পেটে গজ রেখেই সেলাই, দেড় মাস পর গৃহবধূর মৃত্যু

আপডেট : ২০ আগস্ট ২০২৬, ২৩:০৩

ফরিদপুরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের সময় পেটের ভেতর গজ কাপড় রেখে সেলাই করে দেওয়ার পর দীর্ঘ দেড় মাসের বেশি সময় ধরে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে না ফেরার দেশে চলে গেলেন কনিকা মণ্ডল (৩৬) নামের এক গৃহবধূ। চিকিৎসায় প্রায় ২০ লাখ টাকা ব্যয় করেও তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।

মারা যাওয়া কনিকা মণ্ডল রাজবাড়ী জেলার বালিয়াকান্দি উপজেলার বহরপুর ইউনিয়নের বাঘুটিয়া গ্রামের অশান্ত মণ্ডলের স্ত্রী। তিনি দুই ছেলে ও দেড় মাস বয়সী একটি কন্যাসন্তান রেখে গেছেন। বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) বিকেলে তার মৃত্যুর বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন স্বজনরা। বুধবার রাত সোয়া ২টার দিকে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

পরিবারের সদস্যরা জানান, প্রসবব্যথা শুরু হলে গত ২৯ জুন কনিকা মণ্ডলকে ফরিদপুর শহরের নিলটুলী মুজিব সড়ক সংলগ্ন সমরিতা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেদিন সন্ধ্যায় হাসপাতালের প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ সার্জন ডা. লক্ষ্মী রানী দত্ত অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে একটি কন্যা সন্তান প্রসব করান। কিন্তু পরদিনই কনিকার পেট ফুলে গিয়ে তীব্র যন্ত্রণা শুরু হয়। বিষয়টি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও চিকিৎসককে জানানো হলে তারা দায়িত্ব এড়িয়ে বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে রোগীকে অন্যত্র নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন।

পরবর্তীতে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে গত ৩ জুলাই তাকে ঢাকার কল্যাণপুর ইবনে সিনা হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বুধবার রাতে তার মৃত্যু হয়।

নিহতের দেবর সমীর মণ্ডল জানান, ঢাকায় ভর্তির পর ৭ জুলাই সার্জারি বিশেষজ্ঞ ডা. আবদুল জলিলের তত্ত্বাবধানে বিভিন্ন স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়। সেখানে দেখা যায়, অস্ত্রোপচারের সময় রোগীর পেটের ভেতর প্রায় দেড় কেজি ওজনের একটি বড় সার্জিক্যাল মব বা গজ কাপড় রেখেই সেলাই দেওয়া হয়েছিল। ওই দিনই পুনরায় জরুরি অস্ত্রোপচার করে সেই গজ কাপড় বের করা হলেও রোগীর অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটে। টানা চার দিন তাকে আইসিইউতে রাখা হয় এবং এরপর টানা ৪৮ দিন সংকটাপন্ন অবস্থায় চিকিৎসা চলে। চিকিৎসা বাবদ পরিবারের প্রায় ২০ লাখ টাকা খরচ হলেও শেষ পর্যন্ত কনিকা মণ্ডলকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। চিকিৎসকের এমন চরম গাফিলতি ও অবহেলার কঠোর বিচারের দাবি জানান তারা।

রোগীর মৃত্যুর পর অভিযুক্ত চিকিৎসক ডা. লক্ষ্মী রানী দত্ত গৃহবধূর স্বামী অশান্ত মণ্ডলের হোয়াটসঅ্যাপে একটি বার্তা পাঠিয়ে ভুল স্বীকার করেন ও ক্ষমা চান। সেই বার্তায় তিনি লেখেন, “দাদা নমস্কার। ভালো থাকুন ঈশ্বরের কাছে সেই প্রার্থনা করি। সব কথার আগে করজোড়ে ক্ষমাপ্রার্থী। ভুল মানুষেরই হয়, অনেক ঝামেলার ভেতর থেকে আমি ভুল করে ফেলেছি। আমি বারবার ক্ষমাপ্রার্থী আপনার কাছে। অনেক কষ্টে আছি। আবারও ক্ষমা চাচ্ছি দাদা।”

তবে এই ক্ষমা চাওয়াকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না নিহতের স্বামী অশান্ত মণ্ডল। তিনি ক্ষোভ ও আহাজারি প্রকাশ করে বলেন, চিকিৎসকের অমার্জনীয় অবহেলার কারণেই তার স্ত্রী মারা গেছেন এবং সদ্যোজাত দুই মাসের সন্তানকে নিয়ে তিনি এখন দিশেহারা। তিনি এই ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জোর দাবি জানান।

এ বিষয়ে সমরিতা জেনারেল হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মহসিন শরীফ জানান, তিনি ঘটনাটি শুনেছেন, তবে এ সংক্রান্ত বিষয়ে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকই বিস্তারিত বলতে পারবেন। অন্যদিকে ডা. লক্ষ্মী রানী দত্তের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ‘খেয়াল নেই, পরে ফোন দিচ্ছি’ বলে সংযোগ কেটে দেন এবং পরবর্তীতে একাধিকবার চেষ্টা করলেও আর ফোন রিসিভ করেননি।

এ প্রসঙ্গে ফরিদপুরের সিভিল সার্জন মাহমুদুল হাসান জানান, বিভিন্ন মাধ্যমে তিনি মৃত্যুর খবরটি জেনেছেন। তবে ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে এখনও কোনো লিখিত অভিযোগ করা হয়নি। লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

ইত্তেফাক/এএম