‘সোরকারি চাকরির পরীক্ষা দ্যাওযার জন্যে আজক্যা (আজ) ছোলের বাড়িত আসার কথা আছিলো, আইলো হামার ছোলের লাশ।’ এ্যাম্বুলেন্স যোগে বাড়ির উঠানে রানা মিয়ার (২৩) মরদেহ পৌঁছিলে এভাবে প্রলাপ বকতে বকতে কান্না করছিলেন তার মা মনোয়ারা বেগম।
বাড়ির উঠানের আর এক পাশে কান্না করছেন রানার বাবা বর্গাচাষী হারুন অর রশীদ। তিনি বলেন, ‘অভাবের সংসার। ছোলটা মাসে মাসে ট্যাকা দিলো হয়, তাকে দিয়্যা কোন মতে সংসারটা চলছিলো, এ্যাখোন হামাক ক্যাটা ট্যাকা দিবি।’ এভাবে প্রশ্ন আর প্রলাপ বকতে বকতে তিনি কান্না করছেন।
বাবা হারুন অর রশীদ জানান, সম্প্রতি রানা মিয়া গাইবান্ধা জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে অফিস সহায়ক পদে চাকরির জন্য আবেদন করেছিলেন। আগামী ২১ আগষ্ট সেই চাকুরির লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। লিখিত পরীক্ষা দেওয়ার জন্য আজ শনিবার রানার বাড়ি আসার কথা ছিল। কিন্তু আসলো লাশ হয়ে।
বড়ভাই মোনারুল ইসলাম চট্টগ্রাম থেকে ছোটভাই রানা মিয়ার মরদেহ নিয়ে শনিবার সকাল ১০টায় বাড়িতে পৌঁছেন। গ্রামের বাড়িতে লাশ পৌঁছানোর পর স্বজনদের কান্না-আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠে চারপাশ। একনজর দেখতে প্রতিবেশিরা তার বাড়িতে ভীড় করে। পরে বাদ জোহর নামাজ শেষে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন হয়।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে জাহাজভাঙা কারখানায় বিষাক্ত গ্যাসে নিহত নয়জনের মধ্যে দুজনের বাড়ি গাইবান্ধায়। এরমধ্যে নিহত রানা মিয়ার (২৩) বাড়ি গাইবান্ধা সদর উপজেলার কুপতলা ইউনিয়নের পশ্চিম কুপতলা গ্রামে।
বড়ভাই মোনারুল ইসলাম জানান, তারা দুই ভাই ও এক বোন। রানা মিয়া ২০২১ সালে পশ্চিম কুপতলা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ২০২৩ সালে সাদুল্লাপুর ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে। এরপর অভাবেব সংসারে সহযোগিতা করতে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী ইউনিয়নের স্টেশন রোড এলাকার ফেরদৌস স্টিল নামে একটি কারখানায় শ্রমিকের চাকরি নেয়।
তিনি আরও জানান, তিনি (মোনারুল ইসলাম) চট্টগ্রামের অন্য একটি কোম্পানিতে চাকরি করেন। সেখানে স্ত্রী মিশু খাতুনকে (২৫) নিয়ে তিনি বসবাস করেন। একমাত্র বোন পিংকির বিয়ে হয়েছে।
এদিকে চট্টগ্রামের একই ঘটনায় নিহত হন গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ধোপাডাঙ্গা ইউনিয়নের কিশামত হলদিয়া গ্রামে খোকন মিয়া (২৬)। বাবা বর্গা চাষী রানা মিয়ার দুই ছেলে এক মেয়ে। বড় ছেলে উজ্জল মিয়া (৩২) কৃষি কাজ করেন। মেঝ মেয়ের বিয়ে হয়েছে। সবার ছোট ছিল খোকন। খোকনের স্ত্রী দুই বছরের সন্তানকে নিয়ে ঢাকায় বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করেন। প্রায় ছয়মাস আগে খোকন চট্টগ্রামে ওই জাহাজ কোম্পানির চাকরিতে যান।
শনিবার সকালে তারও লাশ এ্যাম্বুলেন্সযোগে বাড়িতে পৌঁছে। দুপরে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
প্রসঙ্গত, শুক্রবার সকালে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীর একটি জাহাজভাঙা কারখানায় স্ক্র্যাপ জাহাজের গ্যাস সিলিন্ডার থেকে ছড়িয়ে পড়া বিষাক্ত গ্যাসে ৯ জন নিহত হয়েছেন। ভাটিয়ারী ইউনিয়নের স্টেশন রোড এলাকার ফেরদৌস স্টিল নামে একটি কারখানায় এ ঘটনা ঘটে।
নিহতরা হলেন- সানি জলদাস (২৩), পলাশ জলদাস (৩৫), হাবিবুর রহমান (৫১), মোহাম্মদ মনসুর (৫৫), নাসির উদ্দিন (৫১), আবদুল আলীম (৩৬), রানা মিয়া (২৩), মতিউর রহমান (১৯) ও খোকন মিয়া (২৬)। তাদের মধ্যে খোকন ও রানার বাড়ি গাইবান্ধায়।

