জীবিকার তাগিদে রাশিয়ায় কাজে গিয়ে ইউক্রেনীয় বাহিনীর কাছে প্রায় ৮ মাস ধরে বন্দি রয়েছেন গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ছাপরহাটী ইউনিয়নের রিমেল মিয়া (২২)। রিমেলকে দ্রুত ফিরিয়ে আনতে সরকারসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে আকুল আবেদন জানিয়েছেন তার পরিবারসহ প্রতিবেশী ও স্বজনরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নির্মাণশ্রমিকের চাকরি নিয়ে গত বছর রাশিয়ায় যান রিমেল মিয়া। পরে কাজ হারিয়ে আইনি জটিলতায় পড়লে তিনি রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য হন। পরে অল্প কয়েক দিনের প্রশিক্ষণ দিয়ে তাকে ইউক্রেনে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। সেখানে ইউক্রেনের বাহিনীর হাতে আটক হয়ে যুদ্ধবন্দী হিসেবে তিনি এখন একটি বন্দিশিবিরে আছেন। শুক্রবার (৩১ জুলাই) তাকেসহ তিন বাংলাদেশির সাক্ষাৎকার নিয়ে একটি গণমাধ্যম একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করলে বিষয়টি জানাজানি হয়। পরে স্বজনেরাও বিষয়টি জানতে পারেন।
রিমেলের পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রিমেল স্থানীয় শোভাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০২২ সালে এসএসসি পাস করেন। এরপর ২০২৪ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে দুটি বিষয়ে পরীক্ষা দিলেও বিদেশ যাওয়ার কারণে পরীক্ষা শেষ করতে পারেননি। পরে রাশিয়া যান তিনি।
সূত্র জানায়, সংসারের সচ্ছলতা ফেরাতে ২০২৫ সালের ২৬ মার্চ রাশিয়ায় নির্মাণকাজে যান রিমেল মিয়া। সেখানে প্রথম কয়েক মাস ভালোই ছিলেন। শুরুর ৩ মাসে বাড়িতে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকাও পাঠিয়েছিলেন বলে জানায় পরিবার। কিন্তু পরে রাশিয়ার ওই কাজ ছেড়ে দেন তিনি, এরপরই ঘটে অঘটন।
স্বজনেরা জানিয়েছেন, ২০২২ সালে সুন্দরগঞ্জের শোভাগঞ্জ উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করার টাকার অভাবে আর পড়ালেখা হয়নি রিমেলের। এরপর তিনি রাশিয়ায় যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। ২০২৫ সালের মার্চে গাইবান্ধা শহরের এক দালালের মাধ্যমে তিনি রাশিয়ায় যান। বাবার পৈতৃক সূত্রে পাওয়া জমি বিক্রি করে এবং চড়া সুদে সাত লাখ টাকা ঋণ নিয়ে তিনি রাশিয়ায় যান। রাশিয়ায় যাওয়ার পর প্রথম তিন মাসে দেশে বাবা-মায়ের কাছে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা পাঠান রিমেল। এরপর তাঁর সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।
রিমেলের বাবা সৈয়দ আলী জানান, ১০ থেকে ১১ মাস ধরে ছেলের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ নেই। মুঠোফোনেও কথা হয় না। কোথায় আছে, কীভাবে আছে, তারা জানেন না। অনেক মানুষকে বলেছেন; কিন্তু কেউ ছেলের সন্ধান দিতে পারেননি। শুক্রবার এলাকার একজন মোবাইলে ছেলেকে দেখিয়ে জানান, সে ইউক্রেনের বন্দিশিবিরে আটক। কিন্তু রাশিয়া থেকে কীভাবে ইউক্রেনে গিয়ে বন্দী হলো, তারা জানেন না। এখন ছেলের আটক হওয়ার খবর জানাজানির পর অনেকে বাড়িতে খোঁজ নিতে আসছেন।
জানা যায়, সৈয়দ আলী বাড়ির অদূরে শোভাগঞ্জ বাজারে খিলি পান বিক্রি করেন। তার চার ছেলে। বড় ছেলে ও তার স্ত্রী ঢাকার একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করেন। তাদের দুই ছেলে দাদা-দাদির কাছে উত্তর মরুয়াদহ গ্রামে থাকে। রিমেলের আরেক ভাই রুবেল মিয়া (২০) দুই বছর আগে সৌদি আরবে যান। বর্তমানে সেখানে একটি কোম্পানিতে চাকরি করেন। সবার ছোট সোহেল মিয়া স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে।
এখন সৌদিপ্রবাসী ছেলের পাঠানো টাকা দিয়ে ধারদেনা শোধ করছেন সৈয়দ আলী। তিনি বলেন, ছোট ছেলের পাঠানো টাকা ঋণ শোধ করতে করতে শেষ হয়ে যাচ্ছে। পানের দোকান দিয়ে মাসে পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকার বেশি আয় হয় না। এতে কোনোমতে সংসার চলছে। এর মধ্যে ইউক্রেনে ছেলের বন্দী হওয়ার খবর শুনে দুশ্চিন্তায় ঘুম আসছে না।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে রেখা বেগম বলেন, ‘সুকের আশায় ব্যাটাক বিদোশোত পাটিচিনো। হামার ঘরে কষ্ট থাকপ্যার নোয়ায়। সুক তো হলোই না, একন কষ্ট আরও বাড়ি গ্যালো। ব্যাটা ক্যামন আচে, জানি না। হামরা ট্যাকা চাইনে, সোরকার জানি হামার বুকের ধন বুকোত ফিরি দ্যায়।’
জানা যায়, শুক্রবার বিকেল নাগাদ স্থানীয় যুবকদের ফেসবুকের মাধ্যমে ভিডিওতে রিমেল ইউক্রেনে যুদ্ধবন্দি হিসেবে আটকে থাকার বিষয়টি জানতে পারেন বলে জানান বাবা সৈয়দ আলী।
সেখানে ইউক্রেনের একটি ডিটেনশন সেন্টার থেকে জুমের মাধ্যমে একটি গণমাধ্যমকে সাক্ষাৎকার দিচ্ছিলেন রিমেল। ইউক্রেনের ‘কো-অর্ডিনেশন হেডকোয়ার্টার্স ফর দ্য ট্রিটমেন্ট অব প্রিজনারস অব ওয়ার’- এর সহায়তায় ভিডিও কনফারেন্স অ্যাপ জুমে সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিল বাংলাদেশি একটি গণমাধ্যম। সেখানে বন্দি থাকা তিনজন বাংলাদেশির সাক্ষাৎকার নেয় সংবাদমাধ্যমটি।
ডিটেনশন সেন্টার থেকে জুমের মাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রিমেল বলেন,‘আমি কোথায় আছি, আমি বেঁচে আছি নাকি মরে গেছি, আমার পরিবার জানে না। এই সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে অন্তত তারা জানতে পারবে যে, আমি এখনো বেঁচে আছি।’
রিমেল জানান, প্রথমে তিনি রাশিয়ায় একটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে মাসে ৭০০ ডলার বেতনে কাজ শুরু করেন। পরে উচ্চ বেতন ও রাশিয়ার নাগরিকত্বের প্রতিশ্রুতিতে রুশ সেনাবাহিনীর সঙ্গে চুক্তিতে সই করেন তিনি। কিন্তু প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে মাত্র তিন দিনের প্রশিক্ষণের পর তাকে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠিয়ে দেয় রুশ বাহিনী। সেখানে প্রায় এক মাস একটি বাংকারে দায়িত্ব পালনের পর ২০২৫ সালের ৮ ডিসেম্বর ইউক্রেনীয় বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেন তিনি।
এদিকে চুক্তিপত্রটি রুশ ভাষায় হওয়ায় তিনি সেটির কিছুই বুঝতে পারেননি। ফলে বিপদের মুখে পড়েছেন বলে দাবি করেন রিমেল।
রিমেলের চাচাতো বোন সাবিনা বেগম বলেন, সৈয়দ চাচা তার দুই ছেলেকে অনেক টাকা ঋণ করে বিদেশ পাঠিয়েছেন। কিন্তু তাদের কপাল খারাপ। বিদেশ গিয়ে বন্দি হয়ে আছে রিমেল ভাই। আমরা তাকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানাই।
রিমেলের প্রতিবেশী আলমগীর হোসেন বলেন, পরিবারের উন্নতির জন্য রাশিয়া গিয়ে প্রায় এক বছর কোনো খোঁজ ছিল না। পরিবারের, গ্রামের সবারই একটা দুশ্চিন্তা ছিল। অনেকেই ভেবেছিল হয়তো বেঁচে নেই। কিন্তু এখন খবর পেয়ে সবাই স্বস্তিতে আছে। এখন সরকারের কাছে আমাদের একটাই দাবি, তাকে দ্রুত সময়ে দেশে আনার ব্যবস্থা যেন করা হয়।
এ বিষয়ে সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ঈফফাত জাহান তুলি জানান, বিষয়টি গতকালই জেনেছেন তিনি। তিনি তার ঊর্ধ্বতন সংশ্লিষ্টদের বিষয়টি অবগত করবেন এবং ওই যুবককে দেশে ফেরত আনার যেসব প্রক্রিয়া রয়েছে, সেখানে তাদের যা করণীয় আছে তা করা হবে বলে জানান।

