আধুনিক মানুষের হাতে মোবাইল ফোন এখন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি যেন মানুষের পকেটের অফিস, ব্যাংক, পাঠাগার, বিনোদনকেন্দ্র এবং কখনো কখনো ব্যক্তিগত মনোরোগ বিশেষজ্ঞও! ঘুম থেকে ওঠার পর প্রথম যে জিনিসটির দিকে আমরা তাকাই, ঘুমাতে যাওয়ার আগে শেষ যে জিনিসটি হাতে নিই- অনেকের ক্ষেত্রে সেটিও মোবাইল ফোন। প্রশ্ন হলো, এই ছোট্ট যন্ত্রটি আমাদের জীবনকে যতটা সহজ করেছে, শরীর ও মনের ওপর তার প্রভাব কতটা?
প্রযুক্তিকে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, ট্যাবলেট ও ইন্টারনেট আমাদের জীবনকে অভূতপূর্বভাবে সহজ করেছে। চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যবসা, ব্যাংকিং, যোগাযোগ-প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই ডিজিটাল প্রযুক্তি এখন অপরিহার্য। সমস্যা প্রযুক্তিতে নয়; সমস্যা শুরু হয় যখন প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করার পরিবর্তে আমরা প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণে চলে যাই।
বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, মোবাইল ফোন ব্যবহারের সঙ্গে কয়েকটি স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্পর্ক রয়েছে; যেমন- মোবাইল ফোনের অতিরিক্ত ব্যবহারের সবচেয়ে স্পষ্ট ক্ষতিগুলোর একটি হলো ঘুমের ওপর প্রভাব। বিশেষ করে রাতে বিছানায় শুয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দেখা, ভিডিও দেখা, গেম খেলা কিংবা বারবার মেসেজ চেক করার অভ্যাস ঘুমের সময় পিছিয়ে দেয়। ২০২৫ সালের একটি umbrella review-তে ১২৭টি গবেষণা এবং প্রায় ৮ লাখ ৬৭ হাজার অংশগ্রহণকারীর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা হয়েছে, কিশোরদের ক্ষেত্রে ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারের সঙ্গে কম ঘুম, ঘুমাতে দেরি করা এবং ঘুমের মান খারাপ হওয়ার সম্পর্ক রয়েছে। অর্থাৎ মোবাইলের আলোকে একমাত্র অপরাধী বানানোর চেয়ে বড় সত্যটি হলো, আমরা মোবাইল হাতে নিয়ে ঘুমের সময়টাই চুরি করে ফেলছি।
দ্বিতীয়ত, চোখের ওপর চাপ। দীর্ঘ সময় মোবাইল, কম্পিউটার বা ট্যাবের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলে চোখে শুষ্কতা, জ্বালা, অস্বস্তি, ঝাপসা দেখা এবং চোখের ক্লান্তি হতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। বাইরে খেলাধুলার সময় কমে গিয়ে দিনের বড় অংশ যদি স্ক্রিনের সামনে কাটে, তাহলে শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এবং চোখের ওপর অতিরিক্ত চাপ- দুই সমস্যাই তৈরি হতে পারে। তবে স্ক্রিন ব্যবহার মানেই চোখ নষ্ট হয়ে যাবে- এমন সরল বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত ঠিক নয়। বরং দীর্ঘক্ষণ একটানা স্ক্রিন ব্যবহারের অভ্যাস পরিবর্তন করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
ঘাড়, কাঁধ ও পিঠের ব্যথা: মোবাইল দেখার সময় আমরা প্রায়ই মাথা নিচু করে রাখি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা এই ভঙ্গিতে থাকার ফলে ঘাড় ও কাঁধের পেশিতে চাপ পড়তে পারে। একই সমস্যা দেখা যায় ল্যাপটপ ও ট্যাব ব্যবহারের ক্ষেত্রেও। একসময় মানুষ বলত, ‘ঘাড়ে ব্যথা হয়েছে- বয়স হয়েছে।’ এখন তরুণদের মধ্যেও ঘাড় ও কাঁধের ব্যথা দেখা যাচ্ছে। কারণ শুধু বয়স নয়, জীবনযাপনের ধরনও বদলেছে।
মোবাইলের ছোট্ট স্ক্রিনের দিকে ঝুঁকে থাকা অবস্থায় আমরা যে সময়টা পার করি, তার বড় অংশ যদি হাঁটা, খেলাধুলা বা স্বাভাবিক শারীরিক কর্মকাণ্ডের জায়গা দখল করে নেয়, তাহলে শরীর তার মূল্য দিতেই পারে।
স্ক্রিনের সামনে বসে থাকা মানে অনেক সময় শারীরিক কর্মকাণ্ডের সময় কমে যাওয়া। মোবাইলে ভিডিও দেখা, গেম খেলা বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটানোর সঙ্গে যদি ব্যায়াম কমে যায় এবং অতিরিক্ত খাবার খাওয়ার অভ্যাস যুক্ত হয়, তাহলে ওজন বৃদ্ধি ও স্থূলতার ঝুঁকি বাড়বে। শিশু ও কিশোরদের ক্ষেত্রে এ বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। মোবাইল হাতে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরে চর্বি তৈরি হয়- বিষয়টি এমন নয়। কিন্তু মোবাইল যদি হাঁটা, খেলাধুলা ও শারীরিক কর্মকাণ্ডের জায়গা দখল করে নেয়, তখন বিপদ।
শরীরের ক্ষতি চোখে দেখা যায়; মনের ক্ষতি অনেক সময় দেখা যায় না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ও সমস্যাজনক ব্যবহার উদ্বেগ, বিষণ্ণতার উপসর্গ, আত্মসম্মানবোধের সমস্যা, সামাজিক চাপ এবং মানসিক অস্থিরতার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৫ সালের একটি নীতিগত পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, তরুণদের প্রযুক্তি ব্যবহার ও মানসিক স্বাস্থ্যের সম্পর্ক জটিল ও দ্বিমুখী। অতিরিক্ত স্ক্রিন বা সমস্যাজনক ব্যবহার মানসিক সমস্যাকে বাড়িয়ে দিতে পারে, আবার মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত তরুণরাও বেশি সময় ডিজিটাল জগতে আশ্রয় নিতে পারে। এখানেই বিষয়টির গভীরতা।
একজন মানুষ একাকী বোধ করেন, তাই সারাক্ষণ মোবাইলে থাকেন। আবার সারাক্ষণ ভার্চুয়াল জগতে থাকার কারণে বাস্তব মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক দুর্বল হয়ে যেতে পারে। ফলে একাকীত্ব আরও বাড়ে। এটি যেন একটি দুষ্টচক্র।
মোবাইল ফোনের সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদ সম্ভবত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। একটি নোটিফিকেশন, একটি লাইক, একটি মন্তব্য- মস্তিষ্ককে বারবার ফোনের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। WHO Europe-এর ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে ৪৪টি দেশ ও অঞ্চলের প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার কিশোর-কিশোরীর তথ্যের ভিত্তিতে বলা হয়েছে, ২০২২ সালে ১১ শতাংশ কিশোরের মধ্যে problematic social media use-এর লক্ষণ পাওয়া গেছে; ২০১৮ সালে এই হার ছিল ৭ শতাংশ। সমস্যাজনক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের সঙ্গে কম ঘুম ও রাতে দেরিতে ঘুমাতে যাওয়ার সম্পর্কও পাওয়া গেছে।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সব ব্যবহার ক্ষতিকর নয়। পরিবার থেকে দূরে থাকা মানুষকে কাছে আনা, শিক্ষা, তথ্যপ্রাপ্তি, সামাজিক যোগাযোগ-এসব ক্ষেত্রেও এর অসাধারণ ভূমিকা রয়েছে। অতএব প্রযুক্তিকে নিষিদ্ধ নয়, নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
সবচেয়ে বেশি সতর্ক হওয়া দরকার শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে। ঢাকার ৪২০ জন ৬-১৪ বছর বয়সি শিশুকে নিয়ে ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ৫৬ শতাংশ শিশু অভিভাবকের তত্ত্বাবধান ছাড়াই ডিজিটাল স্ক্রিন ব্যবহার করে। গবেষণাটি স্ক্রিন ব্যবহারের তত্ত্বাবধানের অভাবের সঙ্গে বিভিন্ন নেতিবাচক স্বাস্থ্য-সম্পর্কিত ফলাফলের সম্পর্কও পরীক্ষা করেছে। শিশুকে চুপ করানোর জন্য মোবাইল হাতে ধরিয়ে দেওয়া এখন অনেক পরিবারের স্বাভাবিক অভ্যাস। শিশু কান্না করছে- মোবাইল দাও। খেতে চাইছে না- মোবাইলে কার্টুন চালাও। পড়তে বসছে না- মোবাইল দাও। ফলাফল হলো, শিশুর বিনোদন, খাবার, পড়াশোনা এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণ- সবকিছুর সঙ্গে মোবাইল জড়িয়ে যাচ্ছে। এটি ভবিষ্যতের জন্য ভালো অভ্যাস নয়।
তাহলে কি মোবাইলের বিকিরণেই সব বিপদ? এখানে একটি ভুল ধারণা সংশোধন করা দরকার। মোবাইল ফোন রেডিওফ্রিকোয়েন্সি বা RF তরঙ্গ নির্গত করে। কিন্তু এগুলো ionizing radiation নয়, অর্থাৎ এক্সরে বা গামা রশ্মির মতো DNA ভাঙার ক্ষমতাসম্পন্ন বিকিরণ নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের National Toxicology Program-এর প্রাণী-গবেষণায় কিছু RF exposure-এর সঙ্গে নির্দিষ্ট ধরনের টিউমারের সম্পর্ক দেখা গেছে।
মোবাইল ফোনের সবচেয়ে প্রমাণিত ও তাৎক্ষণিক বিপদগুলোর একটি কিন্তু বিকিরণ নয়- মনোযোগের বিচ্যুতি। গাড়ি চালানোর সময় ফোনে কথা বলা, মেসেজ লেখা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করা চালকের মনোযোগ রাস্তা থেকে সরিয়ে দেয়। কয়েক সেকেন্ডের অসতর্কতা একটি পরিবারের সারা জীবনের কান্নার কারণ হতে পারে।
তাহলে আমরা কি মোবাইল ছেড়ে দেব? না। কলম আবিষ্কারের পর মানুষ কলম ছাড়েনি। বিদ্যুৎ আবিষ্কারের পর মানুষ বিদ্যুৎ ছাড়েনি। গাড়ি দুর্ঘটনা করে বলে মানুষ গাড়ি ব্যবহার বন্ধ করেনি। প্রযুক্তির কাজও তেমন- ব্যবহার বন্ধ নয়, সঠিক ব্যবহার।
রাতে ঘুমানোর অন্তত কিছু সময় আগে ফোন দূরে রাখা, বিছানায় ফোন নিয়ে না যাওয়া, একটানা দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে না থাকা, নিয়মিত হাঁটা ও ব্যায়াম করা, শিশুদের স্ক্রিন ব্যবহারে অভিভাবকের নজর রাখা এবং খাবারের টেবিল ও পারিবারিক সময়কে মোবাইলমুক্ত রাখা এবং নোটিফিকেশন বন্ধ করা- এসব খুব সাধারণ অভ্যাস।
আমরা ভাবি ফোন আমাদের ডাকছে। আসলে ফোন নিজে কাউকে ডাকে না; আমরা এমনভাবে সেটি বানিয়ে রেখেছি যে, প্রতিটি নোটিফিকেশন আমাদের মনোযোগ দাবি করে। প্রযুক্তি মানুষের জন্য তৈরি হয়েছে। মানুষ প্রযুক্তির জন্য নয়। শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি মোবাইল ফোনের বিরুদ্ধে নয়। প্রশ্নটি আমাদের জীবনযাপনের বিরুদ্ধে। যে প্রযুক্তি আমাদের জ্ঞান দিয়েছে, সেটিই যেন আমাদের ঘুম কেড়ে না নেয়। যে যন্ত্র পৃথিবীকে হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে, সেটিই যেন আমাদের হাত-পা স্থবির করে না দেয়।
লেখক: ফিকামলি তত্ত্বের জনক, বিশ্ববিদ্যালয় সাবেক শিক্ষক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

