টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়ার ঘটনায় বর্তমানে কমবেশি সবাই আমরা চিন্তিত। কিন্তু অনেকে হয়তো জানি না, আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত বহু পরিচিত উপকরণেই মাইক্রোপ্লাস্টিক লুকিয়ে রয়েছে। প্রসাধনী, পোশাক, খাবারের প্যাকেজিং, প্লাস্টিকের বোতল, টি-ব্যাগসহ দৈনন্দিন ব্যবহারের বহু সামগ্রী থেকেই অতি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা বা মাইক্রোপ্লাস্টিক মানবদেহে প্রবেশ করছে।
মাইক্রোপ্লাস্টিক বলতে সাধারণত ৫ মিলিমিটারের কম আকারের প্লাস্টিক কণাকে বোঝায়। আকারে ক্ষুদ্র হওয়ায় এসব কণা সহজেই সিসা, ক্যাডমিয়ামের মতো ভারী ধাতু এবং বিভিন্ন ক্ষতিকর অণুজীব বহন করতে পারে। ফলে শরীরে প্রবেশের পর এসব উপাদান বিভিন্ন অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
যেসব পণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকতে পারে
গবেষণায় দেখা গেছে, ফেসওয়াশ ও স্ক্রাবের মাইক্রোবিডস, কিছু টুথপেস্ট, লিপস্টিক, আইলাইনার, নেইলপলিশ, ওয়েট ওয়াইপস, পলিয়েস্টার ও নাইলনের পোশাক, ডিটারজেন্ট, টি-ব্যাগ, নন-স্টিক পাত্রের আবরণ, একবার ব্যবহারযোগ্য কাপ, সিগারেটের ফিল্টার, প্লাস্টিকের বোতলে সংরক্ষিত পানি, লবণ এবং প্লাস্টিকের কাটিং বোর্ড থেকেও মাইক্রোপ্লাস্টিক ছড়িয়ে পড়তে পারে।
শরীরে কী ধরনের ক্ষতি হতে পারে?
খাবার, পানি, বাতাস ও প্রসাধনীর মাধ্যমে আমাদের শরীরে প্রবেশ করা মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে জমা হয়ে নানা ধরনের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। গবেষণায় মানুষের রক্ত, ফুসফুস, অন্ত্র, মস্তিষ্ক এমনকি নবজাতকের প্লাসেন্টাতেও এই ক্ষতিকর কণার উপস্থিতি মিলেছে।
সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকিগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- হৃদ্রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি: রক্তনালিতে প্লাস্টিক কণা জমে রক্ত জমাট বাঁধার প্রবণতা বাড়তে পারে, যা হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের ঝুঁকি বৃদ্ধি করতে পারে।
- পরিপাকতন্ত্রের সমস্যা: অন্ত্রে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ সৃষ্টি করে হজমে সমস্যা এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
- ফুসফুসের ক্ষতি: বাতাসের সঙ্গে প্রবেশ করা কণা দীর্ঘমেয়াদে কাশি, শ্বাসকষ্ট ও অ্যাজমার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
- হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া: প্লাস্টিকে ব্যবহৃত থ্যালেটস ও বিসফেনলজাতীয় রাসায়নিক হরমোনের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটিয়ে প্রজননস্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলতে পারে।
- স্নায়ুতন্ত্রে প্রভাব: অতি সূক্ষ্ম ন্যানোপ্লাস্টিক মস্তিষ্কে পৌঁছে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস সৃষ্টি করতে পারে, যা আলঝেইমার, ডিমেনশিয়া ও পারকিনসন্সের মতো রোগের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
- কোষ ও ডিএনএর ক্ষতি: দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শে কোষের ক্ষতি এবং ক্যানসারের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
কীভাবে কমানো যাবে ঝুঁকি?
মাইক্রোপ্লাস্টিক পুরোপুরি এড়িয়ে চলা কঠিন হলেও কিছু অভ্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমে এর সংস্পর্শ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
- প্লাস্টিকের বদলে কাচ, স্টেইনলেস স্টিল বা সিরামিকের পাত্র ব্যবহার করুন।
- প্লাস্টিকের কাটিং বোর্ডের পরিবর্তে কাঠের বোর্ড ব্যবহার করুন।
- প্লাস্টিকের পাত্রে খাবার গরম করা এড়িয়ে চলুন।
- টি-ব্যাগের পরিবর্তে খোলা চা-পাতা ব্যবহার করুন।
- প্লাস্টিকের বোতলের বদলে কাচের বোতলে পানি সংরক্ষণ করুন।
- মাইক্রোবিডসযুক্ত প্রসাধনীর পরিবর্তে প্রাকৃতিক উপাদানসমৃদ্ধ পণ্য বেছে নিন।
- ঘরের ধুলাবালি নিয়মিত ভেজা কাপড় দিয়ে পরিষ্কার করুন, কারণ ধুলার মধ্যেও মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সচেতনতা বৃদ্ধি, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো এবং নিরাপদ বিকল্প বেছে নেওয়ার মাধ্যমে মাইক্রোপ্লাস্টিকের সংস্পর্শ অনেকটাই কমানো সম্ভব। তবে মানবদেহে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও বিস্তৃত বৈজ্ঞানিক গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।

