মতিঝিল থেকে জিগাতলায় যাচ্ছে মাহমুদা আক্তার। ছেলেকে আইডিয়াল স্কুলে দিয়ে ফিরছেন ‘পিংক বাসে’। প্রেস ক্লাবের কাছে কথা হয় তার সঙ্গে। বলেন আমাদের জন্য এই সার্ভিস খুবই ভালো, তবে এই সময়টায় যাত্রী এত কম যে, আমার একটু ভয়ই করছে—এর ভবিষ্যত্ কী হবে। তখন ঘড়িতে সাড়ে ১২টা বাজে। বাসের কন্ডাক্টর আয়শা সিদ্দিকা জানান, এই সময় যাত্রী কম হলেও সকাল সাড়ে ৮টায় যখন তারা মোহাম্মদপুর থেকে ছেড়ে মতিঝিল গেছেন তখন বাস ভর্তি ছিল এবং বেশ কয়েক জন যাত্রী দাঁড়িয়ে গেছেন।
১৮ আগস্ট থেকে নারীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ যাতায়াতের জন্য রাজধানীর বিভিন্ন রুটে চালু হয় বিশেষ বাস ‘পিংক বাস’ সার্ভিস, বিআরটিসির উদ্যোগে নারী চালক ও নারী কন্ডাক্টর পরিচালিত এই বিশেষ বাস সার্ভিসে সকালে কিছুটা যাত্রী থাকলেও দিনের অন্য সময় যাত্রীসংকট দেখা যায়। তবে যাত্রীসহ সাধারণ মানুষের বাসগুলোর প্রতি আগ্রহও দেখা যায়। অনেকেই মোবাইলে পিংক বাসের ছবি তুলে নেন।
গতকাল বুধবার যখন অধিকাংশ পিংক বাসকে ফাঁকা আসন নিয়ে চলাচল করতে দেখা যায়। একই সময় সাধারণ রুটের বাসগুলোতে নিয়মিত নারী যাত্রীদের ভিড়ও দেখা যায়। মতিঝিল থেকে কমলাপুর হয়ে তালতলা যাওয়া বাসের ড্রাইভার খাদিজা আক্তার রিমা বলেন, এখন তাদের যাত্রীসংকট আছে। সকালে একটু বেশি হলে পরের ট্রিপে তা হাতেগোনা হয়ে পড়ে।
নিয়মিত রুটের বাসে উঠা বারডেম হাসপাতালে চাকরি করা শিরীন আক্তার বলেন, অনেক নারী যাত্রী আছে। তবে তারা নির্দিষ্ট বাসের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করলে সময়মতো কর্মস্থলে পৌঁছানো নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। ফলে যে বাস আগে আসে, সেটিতেই উঠতে হচ্ছে তাদের। আর এক জন আসমা আক্তারের ভাষ্য, তিনি প্রতিদিনের মতো অফিসে যাওয়ার জন্য বের হয়েছেন। শুধু মহিলা বাসের অপেক্ষায় থাকলে কখন বাস আসবে এবং সময়মতো অফিসে পৌঁছাতে পারবেন কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে বলেই নিয়মিত রুটের বাসে উঠেছেন। তবে অপেক্ষার মধ্যে পিংক বাস এলে তিনি সেটিতে উঠতেন বলে জানান।
বারডেম-২ (নারী ও শিশু) তে চাকরি করা জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, অন্য বাস যেখানে ১০ টাকা ভাড়া নেয়, সেখানে এই বাসের জন্য তাকে ১৫ টাকা গুনতে হয়েছে। ২০ টাকায় তো তিনি এসি বাসেই উঠতে পারেন। আর একজন লাবনী আক্তার বলেন, এখন রেগুলার বাসে উঠে সুবিধা-অসুবিধার কথা বলা যাবে না। বললেই শুনতে হবে আপনাদের জন্য তো আলাদা বাস আছে। মিরপুর বাসডিপো থেকে মতিঝিলের উদ্দেশে দুটি বাস দুই রুটে ছেড়ে যায়—এই ডিপোর অপারেশন ম্যানেজার ওমর ফারুক মেহেদী বলেন, তার ডিপো থেকে সকাল সাড়ে ৭টায় একটা ও সকাল ৮টায় একটা বাস ছেড়ে যায়, প্রথম দিন বলে অনেক যাত্রীই বাস সম্পর্কে জানে না, তারপরও কিছু যাত্রী ছিল। এই রুটের এক বাসের চালক রাবেয়া সুলতানা বলেন, সকালে তাদের বাস ভর্তি ছিল। সারা দিনে তিনি চার বার আসা-যাওয়া করেন, ১টার দিকে সবচেয়ে কম ভিড় ছিল। শেষবারে আবারও তার বাস ভর্তি হয়। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, নারীর নিরাপদ চলাচলের জন্য ‘এ্যাফারমেটিফ এ্যাকশন’ এই বাস চালু করার আগে একটা সার্ভে করা প্রয়োজন ছিল। কোন কোন রুটে কখন যাত্রী বেশি থাকে তখনই বাসগুলো সেই রুটে চলবে। আর অন্য সময় যেন নারীরা সব নিয়মিত বাসে নিরাপদে চলতে পারে সেই ব্যবস্থাও নিরাপদ করতে হবে।
বিআরটিসির এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য নারী যাত্রীদের নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক পরিবহন নিশ্চিত করা। বিশেষ করে কর্মজীবী নারী ও শিক্ষার্থীদের জন্য গণপরিবহনে যাতায়াতের সময় নানা ধরনের অস্বস্তি ও হয়রানি কমানোই এর অন্যতম লক্ষ্য। নারী চালক ও কন্ডাক্টর থাকায় সেবাটিকে আরো নারীবান্ধব করার চেষ্টা করা হয়েছে। বিআরটিসি ডিজিএম অপারেশন সুখ দেব ঢালি জানান, সরকারের রাজস্ব ব্যয়ে চলা বাসগুলো বিআরটিসির তত্ত্বাবধানে বিভিন্ন রুটে চলছে। তারা কর্মজীবী নারী ও নারী শিক্ষার্থীদের সেবা দেওয়ার জন্য রুটগুলো নির্বাচন করেছেন। শিববাড়ী থেকে এয়ারপোর্ট রুটে গার্মেন্টস কর্মীরা এই বাস ব্যবহার করতে পারবেন। একইভাবে মতিঝিলে অফিসে যারা কাজ করছেন তারাও সেবা পাবেন। তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে ঢাকায় ১০টি বাস বিভিন্ন রুটে চলাচল করছে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম ও বগুড়াতেও এ সেবা চালু করা হয়েছে। আজই প্রথম, আজকের অভিজ্ঞতা থেকে আগামী দিনের ব্যবস্থা গ্রহণের কথা সংশ্লিষ্টদের বলা হয়েছে।

