‘ক্যাং’-এর মোড়ে যেতেই দূর থেকে ভেসে আসছিল ছোটো শিশুদের আওয়াজ। ভেতরে প্রবেশ করতেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়। সবুজ শান্ত পরিবেশে একদল শিশু সেখানে লেখাপড়া শিখছে। তারা সমবেত কণ্ঠে উচ্চারণ করে পড়ছিল। বান্দরবান শহরে ‘খ্যাংওয়া ক্যাং রাজ বিহার’-এর দরিদ্র শিশুদের অনাথ আশ্রম ও শিক্ষালয় এটি। নাম ‘বি হ্যাপি লার্নিং সেন্টার অনাথ আশ্রম ও শিক্ষালয়’। এটি স্বর্ণ মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা উপঞঞাজত মহাথেরোর একটি প্রতিষ্ঠান। ২০০২ সালের জুলাই মাসে এই অনাথ আশ্রমটি প্রতিষ্ঠিত হয়।
চট্টগ্রাম শহর থেকে ৯২ কিলোমিটার দক্ষিণ পূর্বে অবস্থিত পাহাড়ি শহর বান্দরবান। এটি চট্টগ্রাম বিভাগের ৪৪৭৯ বর্গ কিলোমিটারের ছোট্ট একটি জেলা। বান্দরবান মূলত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠি অধ্যুষিত শহর হলেও বর্তমানে সেখানে সব সম্প্রদায়ের মানুষেরই বসবাস। আশ্রমের ভেতরে শিশুরা মেঝেতে বসে পড়ছে। তাদের পরনে হাফ সার্ট ও হাফ প্যান্ট। সবগুলো শিশুরই মাথার চুল ছোটো।
শৈসাইনু, ম্যানতাং ম্রো, পারা সাং এন খুমী, রাজু তংচঞগ্যা, সারিবদ্ধভাবে বসে পড়ালেখা করছিল। এরা সবই বান্দরবান জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিশু, যাদের পরিবারের পক্ষে সন্তানদের লেখাপড়া করানোর সামর্থ্য নেই। তারাই মূলত এখানে সুযোগ পায়। তবে এক্ষেত্রেও অভিভাবকদের ভর্তি ফর্ম সংগ্রহ করতে হয়, তবে বিনামূল্যে। এরপর পরীক্ষার মাধ্যমে নির্বাচন করা হয় এ শিশুদের। এসব শিশুর মধ্য থেকে কেউ হবে ভিক্ষু, কেউ হবে শিক্ষক-ডাক্তার, কেউ যাবে অন্য কোনো পেশায়। এই শিশুদের লেখাপড়া, থাকা-খাওয়াসহ সব ব্যয় বহন করেন এই স্বর্ণমন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা। স্বর্ণমন্দিরের দর্শনার্থীদের টিকিটের টাকাই এই শিশুদের লেখাপড়ায় ব্যয় হয় বলে জানান বি হ্যাপি লার্নিং সেন্টারের শিক্ষক ক্ষ্যানু মারমা।
ক্ষ্যানু মারমা বলেন, আমি বান্দবান জেলার মেয়ে। এখানে কাজ করছি দেড় বছর ধরে। এখানে শিশুরা বৌদ্ধ ধর্ম, বাংলা ভাষা ও নিজেদের ভাষা শেখে। এখানে শিশুরা প্রথম শ্রেণি থেকে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া শেখে বিনা পয়সায়। এরপর নবম শ্রেণিতে এসব শিশুকে আমরা অন্যান্য স্কুলে পড়ার সুযোগ করে দিই। তখনো তারা এই আশ্রমের টাকায় লেখাপড়া শেখে। ক্ষ্যানু বলেন, আমাদের প্রতিটি ক্লাসে ৪০ জন করে শিশু আছে। এখানে শিশুরা নিজেদের ধর্ম শিক্ষা ও ব্যবহারিক শিক্ষা পাচ্ছে।
সকালে প্রার্থনার মধ্যদিয়ে তাদের দিন শুরু হয়। এরপর ৬টা থেকে ৭টার মধ্যে শিশুরা সকালের খাবার খায়। তারা এই আশ্রমে তিন বেলা খাবার পায় এবং সকাল ও সন্ধ্যায় প্রার্থনা করে। সপ্তাহে দুই দিন বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার তারা টিভি দেখার সুযোগ পায়। অধিকাংশ শিশু টিভিতে কার্টুন ছবি দেখে। এখানে সারাদিন নিয়মমাফিক চলতে কেমন লাগে, শিশুদের কাছে তা জানতে চাইলে তারা জোরে সমস্বরে বলে ওঠে— ‘ভালো লাগে’। এই শিশুরা নববর্ষের সময় ও বার্ষিক পরীক্ষার সময় বাড়ি যাওয়ার সুযোগ পায়।
