আল-মাহমুদ
দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার ভূমিবেষ্টিত পার্বত্য দেশ আফগানিস্তান। প্রকৃতির লীলাময় নৈসর্গিক সৌন্দর্যের আধার এই দেশ নিষ্ঠুর মানবতার এক চরম সাক্ষী। ভূ-প্রকৃতির রূপে আকৃষ্ট হয়ে যুগে যুগে উচ্চাভিলাষী ও স্বপ্নচারী মানব আফগানদের ওপর পৈশাচিক আচরণ করে এসেছে এবং আজ অবধি করে যাচ্ছে। প্রাচীন আমলে সৌন্দর্য ও সম্পদে সমৃদ্ধ থাকায় লোভাতুর জাতি কর্তৃক বারবার আক্রমণের শিকার হতে হয়েছে আফগানদের। যুদ্ধ আর বোমা হামলায় বিধ্বস্ত বর্তমান আফগানিস্তানের অবস্থা শোচনীয়। পাহাড়, বনানি আর রুক্ষতার মিশেলে একসময়কার অনিন্দ্য সুন্দর এই দেশটি দীর্ঘ ৪০ বছরের যুদ্ধ-বিগ্রহে আজ ধ্বংসপ্রায়। সৌন্দর্য ছাড়াও বারবার আক্রান্ত হওয়ার পেছনে আফগানিস্তানের ভূ-রাজনীতি বিশেষভাবে দায়ী।
আফগানিস্তানকে আলেকজান্ডার দি গ্রেট শাসন করেছেন, শাসন করেছেন গজনীর সর্বশ্রেষ্ঠ রাজা সুলতান মাহমুদ। তিনি শাসন করেছেন দীর্ঘ ৯৯৮ থেকে ১০৩০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত এবং তার সময়েই সমগ্র আফগানিস্তানে ইসলাম সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। ১২২০ সালে মোঙ্গল সেনাপতি চেঙ্গিস খানও আক্রমণ করে দখলে নিয়ে আফগানিস্তানের ব্যাপক ক্ষতি করে। এরপর তৈমুর লং আক্রমণ করে করায়ত্ত করতে সক্ষম হন। মোটকথা, বিশ্বের সব নামকরা বীরযোদ্ধাদের লোভাতুর-নজর সর্বদা লেগেই ছিল আফগানিস্তানের ওপর। এরপর ইংল্যান্ড, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং সবশেষ যুক্তরাষ্ট্রও আফগানিস্তানে আক্রমণ চালিয়ে নিজেদের নির্লজ্জতার পরিচয় দিয়েছে।
তবে রহস্যের বিষয় হলো, যেসব দেশ আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে আঘাত হেনেছে, আজ অবধি কোনো দেশই সফলতার মুখ দেখেনি। এখানে আক্রমণকারীদের যুগে যুগে চরম শিক্ষা পেতে হয়েছে। সাবেক সোভিয়েত নেতা মিখাইল গর্বাচেভ আফগানিস্তানকে ‘রক্তাক্ত ক্ষত’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন এজন্যই।
সোভিয়েত-পরবর্তী বিশ্বের একমাত্র পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র তার ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ শুরু করতে ২০০১ সালে আফগানিস্তানে তালেবান শাসকদের ওপর হামলা চালায়। এসময় প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ বলেছিলেন, বিশ্বের প্রতিটি সন্ত্রাসী গ্রুপকে বের করে তাদের থামানো ও পরাজিত না করা পর্যন্ত ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ বন্ধ হবে না। মার্কিন সেনারা সহজেই তালেবানকে পরাজিত করে। তবে নানা উত্থান-পতনের মধ্যদিয়ে চলতে থাকা নিষ্ঠুর ১৭ বছরের সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ সমাপ্তির লক্ষ্যে মার্কিন ও আফগান তালেবানদের আলোচনায় আশাব্যঞ্জক অগ্রগতি হয়। স্বয়ং মার্কিন শান্তি প্রতিনিধি জালমেয় খলিলজাদ দোহায় আলোচনা শেষে ধারাবাহিকভাবে টুইট করে বৈঠকের অগ্রগতি জানিয়েছেন। নড়েচড়ে বসার কারণ হচ্ছে, এবারই প্রথম মার্কিন তরফে আলোচনার বিষয়টি স্বীকার করা হলো। তালেবানদের সঙ্গে মার্কিনিদের আলোচনার বিষয়টি নতুন না হলেও কখনোই মার্কিন পক্ষ তা স্বীকার করেনি। আফগানিস্তানে শান্তির লক্ষ্যে আলোচনা হচ্ছে। খুবই আশার খবর এটাই।
তবে আফগানিস্তানের সংকট সমাধানের পথে বড় দিশারি প্রতিবেশী দেশগুলো। এই সম্পর্কে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সংসদ স্পিকারের উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারী হোসেইন আমির আব্দুল্লাহিয়ান বলেছেন, আফগানিস্তানের অনিরাপত্তা ও অস্থিতিশীলতার জন্য আমেরিকা দায়ী। প্রতিবেশী দেশগুলোকে বাদ দিয়ে তাই আফগান সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। ইরানের পররাষ্ট্রনীতিতে আফগানিস্তান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে এটাও সুস্পষ্ট যে, আমেরিকা আফগান জাতি ও সরকারকে ইরান থেকে আলাদা করতে পারবে না এবং প্রতিবেশী দেশগুলোকে দূরে সরিয়ে রেখে আফগানিস্তানের বর্তমান সংকটের সমাধানও হবে না। তাই প্রতিবেশী দেশ তথা চীন, পাকিস্তান ও ইরান আফগান সংকট সমাধানের পথে বড় ভূমিকা রাখবে— এটাই স্বাভাবিক।
তাই অতি সহজে বলা যায়, নিজেদের ভাগ্য নির্ধারণের চাবিকাঠিটি এখন আর আফগান জনগণের হাতে নেই। সেটা চলে গেছে বিদেশি শক্তিগুলোর হাতে। তারা দেশটির জনগণের ভাগ্য নির্ধারণ করছে নিজেদের সুবিধা-অসুবিধার বিষয় বিবেচনা করে। যার ফলে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, আফগান জনগণ অবশ্য তাকিয়ে থাকবে প্রতিবেশী দেশগুলোর দিকে।
n লেখক :শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ, সাতক্ষীরা
