রংপুরের মাছুয়াপাড়া এলাকায় অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ তার পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনায় পুলিশের দেওয়া বিবৃতির সঙ্গে ময়নাতদন্তের রিপোর্টের বড় ধরনের অমিল পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে আসামির পোশাক বিতর্ক, ঘটনার সময় বাসার বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকা এবং ফোন জব্দ করার বিষয়ে পুলিশের অস্পষ্টতায় এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে রহস্য আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
সোমবার (২৪ আগস্ট) ময়নাতদন্ত শেষে ফরেনসিক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. বাবলু কুমার বিশ্বাস জানান, নিহত চারজনকেই শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে। তবে পুলিশের দাবি অনুযায়ী কারও চোয়াল ভেঙে যাওয়ার কোনো প্রমাণ ময়নাতদন্তে মেলেনি। তিনি আরও স্পষ্ট করেন, নিহতদের মুখমণ্ডলে কোনো রাসায়নিক বা অ্যাসিড ব্যবহারের আলামত পাওয়া যায়নি; বরং কয়েক দিন মরদেহ পড়ে থাকায় পচন প্রক্রিয়ার কারণে স্বাভাবিকভাবেই মুখ ও চেহারার এমন পরিবর্তন হয়েছে। পরীক্ষার জন্য বিভিন্ন নমুনা সিআইডির ল্যাবে পাঠানো হয়েছে।
এর আগে রোববার সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার আবদুল মাবুদ দাবি করেছিলেন, নিহত মেয়ে আগামী চক্রবর্তীর মুখের চোয়াল ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। ময়নাতদন্তের তথ্যের পর পুলিশের এই দাবির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
হত্যাকাণ্ডের পর আসামিদের পোশাক নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। জেলা ডিবি পুলিশের উপ-কমিশনার সনাতন চক্রবর্তীর গায়ে যে প্রিন্টের শার্ট ছিল, আটক হওয়ার পর আসামি সিদ্ধার্থ দাসের গায়েও হুবহু একই নকশার শার্ট দেখা যায়। সিদ্ধার্থের বাবা বিনয় দাসের দাবি, ‘আমি যখন ছেলেকে পুলিশের হাতে তুলে দিই, তখন ওর গায়ে কেবল একটি ঘিয়া রঙের গেঞ্জি ছিল। পরে কীভাবে ওর গায়ে এই শার্ট এল, তা আমি জানি না।’ এই অভিযোগের জবাবে ডিবি কর্মকর্তা সনাতন চক্রবর্তী বলেন, ‘এটি আড়ংয়ের শার্ট, যা হাজার হাজার মানুষের থাকতে পারে। আসামিকে গ্রেপ্তারের সময়ও তার গায়ে এই শার্টই ছিল।’
আসামিদের গতিবিধি ও ঘটনাস্থল ত্যাগের সময় নিয়েও রয়েছে ধোঁয়াশা। পুলিশ জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার শেষ রাতে বাসার ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় আসামিরা শিক্ষকসহ চারজনকে হত্যা করে এবং শুক্রবার জুমার নামাজের সময় স্বর্ণালংকার নিয়ে চলে যায়। তবে সিদ্ধার্থের বাবার দাবি, বৃহস্পতিবার রাত ১২টায় সিদ্ধার্থ বাসায় খেয়ে পাশের সীমান্তদের বাসায় যায় এবং শুক্রবার সকালেও সে বাড়িতে নাস্তা করেছে। প্রতিবেশী সীমান্ত দাসের পরিবার অবশ্য সিদ্ধার্থের তাদের বাসায় যাওয়ার দাবি অস্বীকার করেছে। অন্য আসামি মুগ্ধ দাসের মা জানান, বৃহস্পতিবার রাতের পর শুক্রবার দুপুরে বাড়ি ফিরে তার ছেলে ফুটবল খেলতে যাওয়ার কথা জানিয়েছিল।
বাসার মোবাইল ফোন বন্ধ থাকা এবং বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়েও রহস্য কাটছে না। নিহতদের স্বজন পূজা চক্রবর্তী জানান, শনিবার রাতে তিনি পরিবারের সবার ফোন বন্ধ পেয়ে বাসায় এসে তালাবদ্ধ ও অন্ধকার দেখতে পান। পুলিশ জানিয়েছে, আসামিরা আলামত নষ্ট করতে দুটি ফোন ডিটারজেন্ট পানিতে ভিজিয়ে রেখেছিল। তবে পরিবারের ব্যবহৃত মোট চারটি ফোনের মধ্যে বাকি দুটি ফোন কোথায় এবং কার কাছে রয়েছে, সে বিষয়ে পুলিশ স্পষ্ট কিছু জানায়নি।
ঘটনার রাতে পুরো বাসাটির বিদ্যুৎ সংযোগও বিচ্ছিন্ন ছিল। মরদেহ উদ্ধারের পর এক ইলেকট্রিশিয়ানকে ডেকে লাইন সচল করা হয়। ওই ইলেকট্রিশিয়ান জানান, খুঁটি থেকে মেইন লাইনের সংযোগটি সুনির্দিষ্টভাবে খুলে ফেলা হয়েছিল, যা কোনো স্বাভাবিক যান্ত্রিক ত্রুটি নয়। এ বিষয়ে ডিবি পুলিশ জানায়, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার বিষয়টি তাদের জানা নেই।
রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) এবং ছেলে আয়ুস চক্রবর্তী প্রিয়মকে (১২) শ্বাসরোধে হত্যার অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসের বাড়ি মাছুয়াপাড়া এলাকাতেই। ময়নাতদন্তের অমিল এবং পারিপার্শ্বিক নানা অসংগতির কারণে হত্যাকাণ্ডটির প্রকৃত মোটিভ ও নেপথ্যের ঘটনা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন উঠছে।

