এ যেন গাঁটের পয়সা খরচ করে অন্যদের চা-পান কিংবা সিগারেটের নেশা ধরিয়ে দেয়ার পর নিজের সটকে পড়া। শোনা যায়, অধিকৃত বৃটিশ-ভারতে বৃটিশরা নাকি অনেকটা এভাবেই চা পানের অভ্যাসটা ধরিয়ে দিয়েছিল। যাই হোক, প্রসঙ্গ কিন্তু চা, পান, সিগারেট অথবা নেশাজাতীয় অন্য কোনো কিছু নয়। নিছক তুলনা টানতে বা বোঝানোর সুবিধার্থে এত কিছু বলা। স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর জাঙ্ক ফুড শব্দযুগলের সঙ্গে শিক্ষিত ও সচেতন লোকেরা সবাই কমবেশি পরিচিত। বাংলায় এর তেমন কোনো আক্ষরিক ও যুত্সই অর্থ নেই। ভাবানুবাদে যা দাঁড়ায়— উচ্চ চর্বি, লবণ ও চিনিযুক্ত খাবার। ক্যালোরির প্রশ্নে সমৃদ্ধ হলেও খাদ্যতন্তু, প্রোটিন, ভিটামিন ও খনিজ উপাদানের উপস্থিতি যত্সামান্য। যেমন- সুসিক্ত চর্বিসহকারে রান্না করা মাংস উচ্চ প্রোটিনযুক্ত হওয়া সত্ত্বেও ঘুচাতে পারছে না জাঙ্ক ফুডের অপবাদ। অনেকে অবশ্য এ টার্মটিকে অযাচিত বা আবর্জনা খাবার বলে চালিয়ে দেয়। কয়েক দশক আগে থেকেই পশ্চিমা বিশ্ব জাঙ্ক ফুডের বিষয়ে সরব। হালে বাকি বিশ্ব এ ব্যাপারে যে একবারেই অজ্ঞ, তা কিন্তু নয়। জাঙ্ক ফুড নিয়ে এখন তোলপাড় চলে বিশ্বজুড়ে। এর ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা কম হয় না। এইচএফএসএস ফুডস (হাই ইন ফ্যাট, সল্ট অ্যান্ড সুগার) পরিভাষাটি জাঙ্ক ফুডের সমার্থক।
ফাস্ট ফুড ও ফাস্ট ফুড রেস্টুরেন্টগুলোকে প্রায়শই গুলিয়ে ফেলা হয়, যদিও শ্রেণিগতভাবে ফাস্ট ফুড জাঙ্ক ফুড হিসেবে বর্ণিত হতে পারে না। স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলার কারণেই জাঙ্ক ফুড নিয়ে যত উদ্বেগ। স্থূলতা নামক মহাবিপদকে ডেকে আনে বলেই চালাতে হয় জাঙ্ক ফুড বিরোধী গণস্বাস্থ্য সচেতনতা অভিযান। এ ধরনের খাবার বিক্রি ও বিজ্ঞাপন প্রচারের বিষয়ে অনেক দেশে আরোপ করা হয়েছে বিধিনিষেধও। এ কথাগুলো অনেকের কাছে উদ্ভট ও হাস্যকর মনে হতে পারে, কিন্তু বাস্তব। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের প্রায় সবকটি দেশই এ ধরনের খাবারের বিরুদ্ধে বেশ সোচ্চার। কিন্তু মজার বিষয় হলো তারা যে কাজটি করে না, সেই কাজটিই অন্যদের দিয়ে করাতে যোগায় উদ্দীপনা।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে জাঙ্ক ফুডের বিক্রি প্রতি বছরই কমে আসছে। বিশ্লেষকরা এর কারণ খুঁজতে গিয়ে যা যা পেয়েছেন, সেগুলো হলো অধিকতর স্বাস্থ্য সচেতনতা, বর্ধিষ্ণু শ্রমমূল্য, গরীবদের মধ্যে ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া, বিশেষত ২০০০ সাল থেকেই ভিন্ন স্বাদযুক্ত বহু ধরনের খাবারের রেসিপি আবিষ্কার, বাজার পরিবর্তনের অনেক হেতুর পাশাপশি ক্ষুধা নিবারণের জন্যে ভোজন বেছে নেবার বেলায় ফাস্ট ক্যাজুয়েলের দ্রুত উত্থান। এসবের ফলশ্রুতিতেই সোডা ও স্ন্যাক ফুড কোম্পানিগুলো তাদের মুনাফা নিশ্চিত করতে এখন মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করেছে উদীয়মান বাজারগুলোর প্রতি। নতুন বাজারগুলোয় বিশেষ জায়গা করে নিতে প্রয়োজনীয় এবং সম্ভাব্য যা কিছু করার সবই করছে তারা নির্দ্বিধায়। সুদূরপ্রসারী চিন্তা থেকেই সাময়িকভাবে কিছুটা ক্ষতি হলেও মেনে নিচ্ছে খুশিমনেই। ব্রাজিল, ভারত ও মেক্সিকোর মতো দেশগুলোয় ফ্র্যাঞ্চাইজি ও ভেন্ডিং মেশিনের পেছনেই শুধু বিনিয়োগ করছে না, সে সব দেশে সামাজিক ও রাজনৈতিক মৈত্রীও গড়ে তুলছে, যা তাদেরকে বিকর্ষিত রাজনৈতিক বিরোধিতা, নাকানি-চুবানি খাওয়ানো পুঙ্খানুপুঙ্খ সরকারি পরীক্ষ-নিরীক্ষা এবং উত্পাদিত পণ্যের বিক্রয়ের বেলায় অনমনীয় নিয়ন্ত্রণ এড়াতে সাহায্য করতে পারে। লাভের নেশায় কত কিছুই না করছে বিশ্বখ্যাত কোম্পানিগুলো। দুটি বিশ্ববিখ্যাত জাঙ্ক ফুড কোম্পানি উদ্ভাবনী সরকারি কর্মসূচি তৈরিতে মেক্সিকোর সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কর্মকর্তাদের সঙ্গে কাজ করেছে ঘনিষ্ঠভাবে। কিছু ক্ষেত্রে কোম্পানিরা স্থানীয় সম্প্রদায়গুলোর কাছে পৌঁছেছে সরাসরিই। একটি কোম্পানি ব্রাজিলের দরিদ্রদের কাছে জনপ্রিয়তা পেয়েছে তাদের কাছে উদার চাকরি কর্মসূচি তুলে ধরে। অন্যটি মেক্সিকোয় সম্প্রদায়গত খেলাধুলা ও স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচি থেকে নেওয়ার প্রতিজ্ঞা করে নিজেকে স্থানীয় সংস্কৃতির অংশ বানাতে চাইছে। এভাবে অবস্থান ধরে রাখতে চাইলে কতদূর সফল হবে তা সময় বলে দেবে।
