‘আমি শতভাগ ভারতীয় নাগরিক। জীবন-যৌবনের পুরোটা সময় ভারতেই কেটেছে। অথচ আজ আমাকে জোর করে বাংলাদেশি বানিয়ে সীমান্ত দিয়ে অন্য দেশে ঠেলে দেওয়া হলো!’—সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার সোনাবাড়িয়া এলাকায় এক স্বহৃদয় ব্যক্তির আশ্রয়ে বসে আকুল হয়ে কাঁদতে কাঁদতে কথাগুলো বলছিলেন ৪৫ বছর বয়সী ভারতীয় নারী সাহিদা ফকির।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে থাকা নিজের পরিবার, ঘরবাড়ি ও সন্তান ছেড়ে সীমান্ত পার হয়ে আসা সাহিদা এখন চরম অনিশ্চয়তা ও তীব্র আতঙ্ক নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন।
সাহিদা জানান, তিনি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার স্বরূপনগর থানার বিথারি হাকিমপুর গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা। তার বাবা আমিনউদ্দিন গাজী ও মা মাজিদা বিবি স্বরূপনগর বিধানসভা এলাকার নিবন্ধিত ভোটার ছিলেন। সাহিদার কাছে ভারতের ভোটার আইডি কার্ড, আধার কার্ড, আয়কর বিভাগের প্যান কার্ডসহ স্বরূপনগর থানাধীন গুনরাজপুর মৌজায় নিজের নামে থাকা জমির নথিপত্রও রয়েছে। প্রায় ২০ বছর আগে উন্নত জীবিকার আশায় স্বামী জুম্মান ফকিরের সাথে মুম্বাই পাড়ি জমান তিনি। সেখানে তিনি বাসা-বাড়িতে কাজ করতেন এবং স্বামী গাড়ি পরিষ্কার করতেন। তাঁদের ২৩ ও ১৩ বছর বয়সী দুই ছেলেও বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছে।
ভয়াবহ সেই দিনের বর্ণনা দিয়ে সাহিদা বলেন, গত ১৯ জুলাই সন্ধ্যায় মুম্বাইয়ে বাসার কাছে বাজারে নৈশভোজের খাবার কিনতে বের হলে সাদা পোশাকের কয়েকজন পুলিশ সদস্য তাঁকে হুট করে আটক করে। সে সময় তাঁর ছোট ছেলে একাই বাসায় ছিল। কোনো কারণ বা আদালতের নির্দেশপত্র না দেখিয়ে পুলিশ তাঁর সাথে থাকা মোবাইল ফোন, টাকা ও ভারতীয় পরিচয়পত্রগুলো কেড়ে নেয় এবং অবৈধ বিদেশি রাখার বন্দিশালায় আটকে রাখে। টানা পাঁচ দিন পর তাঁকে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) কাছে হস্তান্তর করা হয়। বিএসএফ সদস্যরা তাঁকেসহ আরও প্রায় ২০ জনকে সীমান্ত এলাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘুরিয়ে আসাম সীমান্ত অঞ্চল দিয়ে জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে (পুশ-ইন) দেয়।
পরবর্তীতে বিএসএফের তাড়া খেয়ে সাহিদা ফেনী পৌঁছান এবং সেখান থেকে বিভিন্ন পথ ঘুরে যশোরের বেনাপোল সীমান্তে আসেন। সেখানে ফুটপাতে কান্না করা অবস্থায় আবুল বাসার নামের এক বাংলাদেশি নাগরিকের সাথে তাঁর দেখা হয়। সাহিদার করুণ কাহিনী শুনে মানবিক কারণে আবুল বাসার তাঁকে সাতক্ষীরার কলারোয়ায় নিজ বাড়িতে আশ্রয় দেন। বর্তমানে সাহিদা আকুল আবেদন জানাচ্ছেন, যাতে ভারত সরকার সত্যতা যাচাই করে তাঁকে দ্রুত তাঁর নিজ দেশে ও সন্তানদের কাছে ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করে।
এদিকে ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর পশ্চিমবঙ্গভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন ‘বাংলার মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ’ (মাসুম) বিষয়টি নিয়ে ভারত কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের কাছে লিখিত প্রতিবাদ জানিয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশের আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সহায়তা চাওয়া হয়েছে। আসকের সিনিয়র সমন্বয়কারী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে তীব্র প্রতিবাদ জানান। তিনি বলেন, “শুধু বাংলা ভাষায় কথা বলার কারণে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ নিজ দেশের নাগরিককে ‘বাংলাদেশি’ বানিয়ে সীমান্তে ঠেলে দেবে—এটি চরম ভাষাগত বৈষম্য ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সরাসরি লঙ্ঘন। একটি গণতান্ত্রিক দেশের কর্তৃপক্ষের কাছে এমন নিষ্ঠুর আচরণ মোটেও কাম্য নয়।”
কলারোয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এইচ এম শাহীন জানান, বিষয়টি জানার পরপরই ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। ভারত থেকে পুশ-ইনের শিকার ওই ভারতীয় নারী বর্তমানে কলারোয়ায় স্থানীয় এক বাসিন্দার নিরাপদ আশ্রয়ে আছেন এবং পুলিশ বিষয়টি সার্বিক তদন্ত করে দেখছে।

