সরকারি চাকরির পরীক্ষায় জালিয়াতির ঘটনা বাড়ছে

আপডেট : ১২ আগস্ট ২০২৬, ০৬:৫৯

সরকারি চাকরি যেন এখন সোনার হরিণ। যা হাজারো তরুণ-তরুণীর স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্নকে পুঁজি করে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন ধরনের জালিয়াত চক্র। যেখানে লেনদেন হচ্ছে লাখ লাখ টাকা। পরীক্ষার আগের দিন প্রশ্নফাঁস থেকে পরীক্ষাকেন্দ্রে প্রক্সি প্রার্থীর ব্যবহার সবই চলছে দেদারসে। অবৈধ ইলেকট্রনিক ডিভাইসের মাধ্যমেও ব্যাপক জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া হচ্ছে। এ অবস্থায় বঞ্চিত হচ্ছে মেধাবী ও যোগ্য প্রার্থীরা। গত কয়েক মাসে এ রকম জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া বিসিএস ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ শতাধিক ব্যক্তিকে আইনের হাতে সোপর্দ করা হয়েছে। এছাড়া, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর অভিযানে জালিয়াত চক্রের গুটি কয়েক সদস্য গ্রেপ্তার হলেও নেপথ্যের মূল হোতারা আড়ালেই রয়ে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চক্রের মূল হোতাদের ধরা না গেলে কিংবা অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে বন্ধ হবে না এই ধারা। বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

গত ১ আগস্ট সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় প্রক্সি পরীক্ষার্থী বসিয়ে প্রতারণার মাধ্যমে চাকরি পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগে তিন জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। তাদের মধ্যে এক জন ৪৫তম বিসিএসে সমবায় ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত, বাকি দুই জনও সরকারি কর্মচারী। এরা হলেন, কক্সবাজারের মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের জুনিয়র সহকারী ব্যবস্থাপক ও ৪৫তম বিসিএস পরীক্ষায় সমবায় ক্যাডারের জন্য সুপারিশপ্রাপ্ত জুলফিকার আলী ওরফে রায়হান। চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে বিভাগীয় কর কমিশনারের কার্যালয়ের অধীন কর অঞ্চল-২-এর অফিস সহকারী নুরুন্নবী ও সোহেল।

সিআইডি জানায়, চাকরিতে যোগদানের আগে কাগজপত্র যাচাইয়ের সময় কর্মকর্তারা আবেদনপত্রের হাতের লেখার সঙ্গে মৌখিক পরীক্ষার সময় পূরণ করা চেকলিস্টের হাতের লেখায় অমিল দেখতে পান। পরে আরো যাচাই-বাছাইয়ে বিভিন্ন অসংগতি ধরা পড়লে সন্দেহের সৃষ্টি হয়। সিআইডি জানায়, জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃত তিন জনই জানায়, তারা নিয়োগ প্রক্রিয়ার কিছু ধাপে নিজেরা অংশ নেননি। তাদের হয়ে প্রক্সি পরীক্ষার্থীরা পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল। পরবর্তী সময় সিআইডির তদন্তে উঠে আসে, একটি সংঘবদ্ধ চক্র অর্থের বিনিময়ে সরকারি চাকরির পরীক্ষায় প্রক্সি পরীক্ষার্থী সরবরাহ করে প্রার্থীদের হয়ে পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার ব্যবস্থা করত।

একইভাবে গত ১৯ জুলাই খোদ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে অফিস সহায়ক পদে যোগ দিতে এসে মৌখিক পরীক্ষার প্রবেশপত্রের ছবির সঙ্গে মিল না থাকায় আটক হয়েছেন চার জন। অভিযুক্ত ব্যক্তিরা অন্যদের মাধ্যমে মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন। মন্ত্রণালয়ে এক জন কর্মকর্তা বলেন, আমরা মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নেওয়া সব প্রার্থীর প্রবেশপত্রসহ ছবি তুলে রেখেছিলাম। নিয়োগ চূড়ান্ত হওয়ার পর তাদের নিয়োগপত্র দেয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। নিয়োগপত্রে নির্বাচিত প্রার্থীদের ১৯ জুলাই সকাল ১০টায় সচিবালয়ের ১ নম্বর ভবনের ১৮০২ নম্বর কক্ষে মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিবের (প্রশাসন অধিশাখা) কাছে যোগদানপত্র দিতে বলা হয়। নির্ধারিত দিনে ঐ চার জন সেখানে উপস্থিত হলে মৌখিক পরীক্ষার সময় তোলা ছবির সঙ্গে তাদের চেহারার অমিল ধরা পড়ে। জিজ্ঞাসাবাদে তারা প্রক্সি পরীক্ষার্থীর বিষয়টি স্বীকার করেন। এখানে সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হচ্ছে, এই চার জনের কেউই এমসিকিউ থেকে শুরু করে লিখিত কিংবা মৌখিক কোনো পরীক্ষাতেই অংশ নেননি। তাদের হাতে-নাতে ধরার পর অন্তত দুই জনের সঙ্গে ইত্তেফাকের এই প্রতিবেদকের কথা হয়। তাদের মধ্যে এক জন জানান, এই চাকরির জন্য তিনি ১৮ লাখ টাকায় চুক্তি করেছিলেন, আরেক জন ১৫ লাখ টাকার চুক্তির কথা জানান। বিনিময়ে তাদের পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করা লাগবে না। শুধু চাকরিতে যোগদান করবে। এর আগে গত ৬ জুলাই একই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নিতে এসে জালিয়াতি অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন ছয় জনকে।

গত ৭ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী পরিচালক পদের নিয়োগ পরীক্ষায় উচ্চপ্রযুক্তির ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করার অপরাধে ১২ জন পরীক্ষার্থীকে হাতেনাতে আটক করা হয়। একইভাবে গত ১০ জানুয়ারি জেলাভিত্তিক প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহারের দায়ে একই দিনে অর্ধশতাধিক পরীক্ষার্থীকে আটক করার ঘটনা ঘটে। সম্প্রতি রংপুরে বাংলাদেশ পুলিশের ক্যাডেট এএসআই পদে নিয়োগের নামে জাল প্রবেশপত্র ও ভুয়া পরীক্ষার্থী চক্রের মূল হোতাসহ চার সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। গত ২ মে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে সমন্বিত নাবিক ভর্তি পরীক্ষায় কেন্দ্রে অবৈধ ইলেকট্রিক ডিভাইস ব্যবহার ও প্রক্সি পরীক্ষা দেওয়ার সময় ৯ জনকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গত ১৯ জুন খাদ্য অধিদপ্তরের বিভিন্ন পদে নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নিতে এসে ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারের অভিযোগে ৫০ জনের বেশি পরীক্ষার্থীকে আটক করা হয়েছে। একইভাবে সাম্প্রতিক সময়ে রেলপথ মন্ত্রণালয় ও ভূমি মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন সরকারি চাকরির পরীক্ষায় কয়েকটি স্টেজে জালিয়াতির মহোত্সব দেখা গেছে। তবে এসব ঘটনায় জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া সাধারণ পরীক্ষার্থীরা গ্রেপ্তার হলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায় মূল হোতারা।

সিআইডির কর্মকর্তারা জানান, সরকারি চাকরিতে নিয়োগ পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে প্রায় এক ডজন জালিয়াতির সিন্ডিকেট গড়ে ওঠেছে। চক্রের সদস্যরা প্রথমে চাকরিপ্রত্যাশী দুর্বল বা ব্যর্থ প্রার্থীদের টার্গেট করে যোগাযোগ স্থাপন করে। চাকরির নিশ্চয়তায় ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত চুক্তি হয়। যা কখনো কখনো ২০ লাখ পর্যন্ত হয়। নেয়া হয় অগ্রিম টাকা। কখনো যোগ্য এক জনকে ভুয়া পরিচয়ে পরীক্ষায় বসানো হয়। কখনো ছবি বা বায়োমেট্রিক জালিয়াতিও করা হয়। এসবে সুবিধা করতে না পারলে ক্ষুদ্র ব্লুটুথ ডিভাইস কানের ভেতরে প্রবেশ করানো হয়। আর শরীরের বিভিন্ন অংশে লুকানো থাকে রিসিভার। যার মাধ্যমে প্রশ্নের উত্তরগুলো খুব সহজেই পৌঁছে দেওয়া হয় পরীক্ষার্থীর কানে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) জানিয়েছে, এই সংঘবদ্ধ জালিয়াতি চক্রের শিকড় উপড়ে ফেলতে এবং এর সঙ্গে জড়িত অন্য সদস্যদের শনাক্ত করতে দেশ জুড়ে বিশেষ অভিযান ও তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

এসব ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জন যুগ্মসচিব বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে এ ধরনের ঘটনা ব্যাপক আকারে বেড়েছে। বলতে গেলে প্রতিটি সরকারি চাকরির পরীক্ষায় এ রকম জালিয়াতির ঘটনা ধরা পড়ছে। তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, কানের ভেতরে ইয়ারফোন থাকে, মোবাইলের সঙ্গে ডিভাইস থাকে, মোবাইলের মধ্যে সিম থাকে। যার মাধ্যমে বাইরে থেকে কথা আদান-প্রদান হয় এবং সেখান থেকে তথ্য নিয়ে তারা পরীক্ষা দেয়। তিনি বলেন, এমন চক্রের মূল হোতাদের ধরা না গেলে শুধরাবে না সিস্টেম। এই কর্মকর্তা বলেন, এ পরিস্থিতিতে পরীক্ষা পদ্ধতি কীভাবে আরো স্বচ্ছ ও জালিয়াতমুক্ত করা যায়, আমাদের সেটা ভাবতে হচ্ছে। শিগিগরই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে সরকারি চাকরিতে নিয়োগের বিষয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, দপ্তর-অধিদপ্তরে এ বিষয়ে নতুন করে কঠোর নির্দেশনাসহ সতর্কতামূলক পরিপত্র জারি করা হতে পারে।

এ বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (এপিডি উইং-প্রশাসন) রাহেদ হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, নিয়োগ পরীক্ষায় আগে থেকেই এ ধরনের জালিয়াতি চলে আসছিল। তবে পর্যায়ক্রমে এটি বেড়েই চলছে। বিশেষ করে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে নতুন করে জালিয়াতির কৌশলও বদলাচ্ছে। এ ধরনের জালিয়াতির ঘটনায় ইতিমধ্যে অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে আমরা আইনগত ব্যবস্থা নিয়েছি।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনায় প্রকৃত যোগ্য প্রার্থীর পরিবর্তে অযোগ্য ও ভুয়া প্রার্থীর চাকরি লাভের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। যা সুষ্ঠু নিয়োগ প্রক্রিয়াকে প্রবলভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এ ধরনের জালিয়াতি প্রতিরোধে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে শিগিগর নির্দেশনামূলক একটি আদেশ জারি করা হবে। এ আদেশ প্রতিটি মন্ত্রণালয়, দপ্তর-অধিদপ্তর, বিভাগ, বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকদের কাছে পাঠানো হবে।

ইত্তেফাক/এনএন