৫ বছর পর ভারত-চীন বিশেষ বৈঠক: সীমান্ত বাণিজ্য ও তীর্থযাত্রা চালুর সিদ্ধান্ত

আপডেট : ২৬ আগস্ট ২০২৬, ১৫:৫২

দীর্ঘ পাঁচ বছর পর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্বাভাবিক করার লক্ষ্যে শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকে বসেছে এশিয়ার দুই পরমাণু শক্তিধর প্রতিবেশী ভারত ও চীন। বুধবার বেইজিংয়ে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল এবং চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইর মধ্যে অনুষ্ঠিত এই বিশেষ প্রতিনিধি পর্যায়ের বৈঠকে সীমান্ত বাণিজ্য এবং তিব্বতে ভারতীয়দের তীর্থযাত্রা পুনরায় চালু করার বিষয়ে উভয় পক্ষ সম্মত হয়েছে। একই সঙ্গে বিরোধপূর্ণ প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখায় (এলএসি) শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, দুই দেশের প্রতিনিধিদের এই আলোচনায় ২০২৪ সালের অক্টোবরে গৃহীত সেনা প্রত্যাহার চুক্তির বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়। এর ফলে সীমান্ত এলাকার নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলে আগের মতো নিয়মিত টহল পরিচালনা ও পশু চড়ানোর অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে জানানো হয় যে সীমান্ত আদান-প্রদান জোরদারের অংশ হিসেবে তিব্বতে ভারতীয় তীর্থযাত্রীদের ভ্রমণ দ্রুত শুরু করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

গত অক্টোবরে রাশিয়ার কাজান শহরে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলনের ফাঁকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পরই মূলত চার বছরের বেশি সময় ধরে চলা সীমান্ত অচলাবস্থা কাটানোর প্রক্রিয়া গতি পায়। ২০২০ সালের মে মাসে লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় দুই দেশের সেনাদের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে অন্তত ২০ জন ভারতীয় সেনা এবং চারজন চীনা সেনা নিহত হওয়ার পর থেকে সম্পর্কে চরম টানাপোড়েন চলছিল। সংকট নিরসনে পরবর্তীতে ২১ দফা কোর কমান্ডার পর্যায়ের বৈঠক এবং সীমান্ত বিষয়ক পরামর্শক কমিটির ৩২টি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

তবে এই অগ্রগতিকে স্বাগত জানানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষকরা সতর্ক অবস্থানের কথা তুলে ধরেছেন। নয়াদিল্লির ইনস্টিটিউট অব চাইনিজ স্টাডিজের গবেষক অলকা আচারিয়া মনে করেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ায় বৈশ্বিক রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। এ ছাড়া সীমান্তে দীর্ঘ সময় ধরে বিপুল সেনা মোতায়েন রাখা উভয় দেশের জন্যই অত্যন্ত ব্যয়বহুল। ফলে ধাপে ধাপে বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ বাড়ানোর মাধ্যমে অমীমাংসিত বিষয়গুলোর স্থায়ী সমাধান খোঁজার চেষ্টা চলছে।

অন্যদিকে অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের চীন বিশেষজ্ঞ অতুল কুমার মনে করেন, দুই দেশের কৌশলগত অবস্থানে এখনো মৌলিক কিছু মতপার্থক্য রয়েছে। চীন চায় সীমান্ত সংকটকে পাশে রেখে সার্বিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক এগিয়ে নিতে, বিপরীতে ভারতের অবস্থান হলো সীমান্তে দৃশ্যমান শান্তি ছাড়া সম্পর্ক স্বাভাবিক করা অসম্ভব। তিনি বলেন, ‘পূর্ব লাদাখ থেকে সেনা প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত ঝুঁকি থেকেই যাবে। সীমান্তে এখনও প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার সেনা মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে, যা পুরোপুরি সমাধান না হলে সংঘাতের আশঙ্কা থেকেই যায়।’

ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা এই আলোচনাকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি জানান, ভবিষ্যতে দুই দেশের সম্পর্কের সার্বিক উন্নয়ন পরিমাপ করা হবে সীমান্তে কতটা স্থায়ী শান্তি বজায় থাকছে তার ওপর।

উল্লেখ্য, আগামী বছর ভারত ও চীনের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ৭৫তম বার্ষিকী উদযাপিত হতে যাচ্ছে। এমন এক কূটনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে দুই দেশ নিজেদের দীর্ঘদিনের সীমান্ত সংঘাত ও অচলাবস্থা কাটিয়ে পুনরায় সহযোগিতার পথে হাঁটার বার্তা দিল।

ইত্তেফাক/এনএন