রোহিঙ্গা ঢলের ৯ বছর পূর্তিতে সমাবেশে বক্তারা

দেশে ফেরার আশা নিভে যাবে না

  • মাতৃভূমিতে ফেরার দীর্ঘদিনের অপেক্ষায় হতাশা বেড়েছে
  • নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন দাবি
আপডেট : ২৬ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৫৯

বাংলাদেশে রোহিঙ্গা ঢলের ৯ বছর পূর্ণ হয়েছে। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারে নৃশংসতার শিকার হয়ে প্রাণ বাঁচাতে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে প্রবেশ শুরু করে। এরপর প্রতিবছরই প্রত্যাবাসনের আশ্বাস মিললেও মিয়ানমারে চলমান সংঘাত, রাখাইন রাজ্যের পরিবর্তিত রাজনৈতিক ও সামরিক বাস্তবতা, নাগরিকত্বের প্রশ্ন এবং দীর্ঘস্থায়ী শরণার্থী সংকটে সেই প্রত্যাবাসন এখনো অনিশ্চিত। দীর্ঘদিনের অপেক্ষায় হতাশ হয়ে পড়েছেন ক্যাম্পে থাকা রোহিঙ্গারা।

গণহত্যা দিবস উপলক্ষ্যে গতকাল মঙ্গলবার কক্সবাজারের উখিয়ার বিভিন্ন ক্যাম্পে সমাবেশ করেছেন হাজার হাজার রোহিঙ্গা। বৃষ্টি ও প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে নারী-পুরুষ ও শিশুরা ব্যানার-প্ল্যাকার্ড হাতে সেখানে জড়ো হন। তাদের কণ্ঠে ছিল ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ স্লোগান। সমাবেশে তারা নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের দাবি জানান। দীর্ঘ ৯ বছর তাঁবুর নিচে অনিশ্চিত জীবনযাপনে তারা ক্লান্ত বলেও জানান।

রোহিঙ্গারা সমাবেশে বলেন, আমাদের ইতিহাস লেখা হয়েছে হারানো প্রাণের বেদনা, পুড়ে যাওয়া ঘরবাড়ি, অসংখ্য ভাঙা সংসারের কান্না আর পেছনে ফেলে আসা প্রিয় মাতৃভূমির স্মৃতি দিয়ে। এই দিনে আমরা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি ২০১৭ সালে গণহত্যার শিকার সব রোহিঙ্গাকে। একই সঙ্গে সম্মান জানাই সেইসব মানুষকে, যারা সীমাহীন নির্যাতন, হত্যা ও বাস্তুচ্যুতির বিভীষিকা পেরিয়েও বেঁচে থাকার সাহস ধরে রেখেছেন। তারা বলেন, আমাদের আশা আজও বেঁচে আছে। সেই আশা ন্যায়বিচার পাবার আশা, মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার আশা, নাগরিকত্বের অধিকার ফিরে পাওয়ার আশা। আজ আমরা আমাদের অতীতকে স্মরণ করি, শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই। আমাদের ন্যায়বিচার ও মাতৃভূমিতে ফিরে যাওয়ার আশা কখনো নিভে যাবে না।

ক্যাম্প-৩-এর সাবেক হেডমাঝি মৌলভী রশিদ বলেন, নিজের বাড়িঘর, ভিটেমাটি ও জমিজমা ফেলে তারা দীর্ঘ ৯ বছর শরণার্থী জীবন কাটাচ্ছেন। আন্তর্জাতিক সম্প্র্রদায়ের কাছে তাদের প্রশ্ন, আর কতদিন এভাবে থাকতে হবে।

শরণার্থী বিশেষজ্ঞ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক রাহমান নাসির উদ্দিন বলেন, রোহিঙ্গাসংকটের টেকসই সমাধান প্রত্যাবাসন হলেও শুধু ঘোষণা বা কূটনৈতিক আলোচনায় তা সম্ভব নয়। প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট কৌশলগত পরিকল্পনা, মিয়ানমারের বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনা, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর সম্পৃক্ততা এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব ও মর্যাদার নিশ্চয়তা।

রোহিঙ্গা অধিকার নিয়ে কাজ করা ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিঙ্গার সভাপতি সৈয়দ উল্লাহ বলেন, প্রত্যাবাসনের জন্য নির্দিষ্ট ধাপ ও কাজ রয়েছে। ২০১৮ সাল থেকে প্রত্যাবাসনের কথা শোনা গেলেও এর বাস্তব প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। তার মতে, মিয়ানমার, জাতীয় ও বৈশ্বিক নীতির পরিবর্তন বিবেচনায় নিয়ে কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। রোহিঙ্গাসংকট শুধু বাংলাদেশের নয়, এটি মিয়ানমার ও আন্তর্জাতিক সম্প্র্রদায়েরও সমস্যা।

রোহিঙ্গা যুবনেতা ও আরাকান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি মুজিবুর রহমান বলেন, রাখাইন বা আরাকানের বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনা না করে প্রত্যাবাসনের পরিকল্পনা করা সম্ভব নয়। তার দাবি, আরাকানের প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকা এখন আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে। প্রত্যাবাসন বাস্তবায়নে চীন ও ভারতের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে প্রয়োজনীয় চুক্তি ও পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও বলেন তিনি।

শরণার্থী বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রত্যাবাসনই সবচেয়ে ভালো সমাধান। তবে নিরাপদ পরিবেশ তৈরি না করে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো যাবে না। রাখাইনের বর্তমান নিয়ন্ত্রণ কাঠামো ও মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকারের সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা করতে হবে। রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা, জমি-বাড়ির অধিকার, সামাজিক সুরক্ষা ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করাও জরুরি।

ইউএনএইচসিআরের কক্সবাজার সাব-অফিসের প্রধান মার্সেল কলুন বলেন, রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থাকলেও কীভাবে প্রত্যাবাসন হবে, তার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা এখনো নেই। মিয়ানমারে চলমান সংঘাত বন্ধ হওয়াকে তিনি প্রত্যাবাসনের প্রথম শর্ত হিসেবে উল্লেখ করেন। এরপর নিরাপত্তা, নিজ ভূমিতে ফেরার সুযোগ, জমি-বাড়ির অধিকার এবং নাগরিকত্ব বা মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

এদিকে প্রত্যাবাসন বিলম্বিত হওয়ায় রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক বরাদ্দও কমে আসছে। পাশাপাশি ক্যাম্পে বিভিন্ন অপরাধ বাড়ায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, রোহিঙ্গাসংকট সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগও কমে গেছে।

দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে এসেছে। উন্নয়নকর্মী ফারিহা হোসাইন বলেন, রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যত্ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের মতামত ও অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা বলেন, প্রত্যাবাসন শুধু সীমান্তের ওপারে পাঠানোর বিষয় নয়; মর্যাদার সঙ্গে ফিরে যাওয়ার নিশ্চয়তা দিতে হবে।

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হত্যা ও নির্যাতনের মুখে সাড়ে ৭ লাখের বেশি রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে আশ্রয় নেয়। আগে থেকে আশ্রয়ে থাকা রোহিঙ্গাদেরসহ বর্তমানে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা কক্সবাজারের ৩৩টি ক্যাম্পে বসবাস করছে। ৯ বছর পরও কবে তারা নিজ দেশে ফিরতে পারবেন, সেই নিশ্চয়তার অপেক্ষায় রয়েছেন তারা।

ইত্তেফাক/এনএন