বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলিয়াছেন, ‘প্রতিটি শিশু এই বার্তা লইয়া পৃথিবীতে আসে যে, সৃষ্টিকর্তা এখনো মানুষের উপর নিরাশ হন নাই।' কবিগুরুর এই উক্তির অন্তর্নিহিত অর্থ অত্যন্ত গভীর। একজন নবজাতক কেবল তাহার পরিবারের সদস্য নহে; বরং সে মানবসভ্যতার ভবিষ্যৎ, সৃষ্টিকর্তার অশেষ করুণার প্রতীক এবং পৃথিবীকে আরো সুন্দর করিবার এক নূতন সম্ভাবনা।
অথচ দুঃখজনকভাবে সেই নিষ্পাপ শিশুই যখন জন্মের পরপরই রাস্তায়, ডাস্টবিনে কিংবা নির্জন স্থানে পরিত্যক্ত হয়, তখন তাহা আর কেবলই পারিবারিক ট্র্যাজেডির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং উহা হইয়া উঠে সমগ্র সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের এক নির্মম সাক্ষ্য । গতকাল দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত এক সংবাদে দেখা গিয়াছে, চলতি বৎসরের প্রথম ছয় মাসেই দেশের বিভিন্ন স্থান হইতে জীবিত ও মৃত অবস্থায় ৪৪ জন নবজাতক উদ্ধার করা হইয়াছে। সংখ্যাটি হয়তো পরিসংখ্যানের ভাষায় খুব বড় বলিয়া মনে হইবে না; কিন্তু প্রতিটি সংখ্যা একেকটি জীবন ও পরিবারের ব্যর্থতা এবং সমাজজীবনের নৈতিক সংকটের প্রতিচ্ছবি। সাম্প্রতিক বৎসরগুলিতে কন্যাশিশু, প্রতিবন্ধী শিশু অথবা অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের ফলে জন্মগ্রহণকারী শিশুরা এইভাবে পরিত্যক্ত হইতেছে। এই উদ্বেগজনক প্রবণতাকে কি ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা' হিসাবে দেখার আদৌ সুযোগ আছে?
প্রশ্ন হইল, ঠিক কী এমন হইল যে, এইভাবে একের পর এক অমানবিক কর্মকাণ্ড ঘটিয়া চলিয়াছে? ইহার কারণ একটি বা দুইটি নহে। কন্যাসন্তানকে বোঝা মনে করা, চরম দারিদ্র্য, পারিবারিক সহিংসতা, সামাজিক লজ্জা, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক, ধর্ষণের শিকার মানসিক প্রতিবন্ধী নারীর মাতৃত্ব এবং পারিবারিক দায়িত্বহীনতা—মোটা দাগে এই কারণগুলিই শিশুর জন্মকে আশীর্বাদের পরিবর্তে অনেকের নিকট বোঝায় পরিণত করিতেছে। অথচ কোনো শিশুই তাহার জন্মের জন্য দায়ী নহে। পৃথিবীতে আসিবার সিদ্ধান্ত তাহার নহে; কিন্তু পৃথিবীতে আসিয়াই সে সবচাইতে নির্মম শাস্তির শিকার হইতেছে। আধুনিকতার বাহ্যিক অগ্রগতির সহিত যদি নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ ও পারিবারিক মূল্যবোধের বিকাশ না ঘটে, তাহা হইলে এই ধরনের মানবিক বিপর্যয় আড়াল করিবার সাধ্য কাহারো নাই, যাহা আমরা এই বাস্তবতার মধ্য দিয়া অনুধাবন করিতেছি ।
পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তাআলা বলিয়াছেন, ‘দারিদ্র্যের ভয়ে তোমরা তোমাদের সন্তানদের হত্যা করিয়ো না। আমিই তাহাদের এবং তোমাদের রিজিক দান করি।' (সুরা আল- ইসরা, আয়াত ৩১)। এই নির্দেশ কেবল সন্তান হত্যা নিষিদ্ধই করে না; অধিকন্তু সন্তানকে বোঝা মনে করিবার মানসিকতার পিঠেও চপেটাঘাত করে। একই ভাবে, মহানবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলিয়াছেন, ‘যে ব্যক্তি আমাদের ছোটদের প্রতি দয়া করে না, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নহে ।' অর্থাৎ, শিশুদের প্রতি দয়া, সুরক্ষা ও ভালোবাসা কি মানবসমাজের জন্য ধর্মীয়, নৈতিক ও মানবিক অপরিহার্য দায়িত্ব নহে? শিশুদের সহিত যেই বর্বরতা চালানো হইতেছে, তাহা কি সমগ্র সমাজের জন্য লজ্জা ও আত্মসমালোচনার বিষয় নহে?
দুঃখজনক হইল, শিশু পরিত্যাগ একটি গুরুতর অপরাধ হইলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপরাধীরা শনাক্ত হয় না। এই জন্য প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, সিসিটিভির কার্যকর ব্যবহার, দ্রুত তদন্ত এবং বিদ্যমান আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি হইয়া পড়য়াছে । ইহার পাশাপাশি সংকটাপন্ন মায়েদের জন্য সামাজিক সহায়তা, মানসিক পরামর্শ, নিরাপদ আশ্রয় এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষাব্যবস্থা গড়িয়া তুলিতে হইবে । অবৈধ গর্ভপাতের নামে পরিচালিত অনিয়মের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ অপরিহার্য। আর যেই সকল শিশুর পরিবারকে খুঁজিয়া পাওয়া সম্ভব নহে, তাহাদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়, পুষ্টি, শিক্ষা এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনের নিশ্চয়তা প্রদান করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সর্বোপরি, এই সংকট মোকাবিলায় কেবল আবেগ যথেষ্ট নহে, কার্যকর উদ্যোগও আবশ্যক ।
আমরা প্রায়ই উন্নয়নের নানান সূচক লইয়া গর্ব করি; কিন্তু যেই সমাজে নবজাতকের প্রথম কান্না নিরাপদ আশ্রয়ের পরিবর্তে পরিত্যক্ত রাস্তায় প্রতিধ্বনিত হয়, সেই সমাজের উন্নয়ন পূর্ণতা লাভ করে কি না, সেই প্রশ্নের অবকাশ থাকিয়াই যায়। মনে রাখিতে হইবে, শিশুর প্রতি মমতা কোনো দয়া নহে—ইহা সভ্যতার প্রথম শর্ত । যেই সমাজ নবজাতকের কান্না শুনিয়াও নীরব থাকে, সেই সমাজ ধীরে ধীরে নিজের মানবিক ভিত্তিই হারাইতে থাকে। অতএব, শিশুদের প্রতি নির্মমতা প্রদর্শনের মধ্য দিয়া আমরা যে সৃষ্টিকর্তাকে নিরাশ করিয়া তাহার বিরাগভাজন হইতেছি, তাহা আর দুই বার বলিবার প্রয়োজন নাই ।

