যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম মুসলিম সিনেটর হওয়ার পথে আবদুল এল সাইদ, কে তিনি?

আপডেট : ১৯ আগস্ট ২০২৬, ১৬:২৯

মিশিগান অঙ্গরাজ্য থেকে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সিনেটর পদের মনোনয়ন জিতে মার্কিন রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন মিশরীয় বংশোদ্ভূত আবদুল এল সাইদ। আগামী নভেম্বরের মিডটার্ম নির্বাচনে জিতলে তিনি হবেন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর। ইসরায়েলে সামরিক অর্থায়নের বিরোধিতা, ট্রাম্প প্রশাসনের সমালোচনা এবং সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার দাবি—এই তিন ইস্যুকে সামনে রেখে রাজনীতির মূলধারায় নিজের জায়গা করে নিয়েছেন এই ৪১ বছর বয়সী সাবেক জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা।

আগস্টের শুরুতে মিশিগানের ডেমোক্র্যাট মনোনয়ন নিশ্চিত করার পর বিজয় ভাষণে সমর্থকদের সামনে নিজের শেকড়ের গল্প তুলে ধরেন এল সাইদ। তিনি বলেন, 'আমার কাজিনদের মতো আমারও মিশরে ট্যাক্সি ড্রাইভার হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ইতিহাসের দুর্ঘটনায় আমার বাবা ডেট্রয়েটে অভিবাসী হয়ে এসেছিলেন, আর আমি আমেরিকান পরিচয় পেয়েছি।'

নভেম্বরের মিডটার্ম নির্বাচনে মিশিগানের সিনেটর পদে তার প্রতিদ্বন্দ্বী হবেন রিপাবলিকান পার্টির মাইক রজার্স, যিনি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। এল সাইদের নির্বাচনী প্রচারণার মূল বার্তা ছিল—রাজনীতি থেকে করপোরেট অর্থায়ন সরানো, সাধারণ মানুষের পকেটে অর্থ ফেরানো এবং সবার জন্য সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে ইসরায়েলসহ যেকোনো বিদেশি সেনাবাহিনীতে মার্কিন করদাতাদের অর্থে তহবিল জোগানোর তীব্র বিরোধিতা করেছেন তিনি।

এ প্রসঙ্গে এল সাইদ বলেন, 'ইসরায়েল, মিশর, সৌদি আরব, পাকিস্তান—যেকোনো দেশের সেনাবাহিনীতে অর্থায়নের বিপক্ষে আমি। আমি এই ভেবে কর দিই না যে কাতার আমার টাকায় ট্যাঙ্ক বানাবে। বরং আমি চাই ওই অর্থ দিয়ে দেশের রাস্তা তৈরি হোক, স্কুল সংস্কার হোক।' ইসরায়েলের সেনাবাহিনীতে মার্কিন অর্থ সহায়তাকে তিনি 'করদাতাদের টাকার নিকৃষ্টতম ব্যবহার' বলেও সমালোচনা করেন।

তবে ইসরায়েল ইস্যুতে তার এই অবস্থানের কারণে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সরাসরি সমালোচনার মুখে পড়েন এল সাইদ। ট্রাম্প তাকে 'ইহুদি বিদ্বেষী' আখ্যা দিয়ে বলেন, 'এই ব্যক্তি ইহুদিদের ভালোবাসে না, ইসরায়েলকে ভালোবাসে না, সে তাদের ঘৃণা করে।' জবাবে এল সাইদ বারবার জানিয়েছেন, তিনি মিশিগানের ইহুদি সম্প্রদায়সহ সব নাগরিককে ঠিক ততটুকুই নিরাপত্তা দিতে চান, যতটা তিনি নিজের দুই মেয়ের জন্য চান।

বিশ্লেষকদের ধারণা, মিশিগানে এল সাইদের মনোনয়ন জয়ের পেছনে মূল ভূমিকা রেখেছে ইসরায়েল ইস্যুতে তার স্পষ্ট অবস্থান। তার প্রতিদ্বন্দ্বী ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হেইলি স্টিভেন্সের নির্বাচনী তহবিলের বড় অংশ এসেছিল ইসরায়েলপন্থী প্রতিষ্ঠান আইপ্যাক থেকে। স্টিভেন্স বিনা শর্তে ইসরায়েলকে সহায়তা অব্যাহত রাখার পক্ষে থাকলেও এল সাইদের বিপরীত অবস্থান ভোটারদের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, ডেমোক্র্যাটিক পার্টির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সমর্থন ছাড়াই এই মনোনয়ন জিতেছেন এল সাইদ, যে কারণে তাকে 'বহিরাগত' বলা হচ্ছে। বামপন্থী মতাদর্শের অনুসারী এই রাজনীতিবিদকে সমর্থন দিয়েছেন ডেমোক্র্যাটদের বার্নি স্যান্ডার্স ও আলেক্সান্দ্রা ওকাসিও-কর্টেজের মতো প্রগতিশীল ধারার নেতারা।

মূলধারার রাজনীতিতে এল সাইদের প্রথম সক্রিয় অংশগ্রহণ দেখা যায় ২০১৮ সালে মিশিগানের গভর্নর নির্বাচনে। সেবার পরাজিত হলেও মোট ভোটের ৩০ শতাংশের বেশি পেয়েছিলেন তিনি। তবে তার রাজনৈতিক অনুপ্রেরণার শুরুটা আরও আগে—২০০৭ সালে। মিশিগান ইউনিভার্সিটির সমাবর্তন অনুষ্ঠানে শ্রেষ্ঠ শিক্ষার্থী হিসেবে বক্তব্য রাখেন তিনি। প্রধান অতিথি সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন সেদিন প্রকাশ্যে তার বক্তব্যের প্রশংসা করেছিলেন, যা তাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে।

রাজনীতিতে আসার আগে জনস্বাস্থ্য খাতে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন এল সাইদ। মাত্র ৩০ বছর বয়সে ২০১৫ সালে ডেট্রয়েট শহরের জনস্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক হন তিনি, যা যুক্তরাষ্ট্রের কোনো বড় শহরে এই পদে থাকা সর্বকনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে নজির তৈরি করে। দায়িত্বকালে তিনি শিশু মৃত্যুহার কমানো, শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে চশমা বিতরণ এবং শতাধিক স্কুলে সীসার মাত্রা পরীক্ষার মতো কার্যকর পদক্ষেপ নেন।

নভেম্বরের নির্বাচনে এল সাইদের জয়-পরাজয় শুধু মিশিগানের জন্যই নয়, গোটা মার্কিন রাজনীতিতে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের পক্ষে ভোট দেওয়া মিশিগান রাজ্য যদি সিনেট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের দখলে আসে, তা ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দলটির জন্য কৌশলগত সুবিধা তৈরি করবে। এমনকি দলের মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় মধ্যমপন্থী ধারার বদলে বামপন্থী প্রার্থীকে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী করার চিন্তাও জোরদার হতে পারে।

ইত্তেফাক/এনএন