রয়টার্স এক্সক্লুসিভ

মার্কিন সেনাদের মোবাইল ভিডিও দেখে হামলার লক্ষ্য নির্ধারণ করছে ইরান

আপডেট : ২৯ জুলাই ২০২৬, ২১:০৪

মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন মার্কিন সেনাদের মোবাইল ফোনে তোলা ভিডিও অনলাইনে ছড়িয়ে পড়লে তা ইরানকে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার নিশানা ঠিক করতে সাহায্য করছে বলে সতর্ক করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার। বিষয়টি জানা গেছে একাধিক অবগত সূত্রের মাধ্যমে। রয়টার্সের হাতে এসেছে কুপারের একটি চিঠির অনুলিপি, যেখানে তিনি এই আশঙ্কার কথা স্পষ্ট করেছেন।  

মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) লেখা ওই চিঠিতে কুপার বলেছেন, সংবাদমাধ্যম বা সাংবাদিকদের পোস্টে সেনাদের মোবাইল থেকে নেওয়া প্রতিক্রিয়া, ছবি ও ভিডিও দেখে ইরান প্রায় তৎক্ষণাৎ বুঝতে পারছে তাদের হামলা কতটা কার্যকর হয়েছে। তিনি লিখেছেন, ওপেন সোর্স তথ্য প্রকাশের কারণে মার্কিন সেনা এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর বেসামরিক মানুষের জীবন ঝুঁকিতে পড়তে পারে। চিঠিতে তিনি সেনাদের অপারেশনাল নিরাপত্তার বিষয়ে আরও সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন, তবে কী ধরনের নির্দিষ্ট ব্যবস্থা নেওয়া হবে তা উল্লেখ করেননি।  

দুটি সূত্র জানিয়েছে, জর্ডানে অবস্থানরত কিছু মার্কিন সেনাকে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে মোবাইল ফোন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হতে পারে। জর্ডান ইরানের হামলার অন্যতম লক্ষ্য। তৃতীয় একটি সূত্র বলছে, পুরো অঞ্চলে একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে, যদিও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি।  

সেন্টকমের মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিমোথি হকিন্স বলেন, বার্তাটি সেনাসদস্যদের অপারেশনাল নিরাপত্তা বজায় রাখার গুরুত্ব বোঝাতে দেওয়া হয়েছে। অ্যাডমিরাল কুপার সময় সময় এ ধরনের বার্তা দিয়ে থাকেন। 

চিঠিতে কুপার একটি নির্দিষ্ট ভিডিওর উদাহরণ দিয়েছেন। চলতি মাসে অনলাইনে প্রকাশিত ওই ভিডিওতে দেখা যায়, ১৭ জুলাই জর্ডানের মুওয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার সময় মার্কিন সেনারা বাংকারে আশ্রয় নিচ্ছেন। ভিডিওটি এক সেনাসদস্যের মেটা স্মার্ট গ্লাস দিয়ে ধারণ করা হয়েছিল এবং ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করা হয়। কুপারের মতে, এ ধরনের তথ্য না থাকলে ইরানের পক্ষে হামলার সাফল্য-ব্যর্থতা মূল্যায়ন করা অনেক কঠিন হতো। কারণ যুদ্ধক্ষেত্রে মার্কিন বাহিনী ইলেকট্রনিক জ্যামিংসহ নানা কৌশল ব্যবহার করে।  

কুপার আরও লেখেন, ইরান জানে তারা অস্ত্র ছুড়েছে। কিন্তু সেগুলো লক্ষ্যবস্তু থেকে ৫০ মিটার দূরে পড়েছে, নাকি খালি রানওয়েতে লেগেছে, নাকি জনাকীর্ণ স্থাপনায় আঘাত করেছে তা তারা জানে না। সংবাদমাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত তালিকা ও বিশ্লেষণ প্রকাশিত হলে তা ইরানের জন্য বিনা খরচে যুদ্ধের মূল্যায়ন করে দেওয়ার মতো হয়ে যায়। তিনি সতর্ক করেন, হামলার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ্যে এলে তা ইরানকে দ্রুত আরও ভয়াবহ দ্বিতীয় দফার হামলা চালানোর সুযোগ করে দিতে পারে।  

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একযোগে ইরানে অভিযান শুরু করার পর এ পর্যন্ত ১৮ জন মার্কিন সেনা নিহত এবং ৬০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। এত হতাহতের ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। বর্তমানে প্রতি তিনজন মার্কিন নাগরিকের মধ্যে মাত্র একজন এই যুদ্ধকে সমর্থন করছেন।  

ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা যুদ্ধ-সম্পর্কিত আরও তথ্য প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন। তারা রাডার টাওয়ার, ব্যারাক, বিমান হ্যাঙ্গারসহ বিভিন্ন ঘাঁটির ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত জানতে চেয়েছেন। এছাড়া যুদ্ধের প্রথম দিন ইরানের হরমোজগান প্রদেশের মিনাবের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মার্কিন হামলার তদন্ত প্রতিবেদনও প্রকাশের দাবি তুলেছেন তাঁরা। সিএনএনের এক তদন্তে বলা হয়েছে, ওই হামলায় ১২০ শিক্ষার্থী ও ২৬ শিক্ষকসহ মোট ১৫৬ জন নিহত হন।  

মোবাইল ফোন জব্দের সম্ভাবনার খবরে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন সেনাদের পরিবারের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বিদেশে মোতায়েন সেনাদের ফোন ব্যবহারের নিয়ম বাহিনীভেদে আলাদা হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে ফোন নির্দিষ্ট স্থানে তালাবদ্ধ করে রাখতে হয়, আবার সংবেদনশীল মিশনে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধও থাকতে পারে।  

মার্কিন কর্মকর্তারা বহুদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন যে ফিটনেস অ্যাপসহ কিছু মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন অবস্থান তথ্য প্রকাশ করে, যা প্রতিপক্ষের কাজে লাগতে পারে। গত মে মাসে রয়টার্স জানিয়েছিল, স্মার্টফোন থেকে সংগ্রহ করা বাণিজ্যিক অবস্থান তথ্য ব্যবহার করে মার্কিন সেনাদের লক্ষ্যবস্তু বানানো বা নজরদারি করা হয়েছে।  

পেন্টাগন অপারেশনাল নিরাপত্তার কথা বলে যুদ্ধ-সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ সতর্কতার সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করছে। ইরানের অনেক হামলার দাবির বিষয়ে তারা মন্তব্য করছে না এবং আহতদের বিস্তারিতও প্রকাশ করছে না।

ইত্তেফাক/এবিএস