এক দফা ঘিরে সমন্বয়কদের মধ্যে কী কী ঘটেছিল, ‘নেপথ্যের ইতিহাস’ বললেন আবদুল কাদের

আপডেট : ০৩ আগস্ট ২০২৬, ২৩:৪২

২০২৪ সালের ৩ আগস্ট জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চূড়ান্ত মুহূর্তে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শিক্ষার্থী-শিক্ষক, পেশাজীবী ও সাধারণ মানুষের ঢলের মধ্যে তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকারের পতন ও ফ্যাসিবাদের বিলোপের এক দফা দাবি ঘোষিত হয়েছিল। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এক নম্বর সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম (বর্তমানে জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ) সেদিন এই ঘোষণা দিয়েছিলেন। এর মাত্র দুই দিনের মাথায় ক্ষমতা ত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান শেখ হাসিনা। সেই ঐতিহাসিক এক দফার সিদ্ধান্ত কীভাবে এসেছিল, কার কৃতিত্ব বেশি—তা নিয়ে অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে নানা বয়ান ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

এবার এক দফায় উপনীত হওয়ার আদ্যোপান্ত নিজের ভাষ্যে তুলে ধরেছেন আন্দোলনের ৯ দফা ঘোষণা করে আলোচনায় আসা সাবেক সমন্বয়ক আবদুল কাদের। সোমবার (৩ আগস্ট) বিকেলে 'ঐতিহাসিক এক দফার নেপথ্যের ইতিহাস, কিছু বিষয় আপনাদের কাছে ক্লিয়ার করা জরুরি' শিরোনামে দেওয়া এক দীর্ঘ ফেসবুক পোস্টে তিনি এক দফার সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর প্রক্রিয়া, তৎকালীন সমন্বয়কদের মধ্যকার মতবিরোধ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী ও সাংবাদিকদের ভূমিকা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন।

১ ও ২ আগস্টের পটভূমি

কাদের তার পোস্টে লিখেছেন, ১ আগস্ট (বৃহস্পতিবার) ডিবি হেফাজত থেকে মুক্ত হন তৎকালীন ৬ সমন্বয়ক। তবে তাদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কোনো আলোচনা হয়নি, দু-একজনের সঙ্গে ব্যক্তিগত পর্যায়ে কথা হয়। মাহিন সরকার, আবদুল হান্নান মাসউদ, রিফাত রশিদ এবং কাদের—এই চারজন মিলে নিজেদের মতো করে পরদিন ২ আগস্টের কর্মসূচি ঘোষণা করে দেন। কিন্তু এই কর্মসূচি নিয়ে ডিবি থেকে ফেরা সমন্বয়কদের একাংশের সঙ্গে, বিশেষ করে কাদেরের সঙ্গে তীব্র বাগ্‌বিতণ্ডা হয়। সন্ধ্যায় পরিস্থিতি গুরুতর হলে পরদিন জুমার নামাজের পর অনলাইনে বৈঠকের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২ আগস্ট (শুক্রবার) জুমার পর তৎকালীন গণতান্ত্রিক ছাত্রশক্তির নেতাদের অনলাইন বৈঠক বসে। এই বৈঠকে হাসনাত আব্দুল্লাহ ও সারজিস আলম (দুজনই বর্তমানে এনসিপি নেতা) উপস্থিত ছিলেন না। কাদের জানিয়েছেন, বৈঠকে তিনটি বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। প্রথমত, এক-দুজনের বিচ্ছিন্ন মতামত বাদে সবাই আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে মত দেন। দ্বিতীয়ত, কাদের, মাসউদ, রিফাত ও মাহিন পরবর্তী তিন-চার দিন আগের মতোই আন্দোলন পরিচালনা করবেন, সিনিয়ররা আপাতত পেছনে থেকে পরে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হবেন। তৃতীয়ত, পরদিন ৩ আগস্ট অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণার সিদ্ধান্ত হয়।

কাদের আরও লিখেছেন, এই বৈঠকে তিনি ও রিফাত রশিদ এক দফার প্রসঙ্গ তোলেন এবং সিনিয়রদের মতামত জানতে চান। মাঠের পরিস্থিতি—পেশাজীবী, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, আইনজীবী ও শিল্পীদের সরাসরি যুক্ত হওয়া, অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খানের সরকারের পদত্যাগ দাবি এবং চলমান দ্রোহযাত্রার বিষয়গুলো তুলে ধরেন তিনি। তবে আলোচনা থেকে আরও সাত-দশ দিন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পর এক দফায় যাওয়ার মতামত আসে।

২ আগস্ট সন্ধ্যা: ছাত্রদল-শিবিরের সঙ্গে আলোচনা ও সাংবাদিকদের পরামর্শ

এক দফার প্রসঙ্গ বৈঠকে ওঠার পর কাদের তার নিয়মিত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন এবং ছাত্রশিবিরের সাবেক নেতা ও ডাকসু ভিপি মো. আবু সাদিক কায়েমের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। নাছির উদ্দীন তাকে বলেছিলেন, 'তাহলে এই ব্যাপারটা আমি চেয়ারম্যান স্যারের (তৎকালীন বিএনপি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান) সঙ্গে আলাপ করে নিই।' অন্যদিকে সাদিক কায়েম জানান, তিনি 'মুরুব্বিদের' সঙ্গে আলোচনা করে জানাবেন।

এদিকে ওই সন্ধ্যায় কাদেরের বাসায় একজন নারী সাংবাদিক ও ওয়াহিদ আলম (তখন বিএনপির সঙ্গে যুক্ত, বর্তমানে এনসিপি নেতা) আসেন। কাদের তাদের সঙ্গে এক দফার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন এবং জানান যে তিনি এক দফার বিষয়ে প্রস্তুত, ছাত্রদল-শিবিরের সঙ্গেও কথা হয়েছে এবং তারাও ইতিবাচক। তবে একা সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না—বাকি তিন সমন্বয়ক রিফাত, মাহিন ও মাসউদের সম্মতিও লাগবে।

কাদের জানান, ওই সময় তার বাসায় আলোচনায় ছিলেন তায়সীর কাদের চৌধুরী (যিনি ছাত্রাবস্থায় ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং ঢাকায় একটি দূতাবাসে কর্মরত)। পরে অনলাইনে যুক্ত হন সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের এবং ফোনে আলোচনা হয় মানবাধিকারকর্মী রেজাউর রহমান লেনিনের সঙ্গে।

রিফাত-মাসউদদের সম্মতি ও পরে সরে আসা

কাদের জানান, তিনি রিফাত রশিদ, মাহিন সরকার ও আবদুল হান্নান মাসউদের (তিনজনই বর্তমানে এনসিপি ও সহযোগী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত) সঙ্গে যোগাযোগ করে এক দফার বিষয়ে অবহিত করেন। প্রথমে তারা বলেন, সিনিয়ররা (নাহিদ-আসিফ মাহমুদসহ ৬ সমন্বয়ক) ডিবি থেকে মুক্ত হয়েছেন, এক দফার সিদ্ধান্ত তারাই নেবেন। তবে একপর্যায়ে সপরিবার দূতাবাসে নিরাপত্তা পাওয়া সাপেক্ষে এক দফা দিতে রাজি হন।

কাদের লিখেছেন, তিনি দুপুরের বৈঠকে নেওয়া সাত-দশ দিন অপেক্ষার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে বলেন, এত দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করলে আরও বেশি প্রাণহানি ঘটবে, মানুষের জীবন নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো যায় না। তিনি আরও জানান, এক জায়গা থেকে খবর পেয়েছিলেন যে পরদিন ৩ আগস্ট শেখ হাসিনা ছলচাতুরী করে ৯ দফা মেনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, যা তাকে এক দফার প্রতি আরও তাড়না জুগিয়েছিল।

একপর্যায়ে রিফাতসহ তিনজন এক দফা দেওয়ার বিষয়ে সম্মত হন। তাদের সম্মতি পেয়ে কাদের ও তার পাশে থাকা ব্যক্তিরা এক দফার ঘোষণাপত্র খসড়া করে ফেলেন। নারী সাংবাদিকের এক সহকর্মী খসড়াটি তৈরি করেন এবং ওয়াহিদ আলম সেখানে সংযোজন-বিয়োজন করেন। কাদের রিফাতদের কাছে সেটি পাঠান। রিফাতরা কয়েকটি বিষয়ে আপত্তি জানালে সংশোধনের কাজ চলতে থাকে। এর মধ্যেই কাদের নিজে একটি ভিডিও বার্তাও তৈরি করে ফেলেন।

কিন্তু হঠাৎ করেই রিফাত রশিদরা ফোন ধরা বন্ধ করে দেন। পরে একপর্যায়ে ফোন ধরে জানান, 'নাহিদ ভাইদের সঙ্গে কথা হয়েছে, তারা এ বিষয়ে সম্মতি দেননি।' তাদের হঠাৎ সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে কাদের হতভম্ব হয়ে যান।

নাহিদের 'প্রতিশ্রুতি' ও কাদেরের পিছু হটা

কাদের জানান, পরে রিফাতসহ তিন সমন্বয়ক তাকে জানান যে, ওই মুহূর্তে তারা এক দফা দিতে চান না। কারণ নাহিদ ইসলাম আশ্বাস দিয়েছেন, তিনি পরদিন মাঠ থেকেই এক দফা ঘোষণা করবেন। কাদের রিফাতের কাছে নিশ্চিত হতে চাইলে রিফাত জানান, 'নাহিদ ভাইরা আগামীকাল এক দফা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আর যদি না দেন, তাহলে আমরা চারজন মিলেই দেব, সিনিয়রদের জন্য আর অপেক্ষা করব না।'

এই প্রতিশ্রুতির পরিপ্রেক্ষিতে কাদের সেদিন আর এক দফার ঘোষণা দেননি এবং প্রস্তুত করা ভিডিও বার্তাও প্রকাশ করেননি। তিনি লিখেছেন, 'এক দফা আমি বা আমরা রিফাতরাই দিতে হবে, বিষয়টা তেমন নয়। আমাদের এক দফায় আসতে হবে—সেটাই আমার মূল উদ্বেগ ছিল। চারদিকে এত হত্যাযজ্ঞ আর পরদিন হাসিনার ৯ দফা মেনে নেওয়ার নামে নতুন দুরভিসন্ধির ব্যাপারেই আমি মূলত উদ্বিগ্ন ছিলাম।'

এদিকে রাত ১০টার দিকে ছাত্রদলের নেতা নাছির উদ্দীন কাদেরকে ফোন করে জানিয়েছিলেন, 'এক দফা দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, সেটা চেয়ারম্যান স্যারও জানিয়েছেন। তোমরা সিদ্ধান্ত নিতে পারো।' ছাত্রশিবিরের সাদিক কায়েমও কাদেরকে বলেন, 'এটা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, তুমি হাজতের নামাজ পড়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে নাও, আমাকে জানাও, এক দফার বিষয়ে আমরা প্রস্তুত।'

'কোয়ার্টার' বিতর্কে কাদেরের জবাব

২০২৫ সালে নাহিদ ইসলাম বলেছিলেন, এক দফা ঘোষণার আগের রাতে একটি 'মহল' কয়েকজন সমন্বয়ককে চাপ দিয়েছিল এবং সেটি ছিল 'ফ্যাসিবাদকে টিকিয়ে রাখার ফাঁদ'। পরে মাহফুজ আলমও (সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা) ফেসবুকে লিখেছিলেন, ২ আগস্ট রাতে অনলাইনে এক দফা ঘোষণার চাপ 'একটি নির্দিষ্ট কোয়ার্টার' থেকে এসেছিল।

এই 'মহল' ও 'কোয়ার্টার' প্রসঙ্গে কাদের সরাসরি জবাব দিয়ে লিখেছেন, ওই দিনের ঘোষণায় ছাত্রদের সমন্বয়ে নির্দলীয় নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল। ছাত্রদল ও শিবিরের নেতারা তাদের মূল দলের সঙ্গে আলোচনা করে এক দফার বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানিয়েছিল, যেটি নিত্যপ্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা। তিনি প্রশ্ন রেখেছেন, 'সবাই অবগত, সবাই রাজি এবং প্রস্তুতি নিচ্ছিল—তাহলে এটা কীভাবে কোয়ার্টার থেকে আসে বা ফ্যাসিবাদের অংশ, তা আমার বোধগম্য নয়।'

ইত্তেফাক/এনএন