অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হবে এশিয়ায়!

আপডেট : ১৮ আগস্ট ২০১৯, ২১:০৮

শেষ পর্যন্ত আইএনএফ (ইন্টারমিডেয়েট রেঞ্জ নিউক্লিয়ার ফোর্সেস) চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে শীতল যুদ্ধ যুগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ রক্ষাকবচের বিলুপ্তি ঘটল। প্রশ্ন হলো এর ফল চুক্তিভুক্ত কোন পক্ষ লাভবান হলো, ক্ষতিগ্রস্তই বা হলো কারা। স্পষ্টত ধারণা করা য়ায় এর ফলে এখন এশিয়াকে কেন্দ্র করে অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হতে পারে। তাছাড়া অদূর ভবিষ্যতে ওয়াশিংটন, বেইজিং ও মস্কোর মধ্যে অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হলে বিপাকে পড়তে পারে মস্কো।

ইন্টারমিডেয়েট রেঞ্জ নিউক্লিয়ার ফোর্সেস বা মধ্যম পাল্লার পরমাণু অস্ত্র চুক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়াকে ভূমি থেকে উেক্ষপণযোগ্য ৫০০ থেকে ৫ হাজার ৫০০ কিলোমিটার পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা থেকে বিরত রেখেছিল। কিন্তু এখন দেশ দুটি চুক্তির বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্ত। এ অবস্থায় দুই পরাশক্তির অস্ত্র রাশ টেনে ধরে রাখার মতো কেবল মাত্র সল্ট চুক্তিই অবশিষ্ট থাকল। শীতল যুদ্ধ নিত্য নতুন ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা ছিল দুই দেশের একটি রুটিনমাফিক। বিশ্বের শান্তিকামী মানুষের জন্য এটি ছিল উদ্বেগের বিষয়। সেই উদ্বেগের যুগ যেন নতুন করে ফিরে এলো।

চুক্তির অপমৃত্যুর জন্য ওয়াশিংটন ও মস্কো একে অপরকে আগে থেকেই দুষছিল। শীতল যুদ্ধ যুগে স্বাক্ষরিত হওয়া যে চুক্তি দুই পরাশক্তি সামরিক প্রতিযোগিতা থেকে বিরত রাখে তার অবসান ঘটার জন্য কেবল দুই দেশ দায়ী নয় বরং বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি নিঃশব্দে পটভূমি তৈরি করেছে। চুক্তিতে যে সময় করা হয় তখন বিশ্ব ছিল মূলত দুই মেরুতে বিভক্ত। কিন্তু এখন সেই প্রেক্ষাপট নেই। বর্তমান বহুমেরু বিশ্বে দ্বিপাক্ষিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি আর নিরাপত্তার নিশ্চয়তা বিধান করে না।

আইএনএফ চুক্তি বহাল রাখতে সমস্যা কি ছিল, মার্কিন প্রশাসনকে এ প্রশ্ন করলে তারা উত্তর দেবে রাশিয়া চুক্তি ভঙ্গ করে এসেছে। রাশিয়া ২১ শতকের প্রথম দশকে ৯এম৭২৯ মিসাইল তৈরি করেছে। চুক্তিতে উল্লেখিত সীমার চেয়ে এর পাল্লা সামান্য কিছু বেশি। এর মধ্য দিয়ে তারা চুক্তিকে কার্যত অকার্যকর করে দিয়েছে। গোয়েন্দা সূত্রে যুক্তরাষ্ট্র এই তথ্য পেয়েছে। ওয়াশিংটনের এই বক্তব্যের সঙ্গে তাদের ন্যাটো মিত্ররাও সহমত পোষণ করবে যে রাশিয়া চুক্তি ভঙ্গ করেছে। অন্যদিকে মস্কোকে যদি এই প্রশ্ন করা হয় তারা যুক্তি দেখাবে যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপের বুকে ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করে চুক্তি লঙ্ঘন করেছে।

প্রশ্ন হলো এই যে পালটাপালটি অভিযোগ সেটি না করে কি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এর বিহিত করা যেত না? দুই দেশ কেন চুক্তি বজায় রাখার গরজ অনুভব করল না। এর মোটামুটি সহজ উত্তর চুক্তিটি হয়েছিল ১৯৮৭ সালে। রোনাল্ড রিগ্যান তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট আর সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট মিখাইল গর্বাচেভ। আফগানিস্তানে তখন সোভিয়েত আগ্রাসন চলছিল। অন্যদিকে ইউরোপের বুকে ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন ছিল যুক্তরাষ্ট্রের নৈমিত্তিক কর্মসূচি। সব মিলিয়ে উদ্বেগের কেন্দ্রটি ছিল ইউরোপ। অন্যদিকে গর্বাচেভ সোভিয়েত ইউনিয়নের হাল ধরার পর থেকে পশ্চিমা দেশগুলো বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তবে অবস্থা এখন ভিন্ন। রাশিয়া আগের চেয়ে অনেক উচ্চাভিলাষী। ইউক্রেনের পর কৃষ্ণ সাগর ও বল্টিক অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়েছে দেশটি। ইউরোপে যখন রাশিয়া প্রভাব বলয় বাড়াচ্ছে তখন এশিয়ায় উদীয়মান শক্তি হয়ে উঠেছে চীন। ১৯৮৭ সালে চুক্তিটি যখন হয় তখন চীন কোনো উল্লেখযোগ্য বিশ্বশক্তি ছিল না। রাশিয়া এখনো সামরিক শক্তির দিক থেকে দ্বিতীয় স্থানে আছে। কারণ দেশটির হাতে বিপুল পরিমাণ পরমাণুর অস্ত্রের স্টকপাইল। কিন্তু বেইজিং যেভাবে সমর শক্তির উন্নয়ন ঘটাচ্ছে তাতে ধারণা করা চলে দেশটি রাশিয়াকে না ছাড়াক এশিয়ায় প্রধান শক্তি হয়ে উঠবে। চীন যেভাবে সামরিকভাবে এগিয়ে চলেছে তাতে প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন যুক্তরাষ্ট্রের এখন এশিয়ায় ভূমিভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা প্রয়োজন, আইএনএফ চুক্তি বহাল থাকা অবস্থায় যা সম্ভব নয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আইএনএফ রক্ষার শেষ চেষ্টা হিসেবে চুক্তিটিকে বহুপাক্ষিক রূপ দিতে চীনকে এতে অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু চীন রাজি হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার চেয়ে চীনের ঢের কম ক্ষেপণাস্ত্র আছে। সঙ্গত কারণেই চীন এমন অসম চুক্তিতে রাজি নয়।

নতুন করে অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হলে তার কেন্দ্র এবার ইউরোপ না হয় এশিয়া হবে। মূলে থাকবে চীন। সন্দেহ নেই নতুন অস্ত্র আগের প্রথাগত অস্ত্রের অনেক কর্মক্ষম ও দ্রুতগামী হবে। এরই মধ্যে পরমাণু বহনক্ষম হাইপারসনিক মিসাইল তৈরি করে সে পথ দেখিয়ে দিয়েছে। এশিয়াকে ঘিরেই যেসব অস্ত্র প্রতিযোগিতা তা নয় তবে চীন উদীয়মান সামরিক শক্তি হওয়ায় সে সম্ভাবনা অনেক বেড়েছে।