ভারতের উত্তর-পূর্বে বিচ্ছিন্নতাবাদের ‘হাওয়া’

আপডেট : ১৮ আগস্ট ২০১৯, ২১:০৮

জম্মু-কাশ্মীরের সমস্যা সমাধানে ভারত সরকার যখন মরিয়া, ঠিক তখনই চিন্তা বাড়াচ্ছে উত্তর-পূর্ব ভারতের নাগাল্যান্ড, মণিপুর, আসাম। অস্বস্তি আরো বাড়িয়ে তুলেছেন এ অঞ্চলে বসবাসরত চাকমা বাসিন্দারা।

সারা ভারত জুড়ে ১৫ আগস্ট স্বাধীনতা দিবস উদযাপন হয়। অথচ এবার ১৪ আগস্ট নাগাল্যান্ডে পালিত হয়েছে ‘নাগা স্বাধীনতা দিবস’। শুধু তাই নয়, উড়েছে আলাদা পতাকাও। ভারতের এ অঙ্গরাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী নেপিউ রিও নিজেও এক সরকারি অনুষ্ঠানে বৃহত্তর নাগাল্যান্ডের পক্ষে কথা বলেছেন। মণিপুর রাজ্যের নাগা অধ্যুষিত এলাকায়ও ‘নাগা স্বাধীনতা দিবস’ পালিত হয়েছে। বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার উদ্যোগে এ দিনটি পালিত হয়। এতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আসামের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈ। তিনি বলেন, ভারতের পক্ষে এটা ভয়ঙ্কর। আর এটা হয়েছে ৩৭০ ধারা নিয়ে নেওয়া ভুল পদক্ষেপের কারণে।

এদিকে একই সময়ে উত্তপ্ত হয়ে উঠছে উত্তর-পূর্ব ভারতের আরেক রাজ্য আসাম রাজ্য। সেখানে আসাম চুক্তির ৬ নম্বর ধারা বিলোপের দাবি তুললেন বরাকবাসীর একাংশ। তারা ‘পিপলস ভিউ’ নামের একটি সংগঠন গড়ে তুলেছেন। এ সংগঠন জোর দিচ্ছে জনমত গঠনে। তাদের বক্তব্য, এনআরসির মাধ্যমে আসামের বাসিন্দা নন এমন লাখ লাখ মানুষের নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে। এরপরেও যাদের নাগরিকত্ব বজায় থাকবে, তাদের কী করে সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত রাখা যায়, তারই ব্যবস্থা রয়েছে আসাম চুক্তির ৬ নম্বর ধারায়। ঐ ধারা অনুযায়ী, আসামের জনগণের সাংস্কৃতিক, সামাজিক, ভাষাগত ঐতিহ্য ও পরম্পরার সুরক্ষা, সংরক্ষণ এবং বিকাশের জন্য প্রয়োজন অনুসারে সাংবিধানিক, আইনগত ও প্রশাসনিক সুরক্ষা প্রদান করা হবে। লোকসভা নির্বাচনের আগে ভারতে নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ভারত সরকার লোকসভা ভোটের আগে ৬ নম্বর ধারাকে জিইয়ে তোলে। একটি কমিটিও গঠন করে। এর জেরে শঙ্কিত আসামের বাংলাভাষীরা।

ঐ দাবি সনদে আসামবাসীদের জন্য ১০০ শতাংশ সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে। নির্বাচনে লড়া, চাকরি, ভূমির অধিকার সমস্ত কিছুতে শুধু তারাই সুযোগ-সুবিধা পাবেন। অর্থাত্ আসামবাসী হিসেবে নথিভুক্ত নন, এমন লোকেরা শুধু থাকার সুবিধা পাবেন, অন্য কিছু নয়। তাই এ ধারাটি বাতিলের দাবি জানানো হচ্ছে।

অন্যদিকে, ভারতে নিজেদের অবস্থান দৃঢ় করতে আন্দোলন শুরু করেছেন চাকমারা। ভারতের ত্রিপুরা, মিজোরাম, অরুণাচল প্রদেশ, ত্রিপুরায় রয়েছে অন্তত আড়াই লাখ চাকমা। ভারতের নাগরিকত্ব এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিয়ে কিছু ক্ষোভ রয়েছে তাদের। এ নিয়ে গত শনিবার ‘চাকমা ন্যাশনাল কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া কনফারেন্স’ ত্রিপুরায় কালা দিবস পালন করে। তাদের বক্তব্য, মিজোরামে ষষ্ঠ তফসিল এবং নাগরিকত্বের অধিকারের ভিত্তিতে একটি জেলা কাউন্সিল রয়েছে চাকমাদের। ত্রিপুরায় আদিবাসী জনগোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু অরুণাচল প্রদেশে ১৯৬৪ সালে ভারত সরকার চাকমাদের পুনর্বাসন দিয়েছিল। কিন্তু নাগরিকত্ব মেলেনি।

তাদের দাবি বাংলাদেশে থাকা চাকমারাও সমস্যায় রয়েছে। বাংলাদেশে চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চলে এ জনজাতির প্রচুর ক্ষতি হয়েছে। ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু চেয়েছিলেন, চাকমা জনবসতি ভারতে থাকুক। ভারত-বাংলাদেশের চাকমাদের স্বার্থেই তাদের এ আন্দোলন। একই সঙ্গে দাবি তোলা হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামকে (সিএইচটি) ভারতের অন্তর্ভুক্ত করার।

জম্মু-কাশ্মীর পরিস্থিতির সামাল দেওয়ার পর ভারত সরকার উত্তর-পূর্বের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ত্রিমুখী আক্রমণ কীভাবে সামাল দেয় সেটাই এখন দেখার বিষয়।