সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নে বাড়তি অর্থ জোগাড় এবং কবে থেকে বাস্তবায়ন হবে, সে বিষয়ে কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। শিগগিরই মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের পরই চূড়ান্ত ঘোষণা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর আরও বলেন, ‘পরিচালন ব্যয়ের ১ নম্বর খাত হিসাবে যখন আবির্ভূত হয়েছে ঋণের সুদ ব্যয়, তখন বাংলাদেশে উন্নয়নের বয়ান প্রচারিত হয়েছে। কেউ বলেছেন উন্নয়ন মিরাকল, কেউ বলেছেন উন্নয়ন প্যারাডক্স। যেদিন খাদ্য আমদানি করা হচ্ছিল, সেদিনও পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে খাদ্য রপ্তানি করা হচ্ছে। এ রকম একটা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আমরা যাচ্ছিলাম।’
বৃহস্পতিবার (২১ আগস্ট) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি বলেন, মিথ্যা তথ্য, অপতথ্য, ভুল তথ্য—এগুলো ছিল এত দিন। এ থেকে উত্তরণের পথ হচ্ছে অভ্যন্তরীণ করের হার না বাড়িয়ে অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহ বৃদ্ধি করা। দ্বিতীয়ত হচ্ছে ঋণ। ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে। এগুলো হচ্ছে ঋণের অর্থে বিনিয়োগের ফল কী হবে, অর্থের সময়মূল্য কী হবে এবং এর তাৎক্ষণিক বহুমাত্রিক প্রভাব কী হবে। ঋণ নেওয়া কোনো নেতিবাচক বিষয় নয়। তবে দেখতে হবে কত সুদে, কার কাছ থেকে, কত দিনের জন্য তা নেওয়া হচ্ছে।
তাহলে কি ঋণ নিয়ে বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন করা হবে, এমন প্রশ্নের জবাবে রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ঋণ ছাড়া কি কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান চলে? ঋণ কোনো বিষয় নয়। বিষয় হচ্ছে বাজেট–ঘাটতি কত শতাংশ হলো এবং মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) কত শতাংশ কর আদায় হচ্ছে। এ ছাড়া জিডিপির তুলনায় কত শতাংশ স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তায় ব্যয় হচ্ছে। আর নীতিকাঠামো ও রাজস্বনীতি ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগকে নিশ্চিত করতে পারছে কি না এবং সেই বিনিয়োগের মাধ্যমে কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে কি না, তা–ও গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে। তবে এটি কবে থেকে এবং কত ধাপে কার্যকর হবে, সে বিষয়ে মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের পরই চূড়ান্ত ঘোষণা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি জানান, নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় ইতিমধ্যে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সম্পন্ন হয়েছে।
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, বেতনকাঠামো নিয়ে সাধারণত তিনটি পর্যায়ে কাজ হয়। প্রথম পর্যায়ে পে সার্ভিস কমিশন বা সশস্ত্র বাহিনীর ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পে কমিটি এবং বিচার বিভাগের ক্ষেত্রে জুডিশিয়াল পে কমিশন তাদের প্রতিবেদন দিয়েছে। এসব প্রতিবেদনের মধ্যে প্রথম দুটির বিষয় সচিব কমিটি পর্যালোচনা করে সুপারিশ দিয়েছে। তিনি বলেন, বিচার বিভাগের পে-স্কেলের জন্য মন্ত্রিপরিষদ গঠিত একটি কমিটি রয়েছে। ওই কমিটির প্রথম সভাও হয়েছে। বাংলাদেশের বাস্তবতা, বিষয়টির সংবেদনশীলতা এবং সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা বিবেচনায় নিয়ে কমিটি তাদের প্রতিবেদন দেবে। এর মাধ্যমে পে-স্কেল প্রক্রিয়ার দ্বিতীয় পর্যায় শেষ হবে। এরপর তৃতীয় পর্যায়ে মন্ত্রিসভা সংশ্লিষ্ট প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনা করবে। কোন কোন বিষয় কবে থেকে বাস্তবায়ন করা হবে, সে সিদ্ধান্ত মন্ত্রিসভার বৈঠকেই হবে বলে জানান তিনি।
বেতনকাঠামোর সুবিধা সীমিতসংখ্যক সরকারি চাকরিজীবী পাবেন, এমন প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা বেতনবৈষম্য ও সরকারি-বেসরকারি খাতের বেতনের তুলনা নিয়ে যুক্তি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বিভিন্ন খাতের ব্যয় বা বেতন তুলনার ক্ষেত্রে একই ধরনের বিষয়কে একই ধরনের বিষয়ের সঙ্গে তুলনা করতে হবে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের বেতন এবং বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বেতন সরাসরি তুলনাযোগ্য নয়। তিতুমীর বলেন, ‘যার কর্ম অনুযায়ী তার ব্যবস্থা’ এই নীতিই বিবেচনায় রাখতে হবে।
বেতন বাড়লে দুর্নীতি কমার নিশ্চয়তা আছে কি না, জানতে চাইলে উপদেষ্টা বলেন, সরকার এমন দাবি করছে না। সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে কার্যকর ও যুক্তিসংগত ব্যবস্থা নেওয়া। বেতনকাঠামোর আর্থিক প্রভাব নিয়ে বক্তব্যে উপদেষ্টা জানান, মূল বেতনভোগী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ১৪ লাখ এবং পেনশনভোগীসহ অন্যদের যুক্ত করলে এ সংখ্যা প্রায় ২০ লাখের কাছাকাছি হতে পারে। তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি ইতিমধ্যে বড় মাত্রায় বেড়েছে। ফলে সরকারি চাকরিজীবী ও পেনশনভোগীদের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে পে-স্কেল নিয়ে কাজ চলছে।
