্যকর করছে। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২০২৩ সালে ইচ্ছাকৃতভাবে যোগ করা মাইক্রোপ্লাস্টিক-এর ওপর বিস্তৃত বিধিনিষেধ জারি করেছে, যার বিভিন্ন পণ্যের জন্য ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সময়সূচি রয়েছে।
তবে বাংলাদেশে টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক ব্যবহারের জন্য আলাদা কোনো জাতীয় নিষেধাজ্ঞা বা সতর্কতা জারি নেই। এ বিষয়ে একটি নীতিমালা প্রণীত হলে তা মেনে টুথপেস্ট কম্পানিগুলো পণ্য উৎপাদন করবে এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজারে সুনামের সঙ্গে টিকে থাকবে।
লেখক পরিচিতি : ডা. সাখাওয়াৎ হোসেন সায়ন্থ
ওরাল অ্যান্ড ম্যাক্সিলোফেসিয়াল সার্জন, ডিন, ডেন্টাল ফ্যাকাল্টি, বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়

