ইরানের সবচেয়ে বড় কারাগারে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের হার আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধির প্রতিবাদে গণঅনশন শুরু করেছেন অন্তত দেড় হাজার বন্দি। এমনকি অভিনব ও মর্মান্তিক প্রতিবাদ হিসেবে নিজেদের ঠোঁট সেলাই করে ফেলেছেন অনেক কয়েদি। মূলত মাদক সংক্রান্ত অপরাধ এবং সরকারবিরোধী বিক্ষোভে জড়িত থাকার অভিযোগে সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপকভাবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রেক্ষাপটে এই অনশনের সূত্রপাত হয়েছে।
মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী তেহরানের অদূরে অবস্থিত ঘেজেল হেসার কারাগারে এই গণঅনশন চলছে। গত দুই সপ্তাহ ধরে চলা এই প্রতিবাদ শুরু হয় মূলত মাদক মামলায় সাজাপ্রাপ্ত ছয়জন বন্দিকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে নির্জন প্রকোষ্ঠে (সলিটারি কনফাইনমেন্ট) স্থানান্তরের পর।
নির্বাসিত মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রকাশিত বেশ কয়েকটি ভিডিওতে দেখা যায়, বন্দিরা কারাগারের বারান্দায় বসে 'মৃত্যুদণ্ডকে না বলুন' লেখা প্ল্যাকার্ড হাতে 'আমাদের কণ্ঠস্বর হোন' বলে স্লোগান দিচ্ছেন। এর মধ্যে একটি ভিডিওতে দেখা যায়, একজন বন্দি ক্যামেরার সামনে জানাচ্ছেন, টানা ছয় দিন অনশনের পরও কারা কর্তৃপক্ষ কোনো সাড়া না দেওয়ায় তিনি নিজের ঠোঁট সেলাই করে ফেলছেন। এরপর অন্য এক বন্দিকে সুই-সুতো দিয়ে ওই ব্যক্তির ঠোঁট সেলাই করে দিতে দেখা যায়। আরেকটি ভিডিওতে এক বন্দি অসুস্থ হয়ে পড়া সহকয়েদিদের জন্য জরুরি চিকিৎসা সহায়তার আকুতি জানান। তিনি অভিযোগ করেন, কারা প্রহরীরা সেলের দরজা খুলছেন না, যার ফলে মুমূর্ষুদের কারাগারের চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে ইরানে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের হার ব্যাপকভাবে বেড়েছে। এর প্রতিবাদে ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাস থেকে বন্দিদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া মৃত্যুদণ্ডবিরোধী প্রচারণারই সর্বশেষ ধাপ এই অনশন। এদিকে, গত সপ্তাহান্তে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হঠাৎ করেই দুই সপ্তাহের বোমা হামলা কর্মসূচি স্থগিত করেছেন। তবে তেহরানের সঙ্গে আলোচনায় অগ্রগতি না হলে ফের হামলার হুমকি দিয়ে রেখেছেন তিনি।
তেহরানের একটি সূত্রের দাবি, যখনই যুদ্ধ পরিস্থিতির কিছুটা অবসান ঘটে বা নজর সরে যায়, তখনই কর্তৃপক্ষের নিষ্ঠুরতা বেড়ে যায়। সূত্রটি জানায়, মার্কিন-ইরান যুদ্ধবিরতি চুক্তির দিন, অর্থাৎ গত ৬ এপ্রিলও একজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।
নরওয়েভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ‘ইরান হিউম্যান রাইটস’ (আইএইচআরএনজিও)-এর তথ্যমতে, চলতি বছর দেশটিতে অন্তত ৪২৪ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে এবং আরও শত শত মানুষ মৃত্যুদণ্ডের প্রহর গুনছেন। সংস্থাটি বলছে, এসব দণ্ডের বেশিরভাগই দেওয়া হয়েছে মাদক সংক্রান্ত মামলায়।
রাজনৈতিক বন্দি ও বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদণ্ডও ব্যাপক হারে বেড়েছে। গত মঙ্গলবার সরকারবিরোধী বিক্ষোভ চলাকালে দুই পুলিশ সদস্যকে হত্যার দায়ে 'ঈশ্বরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ' করার অভিযোগে দুই ব্যক্তির ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছর জানুয়ারি মাসের বিক্ষোভের সঙ্গে জড়িত অন্তত ২৬ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলো।
আইএইচআরএনজিও-এর পরিচালক মাহমুদ আমিরি-মোগাদ্দাম জানান, মাদক মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা অত্যন্ত প্রান্তিক এবং তাদের কথা বলার কেউ নেই। তিনি বলেন, শুধু গত বছরই মাদকের অভিযোগে অন্তত ৭৯৫ জনকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে। অথচ তাদের বাঁচাতে আন্তর্জাতিক বা স্থানীয় পর্যায়ে কোনো জোরালো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। ঘেজেল হেসার কারাগারের বন্দিরা এই প্রতিবাদের মাধ্যমে নিজেদের জীবন চরম ঝুঁকিতে ফেলেছেন। তারা জানেন যেকোনো সময় তাদের ফাঁসি হতে পারে, তবুও আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণের আশায় তারা এই পথ বেছে নিয়েছেন।
আমিরি-মোগাদ্দাম আরও জানান, মাদকের দায়ে মৃত্যুদণ্ডের কোনো যৌক্তিক বা ধর্মীয় ভিত্তি নেই। এসব বন্দিদের বেশির ভাগই অত্যন্ত দরিদ্র এবং সামান্য টাকার বিনিময়ে কুরিয়ার হিসেবে কাজ করতেন। অনেককেই কেবল নির্যাতনের মাধ্যমে আদায় করা স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে সাজা দেওয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তা ও মাদক সংক্রান্ত মামলার বিচার করা বিপ্লবী আদালতগুলোর কোনো স্বাধীনতা নেই। এসব আদালত চরম অবিচারমূলক বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ডের মতো কঠোর সাজা দিয়ে থাকে। ইরানি অধিকারকর্মীদের আইনি সহায়তা কেন্দ্র ‘দাদবান’-এর আইনজীবী মঈন খাজায়েলি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে আসামিরা আইনজীবী বা আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগ পান না। জাতিগত সংখ্যালঘু এবং দরিদ্রদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ সাজানোর নজিরও রয়েছে, যা মানবাধিকার ও খোদ ইরানের আইনেরও পরিপন্থী।
সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের কাছে পাঠানো এক বার্তায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এক অনশনকারী বলেন, ‘আমরা কেবল জীবনের মৌলিক চাহিদা মেটাতে গিয়ে ভুল পথে পা বাড়িয়েছিলাম এবং নিজেদের কাজের জন্য গভীরভাবে অনুতপ্ত। জীবনের প্রথম ভুলের জন্য মানুষের প্রাণ কেড়ে নেওয়া হয়, এমন নজির বিশ্বের আর কোথায় আছে?’
এর আগে ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসেও এই কারাগারে প্রায় দেড় হাজার বন্দি টানা ছয় দিনের অনশন করেছিলেন। তখন কর্তৃপক্ষ কারাগার পরিদর্শন করলেও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি বলে অধিকারকর্মীরা জানিয়েছেন। এদিকে ঘেজেল হেসার কারাগারে থাকা বন্দিদের পরিবারের সদস্যরা জেলের বাইরে প্রতিবাদ সমাবেশ করার চেষ্টা করলে কর্তৃপক্ষ বলপ্রয়োগ করে তা দমন করেছে বলে স্থানীয় সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে।

