নায়ক রিয়াজকে যেভাবে খুঁজে পেয়েছিলেন অ্যাকশন কিং জসিম

আপডেট : ১৪ আগস্ট ২০২৬, ১৫:৪০

আশির দশকের দাপুটে চিত্রনায়ক জসিম। পুরো নাম আব্দুল খালেক জসিম। যাকে সবাই  ‘অ্যাকশন কিং জসিম’ নামেই চেনে। ভিলেন হিসেবে চলচ্চিত্রের যাত্রা শুরু হলেও পরবর্তীতে অ্যাকশন হিরো হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। ক্যামেরার সামনে গুলি, বিস্ফোরণ, লড়াই-সব নিজের হাতে করতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন নায়ককে সাহসী হতে হবে। তার হাত ধরেই ঢাকাই সিনেমায় এসেছিলেন একসময়ের জনপ্রিয় চিত্রনায়ক রিয়াজ।

আজ নায়ক জসিমের জন্মদিন। ১৯৪৫ সালের এই দিনে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার বক্সনগর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।  ১৯৭১ সালে হাতে অস্ত্র তুলে দেশ রক্ষায় নেমেছিলেন তরুণ মুক্তিযোদ্ধা জসিম। মুক্তিযুদ্ধেও অংশ নিয়েছিলেন এই অভিনেতা। তার চোখে ছিল স্বাধীনতার স্বপ্ন। আর বুক ভরা ছিল অদম্য সাহস। যুদ্ধ শেষে সেই সাহসী তরুণের জীবন বেছে নেয় অন্য পথে। ঢুকে পড়েন চলচ্চিত্রে। প্রথমে খলনায়ক হিসেবে চলচ্চিত্রে অভিষেক হয়। তার ভয়ংকর দৃষ্টি দর্শকের গায়ে কাঁটা দিত।

চলচ্চিত্রে জসিমের পথচলা শুরু হয় সত্তরের দশকের শুরুতে। ১৯৭২ সালে ‘দেবর’ সিনেমার মাধ্যমে অভিনয় শুরু করেন তিনি। পরের বছর ‘রংবাজ’ সিনেমায় অ্যাকশন পরিচালক হিসেবে কাজ করেন। এরপর দেওয়ান নজরুল পরিচালিত ‘দোস্ত দুশমন’ সিনেমায় খলনায়ক চরিত্রে অভিনয় করে ব্যাপক পরিচিতি পান।

‘দোস্ত দুশমন’ ছিল ভারতের জনপ্রিয় সিনেমা ‘শোলে’র আদলে নির্মিত। এতে জসিম অভিনয় করেছিলেন গাফফার চরিত্রে। তার অভিনয় এতটাই প্রশংসিত হয়েছিল যে ‘শোলে’র গব্বর সিং চরিত্রে অভিনয় করা আমজাদ খানও জসিমের অভিনয়ের প্রশংসা করেছিলেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে খলনায়ক হিসেবেই থেমে থাকেননি জসিম। ‘সবুজ সাথী’ সিনেমায় প্রধান চরিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে নায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন তিনি। এরপর একের পর এক অ্যাকশনধর্মী সিনেমায় অভিনয় করে হয়ে ওঠেন দর্শকের প্রিয় নায়ক। আশির দশকে শাবানা ও রোজিনার সঙ্গে তার জুটি বিশেষ জনপ্রিয়তা পায়। শোষিত-বঞ্চিত মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে বিভিন্ন সিনেমায় তার চরিত্র দর্শকের মনে গভীর দাগ কাটে।

এ ছবির অ্যাকশন–দৃশ্যগুলো করেছিল তার নিজস্ব প্রযোজনা সংস্থা জ্যাম্বস ফাইটিং গ্রুপ। এই ছবির মাধ্যমেই ঢাকাই সিনেমার প্রযোজক-পরিচালকদের নজরে আসেন জসীম। মূল পরিচিতি পান দেওয়ান নজরুল পরিচালিত ‘দোস্ত দুশমন’ ছবিতে অভিনয় করে। এটি ছিল হিন্দি ‘শোলে’ ছবির রিমেক, যেখানে তিনি গব্বর সিংয়ের চরিত্রে অভিনয় করেন। সেই চরিত্রে এমন বাস্তবতা ও ভয় জড়িয়েছিলেন যে দর্শকেরা সিনেমা হলে ঢোকার সময় বলতেন, ‘আজ জসীমের মাইর খেতে যাচ্ছি।’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয়
এখনো ইউটিউব শর্টস কিংবা ফেসবুক রিলসে জসীমের অভিনয়, নাচ, মারপিটের দৃশ্যের ভিডিও খোঁজেন দর্শক। তরুণেরা তাঁর সংলাপ অনুকরণ করেন, সামাজিক যোগযোগমাধ্যমে ট্রল তৈরি হয় তাকে ঘিরে। এমনকি বিজ্ঞাপনেও তাঁর সাদৃশ্য মডেল দেখা যায়। ফেসবুকে প্রায়ই জসীমের ছবিসহ নানা সংলাপ দিয়ে কার্ড দেখা যায়। তাকে নিয়ে মিম দেখা যায়।

তবে অভিনয়ের বাইরে জসিমের আরেকটি বড় পরিচয়-তিনি ছিলেন নতুন প্রতিভা খুঁজে বের করতে পারা একজন শিল্পী। তার সবচেয়ে আলোচিত আবিষ্কার নিঃসন্দেহে চিত্রনায়ক রিয়াজ।

রিয়াজ তখনো চলচ্চিত্রের মানুষ নন। বিমানবাহিনীতে বিমানচালক হিসেবে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর চাকরি হারিয়ে ঢাকায় চলে আসেন। তার চাচাতো বোন ছিলেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী ববিতা। একদিন ববিতার সঙ্গে বিএফডিসিতে গিয়েছিলেন রিয়াজ। আর সেখানেই তার দিকে চোখ পড়ে জসিমের।

১৯৯৪ সালের সেই ঘটনা বদলে দেয় রিয়াজের জীবন। সুদর্শন তরুণ রিয়াজকে দেখে জসিমের মনে হয়, তাকে চলচ্চিত্রে নেওয়া যেতে পারে। তিনি রিয়াজকে অভিনয়ের প্রস্তাব দেন। তখন অভিনয় সম্পর্কে রিয়াজের তেমন কোনো অভিজ্ঞতাই ছিল না। জসিমের প্রস্তাবের পাশাপাশি ববিতার উৎসাহও তাকে চলচ্চিত্রে আসার সাহস জোগায়।

পরের বছরই জসিমের সঙ্গে ‘বাংলার নায়ক’ সিনেমায় অভিনয়ের সুযোগ পান রিয়াজ। ১৯৯৫ সালের ৩ মার্চ মুক্তি পাওয়া সিনেমাটিতে জসিম অভিনয় করেছিলেন ডন চরিত্রে, শাবানা ছিলেন রোকেয়া আর রিয়াজ অভিনয় করেন মুন্না চরিত্রে। সিনেমাটিই হয়ে ওঠে রিয়াজের চলচ্চিত্রে অভিষেক।

তবে শুধু অভিনয়ের সুযোগ দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেননি জসিম। নবাগত রিয়াজকে অভিনয় ও অ্যাকশনের নানা কৌশলও শেখাতেন তিনি। পরে জসিমকে স্মরণ করে রিয়াজ বলেছিলেন, এফডিসিতে জসিমের শুটিং চলার সময় তিনি ফাইট প্র্যাকটিস করতেন। এমনও হয়েছে, নিজের শুটিং রেখেও জসিম তাকে ফাইট শিখিয়েছেন।

রিয়াজ জানান, জসিমের কারণেই তিনি নায়ক রিয়াজ হয়ে উঠতে পেরেছেন। অর্থাৎ জসিমের জীবনে রিয়াজকে আবিষ্কারের ঘটনাটি ছিল শুধু একজন নবাগতকে সুযোগ দেওয়ার বিষয় নয়; পরবর্তী সময়ে সেটি হয়ে ওঠে ঢাকাই চলচ্চিত্রের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার।

‘বাংলার নায়ক’র পর অবশ্য রিয়াজকে নিজের জায়গা তৈরি করতে খুব বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়নি। পরবর্তী সময়ে ‘প্রাণের চেয়ে প্রিয়’সহ একের পর এক সফল সিনেমায় অভিনয় করে নব্বইয়ের দশকের অন্যতম জনপ্রিয় নায়ক হয়ে ওঠেন তিনি। কিন্তু তার সেই দীর্ঘ চলচ্চিত্রযাত্রার প্রথম দরজাটি খুলে দিয়েছিলেন জসিমই।

আলোচনায় যেসব সিনেমা

জসীমের প্রায় দুই শতাধিক ছবির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘তুফান’, ‘জবাব’, ‘নাগ-নাগিনী’, ‘বদলা’, ‘বারুদ’, ‘সুন্দরী’, ‘কসাই’, ‘লালু মাস্তান’, ‘নবাবজাদা’, ‘অভিযান’, ‘কালিয়া’, ‘বাংলার নায়ক’, ‘গরিবের ওস্তাদ’, ‘রাজা বাবু’, ‘স্বামী কেন আসামী’, ‘মেয়েরাও মানুষ’, ‘বুকের ধন’ ইত্যাদি। এই ছবিগুলোর অধিকাংশেই ছিল সামাজিক বার্তা, দরিদ্রের সংগ্রাম, অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই, মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা, প্রেমে ত্যাগ—যা তাকে কেবল পর্দার নায়ক নয়, বাস্তব জীবনেরও প্রতীক করে তোলে।

বাস্তব জীবনের নায়ক

জসীম শুধু সিনেমার পর্দার নায়ক ছিলেন না, বাস্তব জীবনেও ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা। যুদ্ধে তার সাহসিকতার গল্প শোনানো হতো পরবর্তী প্রজন্মকে। ভিলেনের চরিত্রে অভিনয়ের সময় শুটিংয়ের ফাঁকে তিনি তরুণ সহকর্মীদের বলতেন, ‘দেশের জন্য গুলি খেয়েছি, এখন দর্শকের ভালোবাসার জন্য মার খাচ্ছি।’ তার জীবনের এই বাস্তব বীরত্বই হয়তো তাকে সিনেমায় এত বিশ্বাসযোগ্য করেছে। দর্শকের চোখে তার লড়াই, সংলাপ, আবেগ-সবকিছুই ছিল বাস্তবের সম্প্রসারণ।

১৯৯৮ সালের ৮ অক্টোবর মাত্র ৪৮ বছর বয়সে চলে যান এই অভিনেতা।

 

 

ইত্তেফাক/এনটিএম