কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে একটি নকল সিগারেট তৈরির কারখানায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে প্রাথমিকভাবে প্রায় ২ কোটি টাকার মালামাল জব্দের কথা জানানো হয়েছিল। কিন্তু থানায় দায়ের করা মামলার এজাহারে সেই মালামালের মূল্য দেখানো হয়েছে মাত্র ৩ লাখ টাকা। জব্দের হিসাবে প্রায় ১ কোটি ৯৭ লাখ টাকার এই বিশাল গরমিল নিয়ে এখন জনমনে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
বুধবার (১২ আগস্ট) বেলা সাড়ে ১১টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত উপজেলার সদর ইউনিয়নের গড়বাড়িয়া গ্রামের হাবিব মাস্টারের গরুর খামারের ভেতরের একটি গোডাউনে এই অভিযান চালানো হয়। দৌলতপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) প্রদীপ কুমার দাশের নেতৃত্বে পরিচালিত এই অভিযানে পুলিশ ও ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর (বিএটি) প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
অভিযান শেষে সহকারী কমিশনার (ভূমি) গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, গোডাউন থেকে ডার্বি, নেভি ও রয়েল ব্র্যান্ডের প্রায় ২০ লাখ শলাকা নকল সিগারেট এবং সিগারেট তৈরির বিপুল সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে, যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ২ কোটি টাকা।
তবে ওই রাতেই ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর (বিএটি) কুষ্টিয়ার লিগ্যাল অফিসার কাজী মর্তুজা রেজা বাদী হয়ে দৌলতপুর থানায় ৯ জনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাতনামা ১০-১২ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন।
দৌলতপুর থানা-পুলিশ জানায়, মামলার এজাহারে জব্দ তালিকায় ২৫ হাজার শলাকা সিগারেট ও ২৫ বস্তা সিগারেট তৈরির তামাকের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এসব মালামালের আনুমানিক মূল্য দেখানো হয়েছে প্রায় তিন লাখ টাকা।
এতে অভিযানের সময় জব্দের কথা বলা প্রায় ২০ লাখ শলাকা সিগারেটের সঙ্গে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা ২৫ হাজার শলাকার বড় ধরনের পার্থক্য দেখা দিয়েছে। একইভাবে অভিযানে জব্দ করা সিগারেট তৈরির অন্যান্য সরঞ্জামের বিষয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এ বিষয়ে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) প্রদীপ কুমার দাশ বলেন,বিএটি প্রতিনিধিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই ২ কোটি টাকার কথা জানানো হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘দুই কোটি টাকার মালামাল কীভাবে মামলায় তিন লাখ টাকায় নেমে এল, বিষয়টি মামলার বাদীই ভালো বলতে পারবেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘অভিযানের পর বাদীপক্ষের এমন কর্মকাণ্ড আমাদের প্রশ্নবিদ্ধ করছে। বিষয়টি নিয়ে আমরা বাদীপক্ষকে জিজ্ঞাসাবাদ করব।’
তবে মামলার বাদী কাজী মর্তুজা রেজার দাবি, গোডাউন থেকে যে পরিমাণ মালামাল জব্দ করা হয়েছে, সেটিই এজাহারে উল্লেখ করে মামলা করা হয়েছে।
দৌলতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খালেদুর রহমান জানান, বাদীর তালিকার ভিত্তিতেই মামলা নেওয়া হয়েছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, কারখানায় থাকা নকল সিগারেট তৈরির মেশিনটির দামই প্রায় ২ কোটি টাকা। মেশিনটি তালাবদ্ধ করে রাখা হলেও তা জব্দ তালিকায় উল্লেখ করা হয়নি এবং বর্তমানে সেটি কার হেফাজতে রয়েছে—তাও তিনি স্পষ্ট করতে পারেননি।
মামলার প্রধান আসামি ও গোডাউনের মালিক হাবিব মাস্টারের দাবি, তিনি মাসিক ৪০ হাজার টাকা ভাড়ায় জয়রামপুর এলাকার শাকিল ও বৈদ্যনাথতলা এলাকার লিওন হোসেনের কাছে গোডাউনটি ভাড়া দিয়েছিলেন। তার ভাষ্য, এর আগেও র্যাব ও কাস্টমসের অভিযানে গোডাউনটি সিলগালা করা হয়েছিল। পরে সেটি আবার চালু করা হয়।
এর আগে গত ৯ মে র্যাব-১২ ও কাস্টমস বিভাগের যৌথ অভিযানে একই কারখানায় ৫টি নকল সিগারেট তৈরির মেশিন ও ১ লাখ শলাকা সিগারেট জব্দ করে কারখানাটি সিলগালা করে দেওয়া হয়েছিল। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের সিলগালা করা কারখানা কয়েকদিনের মধ্যেই রহস্যজনকভাবে পুনরায় চালু করা হয়।
সর্বশেষ অভিযানের পর জব্দ করা মালামালের পরিমাণ ও মূল্য নিয়ে অভিযান পরিচালনাকারী কর্মকর্তা, মামলার বাদী ও পুলিশের বক্তব্যে অসামঞ্জস্য দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, অভিযানে প্রকৃতপক্ষে কী পরিমাণ মালামাল জব্দ করা হয়েছিল, সেগুলোর বর্তমান অবস্থান কোথায় এবং মামলার জব্দ তালিকায় কেন ভিন্ন তথ্য দেওয়া হয়েছে—তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

