গুলিস্তানে চাঁদার চাপ: নীরব জিম্মি দশায় হাজারো ব্যবসায়ী

আপডেট : ২২ আগস্ট ২০২৬, ০৫:০০

ঢাকার ব্যস্ততম বাণিজ্যিক কেন্দ্র গুলিস্তান। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড়ে সরগরম থাকে এখানকার প্রতিটি মার্কেট। হাজারো ব্যবসায়ী ও কর্মচারীর জীবিকা এসব মার্কেট ঘিরে। কিন্তু ব্যবসার পাশাপাশি বিভিন্ন অজুহাতে অতিরিক্ত অর্থ (চাঁদা) আদায়ের চাপ নিয়ে উদ্বেগে রয়েছেন অনেক ব্যবসায়ী—এমন অভিযোগ তাদের।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এসব অর্থ আদায়ের নেপথ্যে রয়েছে কথিত ‘দরবেশ চক্র’। অভিযোগ রয়েছে, এই চক্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে অতীতে বিভিন্ন মামলা রয়েছে। তাদের মধ্যে বিএনপি নেতা ও সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার বীর মুক্তিযোদ্ধা চৌধুরী আলমের গুম মামলার আসামিও রয়েছেন বলে ব্যবসায়ীদের দাবি।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, আগের সরকারের সময়ও তারা বিভিন্নভাবে অর্থ আদায়ের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। সরকার পরিবর্তনের পরও তাদের প্রভাব কমেনি, বরং পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিয়ে তারা নতুন করে সক্রিয় হয়েছেন। তবে প্রকাশ্যে কারো নাম বলতে চান না অধিকাংশ ব্যবসায়ী। অভিযোগ করতেও অনেকের মধ্যে ভয় কাজ করছে। তাদের আশঙ্কা, নাম প্রকাশ করে অভিযোগ করলে ব্যবসার ওপর আরো চাপ সৃষ্টি হতে পারে।

নানা অজুহাতে অর্থ আদায়ের অভিযোগ :ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, দোকান পরিচালনার নিয়মিত খরচের বাইরে বিভিন্ন অজুহাতে অতিরিক্ত টাকা দিতে হয়। কখনো দোকানের সামনে জায়গা ব্যবহারের নামে, কখনো নিরাপত্তার কথা বলে, আবার কখনো মার্কেট ব্যবস্থাপনা কিংবা অন্যান্য সুবিধার নামে এসব অর্থ নেওয়া হয়।

ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, নির্দিষ্ট সময় পরপর টাকা চাওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে টাকার পরিমাণও নির্ধারিত থাকে। কেউ দিতে না চাইলে সবসময় সরাসরি হুমকি দেওয়া না হলেও এমন এক ধরনের চাপ তৈরি করা হয়, যাতে প্রতিবাদ করার সাহস হারিয়ে ফেলেন ব্যবসায়ীরা। ফলে ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে অনেকেই নীরবে টাকা দিয়ে যাচ্ছেন।

সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। প্রতিদিনের বিক্রি অনিশ্চিত হলেও দোকানভাড়া, কর্মচারীর বেতন, বিদ্যুত্-পানি ও অন্যান্য খরচ ঠিকই বহন করতে হয়। এর সঙ্গে অতিরিক্ত অর্থের চাপ যোগ হলে ব্যবসার মূলধনেও টান পড়ে।

এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘ব্যবসা করতে গেলে এমনিতেই অনেক খরচ আছে। তার ওপর বিভিন্ন সময় বিভিন্ন নামে টাকা দিতে হয়। না দিলে সমস্যা হবে এই ভয়েই অনেকে চুপ থাকেন।’

আরেক ব্যবসায়ী প্রশ্ন তোলেন, ‘যে টাকা নেওয়া হচ্ছে, সেটার হিসাব কোথায়? বৈধ ফি হলে রসিদ থাকবে, নির্দিষ্ট খাত থাকবে। কিন্তু সব টাকার ক্ষেত্রে আমরা সেই স্বচ্ছতা দেখি না। এখানেই বড় প্রশ্ন—এসব অর্থের প্রকৃত গন্তব্য কোথায়?’

টাকার হিসাব কোথায় :প্রতিদিন শত শত দোকান থেকে বিভিন্ন খাতে টাকা আদায় হলে মোট অঙ্ক দাঁড়ায় কত—এ প্রশ্নও উঠছে। কে বা কারা এসব অর্থ সংগ্রহ করছে, কোন খাতে ব্যয় হচ্ছে, ব্যাংক হিসাবে জমা হচ্ছে কি না এবং ব্যবসায়ীদের দেওয়া টাকার বিপরীতে রসিদ দেওয়া হচ্ছে কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা জরুরি বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।

কারণ, মার্কেট পরিচালনার নামে নেওয়া অর্থ বৈধ হলে তার হিসাব থাকার কথা। নির্দিষ্ট খাত, অনুমোদন ও রসিদ থাকার কথা। আর যদি কোনো অর্থের বৈধ ভিত্তি না থাকে, তাহলে সেটি কীভাবে নিয়মিত আদায় হচ্ছে সেটিও তদন্তের বিষয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অভিযোগ বাক্স চান ব্যবসায়ীরা :ব্যবসায়ীরা প্রশাসনের কাছে একটি নির্দিষ্ট দাবি জানিয়েছেন, গুলিস্তানের প্রতিটি মার্কেটে অভিযোগ বাক্স স্থাপন করা হোক। তাদের ভাষ্য, প্রকাশ্যে নাম বলতে না পারলেও অভিযোগ বাক্সের মাধ্যমে চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের নাম, আদায়ের পরিমাণ, কোন খাতে টাকা নেওয়া হচ্ছে এবং কীভাবে অর্থ সংগ্রহ করা হচ্ছে এসব তথ্য প্রশাসনের কাছে দেওয়া সম্ভব হবে। এরপর প্রশাসন এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করে প্রকৃত ঘটনা বের করতে পারবে।

এক ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী বলেন, ‘আমরা চাঁদাবাজদের মুখোশ খুলতে চাই। প্রশাসন আমাদের কাছ থেকেই তথ্য নিক। আমরা নাম বলতে না পারলেও অভিযোগ বাক্সে সব তথ্য দিতে পারব। প্রশাসন সেগুলো যাচাই করলেই প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে।’

সংঘাত নয়, নিরাপদ পরিবেশ চান ব্যবসায়ীরা :ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, তারা কারো সঙ্গে সংঘাতে যেতে চান না। তাদের একমাত্র চাওয়া নিরাপদ পরিবেশে ব্যবসা করা। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের আর্থিক চাপ ও প্রভাবের কারণে অনেকেই নিজেদের কথা প্রকাশ্যে বলতে পারছেন না।

তাদের মতে, গুলিস্তানের বিভিন্ন মার্কেটে অর্থ আদায়ের অভিযোগ শুধু চাঁদাবাজির প্রশ্ন নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজারো ব্যবসায়ীর নিরাপত্তা, জীবিকা এবং স্বাভাবিকভাবে ব্যবসা করার অধিকার।

এ কারণে এখন শুধু কার নামের সঙ্গে অভিযোগ জড়িত সেটি মুখ্য নয়। বরং কত টাকা আদায় হচ্ছে, কার মাধ্যমে আদায় হচ্ছে, কোন খাতে নেওয়া হচ্ছে এবং শেষ পর্যন্ত সেই টাকা কোথায় যাচ্ছে এই আর্থিক প্রবাহের অনুসন্ধানই সবচেয়ে জরুরি। ব্যবসায়ীদের দাবি, প্রশাসন যদি প্রতিটি মার্কেটে অভিযোগ বাক্স স্থাপন করে এবং সেখানে পাওয়া অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে যাচাই করে, তাহলে দীর্ঘদিনের নেপথ্য অর্থ আদায়ের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।

ইত্তেফাক/এএম